গাজীপুর মহানগরীর কোনাবাড়ী এলাকার একটি বহুতল ভবন ঘিরে শনিবার সকাল থেকেই অস্বাভাবিক নীরবতার সঙ্গে কৌতূহল, আতঙ্ক এবং আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে। নওয়াব আলী মার্কেট সংলগ্ন পাঁচতলা একটি আবাসিক ভবনের এক ফ্ল্যাটে রাতের আঁধারে ঘটে যাওয়া একটি ভয়াবহ ঘটনার সূত্র ধরে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তৈরি হয় তীব্র উদ্বেগ। পুলিশ ফ্ল্যাটে প্রবেশ করে দেখতে পায় এক নারী গলাকাটা অবস্থায় মেঝেতে পড়ে আছেন, আর তাঁর স্বামী গুরুতর রক্তাক্ত অবস্থায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন।
মৃত্যুবরণকারী নারীর নাম রহিমা বেগম (৩৮)। তার পাশে আহত অবস্থায় পাওয়া যায় স্বামী ইমরান হোসেনকে, দ্রুতই শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়। চিকিৎসকদের প্রাথমিক মন্তব্য-ইমরানকে বাঁচাতে হলে দ্রুত অস্ত্রোপচার প্রয়োজন, কারণ তাঁর গভীর ক্ষত এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ প্রাণসংহারী হতে পারে।
ঘটনার রাতটি ঠিক কীভাবে কাটল, সে বিষয়ে এখনো পরিষ্কার ব্যাখ্যা দিতে পারেনি কেউ। তবে পুলিশ বলছে, ঘটনাটি যে চাঞ্চল্যকর এবং জটিল এ ব্যাপারে তাদের কোনো সন্দেহ নেই।
প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, ইমরান ও রহিমা এই এলাকায় প্রায় পাঁচ বছর ধরে বসবাস করছিলেন। পাঁচতলার মাঝামাঝি একটি ছোট ফ্ল্যাটে স্বামী-স্ত্রী ও তাদের একমাত্র মেয়ে নিয়ে সংসার চলত তাদের। এলাকার বাসিন্দাদের ভাষায়, পরিবারটি শান্তই ছিল। তাদের নিয়ে কখনো ঝামেলা বা উচ্চস্বরে বিবাদের খবর কেউ শোনেনি।
ইমরান কোনাবাড়ীর স্থানীয় বাজারে মাংস বিক্রি করতেন। গ্রাহকদের সঙ্গে তাঁর ব্যবহার ভালো ছিল বলে দোকান এলাকার কয়েকজন জানিয়েছেন। অন্যদিকে রহিমা পুরো সময় ঘর সামলাতেন। তাঁদের মেয়ে ১৬ বছর বয়সী, নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপারে মেয়েটি বেশ আগ্রহী ছিল বলে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের পরে জানিয়েছে। পুলিশ মনে করছে, পারিবারিক সম্পর্ক, আচরণগত পরিবর্তন ও ব্যক্তিগত যোগাযোগ সবই তদন্তের আওতায় নেওয়া হবে।
ঘটনার পরপরই কিশোরী মেয়েটিকে হেফাজতে নেয় পুলিশ। কোনাবাড়ী থানার ওসি মোহাম্মদ সালাউদ্দিন জানান, মেয়েটি প্রথমে দাবি করেছে-তার বাবা নাকি পারিবারিক বিরোধের জেরে মায়ের ওপর হামলা চালান এবং পরে নিজেই নিজের গলা কাটেন। মেয়ের ভাষ্যমতে, সে নাকি ঘটনাটি চোখের সামনে দেখেছে।
কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে, তার বর্ণনায় অসংগতির পরিমাণ বেশি। ফ্ল্যাটের ভেতরের রক্তের দাগ, ছুরির অবস্থান, দরজা-জানালার অবস্থা-কোনোটিই মেয়ের বয়ানকে পুরোপুরি সমর্থন করে না। পুলিশের ধারণা, ঘটনাটি হয়তো আরও ভিন্ন মোড় নিতে পারে, সেই প্রয়োজনেই মেয়েটিকে প্রাথমিকভাবে নিরাপত্তা হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
সালাউদ্দিন আরও জানান, মেয়েটির কথায় আমরা স্পষ্ট কোনো ধারাবাহিকতা পাচ্ছি না। তার দাবি আর ঘটনাস্থলের আলামত-দুইয়ের মধ্যে স্পষ্ট অসামঞ্জস্যতা আছে। তাই তাকে আমাদের হেফাজতে রাখা হয়েছে।
ফ্ল্যাটটির চারপাশে বসবাসকারী বিভিন্ন বাসিন্দা বলেন, রাতের কোনো সময় তারা দম্পতির ঘর থেকে কোনো ধরনের চিৎকার বা সংঘর্ষের শব্দ শুনেননি। একজন প্রতিবেশী জানান, রাত একটা নাগাদ করিডোরে যেন কেমন একটা টানাটানির শব্দ হয়েছিল। কিন্তু আমরা ভেবেছিলাম, হয়তো কেউ দেরি করে বাসায় ফিরছে। এর বাইরে আর কিছু শুনিনি।
