সরকারি চাকুরিজীবীদের ভাগ্যোন্নয়নে বিশাল পদক্ষেপ

দ্বিগুণ বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ, সর্বনিম্ন ২০ হাজার ও সর্বোচ্চ ১.৬০ লাখ টাকা

বিশেষ প্রতিবেদক প্রকাশিত: জানুয়ারি ২২, ২০২৬, ০১:০৮ পিএম

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে সরকারি চাকুরিজীবীদের জন্য সুসংবাদ নিয়ে এসেছে জাতীয় বেতন কমিশন। জীবনযাত্রার ব্যয় এবং মুদ্রাস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির চূড়ান্ত সুপারিশ করা হয়েছে। সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন বেতন কমিশন গতকাল বুধবার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে এই সুপারিশ সম্বলিত প্রতিবেদন পেশ করেন।

নতুন এই সুপারিশের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের মধ্যকার ব্যবধান কমিয়ে আনা। আগে এই অনুপাত ছিল ১: ৯.৪, যা কমিয়ে এখন ১: ৮ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে নিম্নস্তরের কর্মচারীদের আর্থিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে।

সুপারিশ অনুযায়ী, ২০টি গ্রেড বা ধাপ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। একনজরে দেখে নিন কোন গ্রেডে বর্তমান বেতন কত এবং প্রস্তাবিত বেতন কত হতে যাচ্ছে:

গ্রেড (ধাপ)-বর্তমান মূল বেতন (টাকা)-প্রস্তাবিত মূল বেতন (টাকা)-বৃদ্ধির হার (প্রায়)
১ম গ্রেড (সর্বোচ্চ)-৭৮,০০০-১,৬০,০০০-১০৫%
২য় গ্রেড-৬৬,০০০-১,৩২,০০০-১০০%
৩য় গ্রেড-৫৫,৫০০-১,১৩,০০০-১০৩%
৫ম গ্রেড-৪৩,০০০-৮৬,০০০-১০০%
৯ম গ্রেড (প্রথম শ্রেণি)-২২,০০০-৪৫,১০০-১০৫%
১০ম গ্রেড-১৬,০০০-৩২,০০০-১০০%
১১তম গ্রেড-১২,৫০০-২৫,০০০-১০০%
২০তম গ্রেড (সর্বনিম্ন)-৮,২৫০-২০,০০০-১৪২%

তালিকা অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, ১৯তম ধাপে ২০ হাজার ৫০০ এবং ১৮তম ধাপে ২১ হাজার টাকা বেতনের সুপারিশ করা হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রতিবেদন গ্রহণকালে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এই উদ্যোগকে ‘সৃজনশীল’ ও ‘মস্ত বড় কাজ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, সরকারি চাকুরিজীবীরা দীর্ঘ সময় ধরে একটি বাস্তবসম্মত বেতন কাঠামোর জন্য অপেক্ষা করছিলেন। এই আউটলাইনটি চাকুরিজীবীদের কর্মস্পৃহা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

বেতন কমিশনের প্রধান জাকির আহমেদ খান জানান, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি চাকুরিজীবী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগী রয়েছেন। বর্তমানে তাদের বেতন ও ভাতার পেছনে সরকারের বার্ষিক ব্যয় হয় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। নতুন সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে সরকারকে অতিরিক্ত আরও ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা সংস্থান করতে হবে। অর্থাৎ, বেতন খাতে সরকারের মোট ব্যয় ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

বৈঠকে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ এবং অর্থসচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদার উপস্থিত ছিলেন। তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, এই বিশাল অংকের অর্থ জোগাড় করা এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা হবে পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জ।

বেসামরিক চাকুরিজীবীদের এই সুপারিশ জমা হওয়ার পর এখন সামরিক বাহিনী এবং বিচার বিভাগের জন্য পৃথক বেতন কাঠামো চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হবে। এছাড়া ক্যাডার সার্ভিসের শীর্ষ পদ—যেমন মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মুখ্য সচিব এবং জ্যেষ্ঠ সচিবদের জন্য ২০টি গ্রেডের বাইরে বিশেষ একটি বেতন ধাপ তৈরি করবে অর্থ বিভাগ, যা পরবর্তী সময়ে প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ করা হবে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে ২০তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর ৮ হাজার ২৫০ টাকা মূল বেতনে টিকে থাকা অসম্ভব ছিল। ২০ হাজার টাকা সর্বনিম্ন বেতন নির্ধারণ করা হলে নিম্ন আয়ের সরকারি কর্মচারীরা কিছুটা স্বস্তিতে ফিরবেন। তবে মুদ্রাবাজারে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ে কি না, সেদিকে কড়া নজর রাখার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।

সুপারিশে আরও বলা হয়েছে যে, বেতন বাড়লে সরকারি কাজে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং দুর্নীতির প্রবণতা হ্রাস পাবে। মানুষ এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে সরকারের চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপনের জন্য, যা কার্যকর হলে দেশের অর্থনীতিতে এক বড় ধরণের তারল্য প্রবাহ সৃষ্টি হবে।

জাতীয় বেতন কমিশনের এই সুপারিশ বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে এটি হবে একক মেয়াদে সবচেয়ে বড় বেতন বৃদ্ধি। এখন দেখার বিষয়, অর্থ মন্ত্রণালয় এই বিশাল বাজেটের সংস্থান কীভাবে করে এবং নতুন বেতন কাঠামো কবে থেকে কার্যকর হয়।

এএন