২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়ে একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে যারা রাজপথে নেমেছিলেন, তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। এই প্রেক্ষাপটে ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ সব কর্মকাণ্ডের জন্য আইনি সুরক্ষা বা ‘দায়মুক্তি’ দিতে অধ্যাদেশ জারির উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার। গত ৫ জানুয়ারি আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে আইন মন্ত্রণালয়কে এই অধ্যাদেশের খসড়া তৈরির অনুরোধ জানানো হয়েছে।
এই উদ্যোগটি যেমন বিপ্লবীদের মনে সাহস জোগাচ্ছে, তেমনি জনমনে প্রশ্ন তৈরি করছে—দায়মুক্তি আসলে কী? বাংলাদেশের ইতিহাসে এর প্রভাব কেমন ছিল? এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেই বা এর নজির কী?
দায়মুক্তি বা ইনডেমনিটি কী?
সাধারণ আইনি পরিভাষায়, কোনো নির্দিষ্ট সময়ে সংঘটিত এমন কিছু কাজ যা সাধারণ পরিস্থিতিতে ‘অপরাধ’ হিসেবে গণ্য হতে পারত, সেগুলোকে বিশেষ আইনের মাধ্যমে বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে রাখাই হলো দায়মুক্তি। যখন কোনো রাষ্ট্র বিশেষ আইন পাস করে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে তাদের অতীতের কোনো কর্মকাণ্ডের জন্য শাস্তি বা মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়, তখন তাকে ‘ইনডেমনিটি’ বা দায়মুক্তি বলা হয়।
সাধারণত যুদ্ধ, গণ-অভ্যুত্থান বা জাতীয় বিপর্যয়ের পর শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে এই ধরনের আইন প্রণয়ন করা হয়। তবে এর অপব্যবহারের ইতিহাসও বিশ্বে কম নয়।
কেন জুলাই যোদ্ধাদের জন্য এই সুরক্ষা প্রয়োজন?
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-শ্রমিক-জনতা স্বৈরাচার পতনের লক্ষ্যে যে আন্দোলন গড়ে তুলেছিল, সেখানে অনেক ক্ষেত্রে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সাথে সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। বিপ্লব পরবর্তী সময়ে এই আন্দোলনকারীদের যেন রাজনৈতিক বা আইনি হয়রানির শিকার হতে না হয়, সেজন্যই এই সুরক্ষার দাবি উঠেছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন গত ৭ জানুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করে যে, ১ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত পরিচালিত সব কর্মকাণ্ডের জন্য আন্দোলনকারীদের দায়মুক্তি দিতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে তাহরিমা জান্নাত সুরভী এবং মাহদী হাসানের মতো ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ গ্রেপ্তারের ঘটনায় এই দাবির পালে হাওয়া লাগে। সরকার ইতিপূর্বে এক আদেশের মাধ্যমে মামলা না করার নির্দেশনা দিলেও, একটি স্থায়ী ‘অধ্যাদেশ’ বা আইনের অভাব বোধ করা হচ্ছিল। ৫ আগস্টের ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’-এও শহীদ ও আহত যোদ্ধাদের আইনি সুরক্ষা দেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছিল।
বাংলাদেশের সংবিধানে দায়মুক্তির ভিত্তি
অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, দায়মুক্তি কি অসাংবিধানিক? বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৬ নম্বর অনুচ্ছেদে এর স্পষ্ট উত্তর রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, সংবিধানে বর্ণিত মৌলিক অধিকার যা-ই থাকুক না কেন, জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের প্রয়োজনে বা রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে শৃঙ্খলা বজায় রাখার উদ্দেশ্যে সংঘটিত কোনো কাজের জন্য সংসদ আইন করে দায়মুক্তি দিতে পারবে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার এই সাংবিধানিক অধিকারের আলোকেই জুলাই যোদ্ধাদের জন্য সুরক্ষা আইনটি করতে চাইছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে দায়মুক্তির বিবর্তন: আলো ও অন্ধকার
বাংলাদেশের ৫০ বছরের ইতিহাসে দায়মুক্তি আইন বারবার ফিরে এসেছে। কখনও এটি ব্যবহৃত হয়েছে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানে, আবার কখনও খুনিদের রক্ষার ঢাল হিসেবে।
মুক্তিযুদ্ধের দায়মুক্তি (১৯৭৩)
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংসদ ১৯৭৩ সালে এক ঐতিহাসিক প্রেসিডেনশিয়াল অর্ডার জারি করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাক্ষরিত এই আদেশে ১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের সাথে সংশ্লিষ্ট কাজের জন্য সকল মুক্তিযোদ্ধাকে আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়। এটি ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক দায়মুক্তি, যা মুক্তিকামীদের রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ও সাহসিকতাকে স্বীকৃতি দিয়েছিল।
ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ: কালো আইন (১৯৭৫)
বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত দায়মুক্তি আইনটি জারি হয় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদ ২৬ সেপ্টেম্বর এই অধ্যাদেশ জারি করেন, যার মূল লক্ষ্য ছিল সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের বিচারের পথ রুদ্ধ করা। পরবর্তীতে জিয়াউর রহমানের আমলে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে একে বৈধতা দেওয়া হয়। দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে এই কালো আইন বাতিল করে এবং শেষ পর্যন্ত ঘাতকদের বিচার সম্পন্ন হয়।
অপারেশন ক্লিন হার্ট ও যৌথ অভিযান দায়মুক্তি (২০০৩)
২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে সন্ত্রাস দমনে পরিচালিত ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’-এ যৌথ বাহিনীর হাতে বেশ কিছু বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। সেই সময়ের দায়িত্বরতদের সুরক্ষা দিতে ২০০৩ সালে ‘যৌথ অভিযান দায়মুক্তি আইন’ পাস করা হয়। তবে ২০১৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট এই আইনটিকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন, কারণ এটি মানবাধিকারের মৌলিক চেতনার পরিপন্থী ছিল।
বিদ্যুৎ খাতের ‘কুইক রেন্টাল’ দায়মুক্তি (২০১০)
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১০ সালে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের দোহাই দিয়ে ‘দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন’ করা হয়। এই আইনের অধীনে কোনো ক্রয় প্রক্রিয়া বা চুক্তিকে আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যেত না। এটি মূলত দুর্নীতির সুরক্ষা কবজ হিসেবে পরিচিতি পায়। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার এই আইনটিকে বাতিল করে এবং উচ্চ আদালত একে অবৈধ ঘোষণা করে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: দায়মুক্তির আন্তর্জাতিক রূপ
দায়মুক্তি আইন কেবল বাংলাদেশে সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বের অনেক দেশে গৃহযুদ্ধ বা সংঘাত পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দিতে এই পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র (১৮৭২): ১৮৬৫ সালে আমেরিকার গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর দক্ষিণের রাজ্যগুলোর কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক অধিকার ফিরিয়ে দিতে ‘অ্যামনেস্টি অ্যাক্ট’ করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা।
লেবানন (১৯৯১): ১৫ বছরের দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের পর লেবানন সরকার একটি সাধারণ ক্ষমা আইন পাস করে। যদিও এর মাধ্যমে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো অস্ত্র ত্যাগ করে, কিন্তু ভুক্তভোগী পরিবারগুলো কখনোই বিচার পায়নি।
মিত্রশক্তি ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ: মজার বিষয় হলো, হিরোশিমা-নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা হামলা বা জার্মানিতে মিত্রবাহিনীর বোমা বর্ষণে লাখ লাখ বেসামরিক লোক মারা গেলেও মিত্রবাহিনীর জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক ‘দায়মুক্তি আইন’ করা হয়নি। বরং নাৎসি ও জাপানি নেতাদের বিচার করা হয়েছে ‘নুরেমবার্গ’ ও ‘টোকিও’ ট্রাইব্যুনালে। একে অনেকেই ‘বিজয়ীদের বিচার’ বা 'Victor’s Justice' বলে অভিহিত করেন। জুলাই অধ্যাদেশের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে প্রস্তাবিত দায়মুক্তি অধ্যাদেশটি মূলত একটি ‘বিপ্লবী সুরক্ষা’। এর উদ্দেশ্য কোনো অপরাধীকে বাঁচানো নয়, বরং যারা একটি ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করে নতুন রাষ্ট্র নির্মাণের পথ প্রশস্ত করেছেন, তাদের প্রতিহিংসামূলক আইনি লড়াই থেকে রক্ষা করা।
তবে ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, দায়মুক্তির সুযোগ নিয়ে যেন কোনো অতিউৎসাহী গোষ্ঠী ক্ষমতার অপব্যবহার করতে না পারে, সেদিকেও সজাগ দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। সংবিধানের ৪৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রস্তাবিত এই আইনটি যদি স্বচ্ছতার সাথে প্রণীত হয়, তবে এটি হবে জুলাই যোদ্ধাদের প্রতি রাষ্ট্রের একটি বড় স্বীকৃতি।
জুলাই মাসের সেই অগ্নিঝরা দিনগুলোতে যারা বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, আইনি বেড়াজালে তাদের জীবন যেন থমকে না যায়—এটাই এখন ছাত্র-জনতার মূল প্রত্যাশা।
এএন