এই নীরবতা পুলিশকে আরও বিভ্রান্ত করছে। কারণ কারো চিৎকার বা ধস্তাধস্তির শব্দ না পাওয়া-ঘটনার প্রকৃতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলছে।
পুলিশ নিশ্চিত করেছে, রহিমা বেগমের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। ঘাড়ের সামনের দিক বরাবর গভীর ক্ষতচিহ্ন দেখে তদন্ত কর্মকর্তাদের ধারণা-এটি সরাসরি ধারালো অস্ত্র ব্যবহারের ঘটনা।
স্বামী ইমরানের অবস্থা এখনও সংকটাপন্ন। তাঁকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। চিকিৎসকেরা বলেছেন, তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হলে অন্তত ৪৮ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতে পারে, কারণ বর্তমানে তাঁর জীবন বাঁচানোই অগ্রাধিকার।
পুলিশ এখন তিনটি সম্ভাবনা সামনে রেখে তদন্ত করছে- পারিবারিক কলহ থেকে নৃশংস সংঘর্ষ, তৃতীয় কোনো ব্যক্তির সম্পৃক্ততা, মেয়ের বয়ানে আংশিক সত্য লুকিয়ে থাকা।
ঘটনাস্থলে পাওয়া রক্তের ছাপ, ধারালো অস্ত্র, মেঝের ওপর পড়া দাগ, আলমারির অবস্থান, মোবাইল ফোনের কললিস্ট সব মিলিয়ে ফরেনসিক দল আজ দুপুর থেকে কাজ শুরু করার কথা বলছে। প্রাপ্ত তথ্য ও প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে আরও কিছু সময়ের মধ্যে ঘটনার একটি প্রাথমিক কাঠামো পাওয়া যাবে বলে মনে করছে পুলিশ।
পুলিশ বলছে, প্রাথমিক আলামতের ভিত্তিতে এটি নিছক গৃহকলাহজনিত ঘটনা মনে হচ্ছে না। বিশেষ করে মেয়ের বয়ানের বিচ্ছিন্নতা, রক্তের দাগের অবস্থান ও ইমরানের আঘাতের ধরন-সবই জটিলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ফলে পুলিশ এটি হত্যা মামলা হিসেবে নথিবদ্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ওসি সালাউদ্দিন বলেন, এটি স্পর্শকাতর ও জটিল মামলা। পরিবারের ভেতরে কী ঘটেছে, তা বের করতে সময় লাগবে। ফরেনসিক রিপোর্ট ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে যাওয়া সম্ভব নয়।
যেসব বাসিন্দা বহু বছর ধরে এই বাড়িতে থাকছেন, তারা কেউই ভাবতে পারেননি তাদের পাশের ফ্ল্যাটে এমন একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটতে পারে। সকাল থেকে ফ্ল্যাটটির সামনে পুলিশ পাহারা, সাংবাদিকদের ভিড়, উৎসুক মানুষের ভিড়-সব মিলিয়ে ভবনটিতে সাধারণ দিনের তুলনায় অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়।
নিচতলার এক বাসিন্দা বলেন, এখানে কখনো এমন কিছু ঘটেনি। পরিবারটিও স্বাভাবিক মনে হতো। হঠাৎ এভাবে একটি পরিবার ভেঙে গেল এটা ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে।
এখন পুলিশের নজর মূলত মেয়েটির জিজ্ঞাসাবাদে নতুন তথ্য পাওয়া যায় কি না, আহত ইমরানের অবস্থা স্থিতিশীল হয় কি না এবং ফরেনসিক রিপোর্ট কী বলে এই তিন বিষয়কে সামনে রেখে।
পরিবারটির ভবিষ্যৎ, ঘটনার প্রকৃত উদ্দেশ্য, এবং দোষী ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের পরিচয় সবই এখন তদন্তের ওপর নির্ভর করছে। গাজীপুর মহানগর পুলিশের একজন কর্মকর্তা মন্তব্য করেন, এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়, রহস্যে ভরা। সত্য উদঘাটন না হওয়া পর্যন্ত এ নিয়ে অনুমান করলে ভুল হবে।
জেএইচআর