ব্রাজিলের ফুটবলে ‘সবচেয়ে বেদনাময় রাত’ আজ

স্পোর্টস ডেস্ক প্রকাশিত: জুলাই ৮, ২০২৬, ০৬:২৮ পিএম

২০১৪ সালের ৮ জুলাই; বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে এমন একটি কালো দিন, যা ব্রাজিলিয়ানদের কাছে কখনোই ক্যালেন্ডারের সাধারণ কোনো তারিখ হয়ে উঠবে না। সেদিন শুধু একটি ম্যাচ হারেনি সেলেসাওরা; বরং ঘরের মাঠে ভেঙে চুরমার হয়েছিল কোটি সমর্থকের হেক্সা বা ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের লালিত স্বপ্ন। ফুটবল ইতিহাসে লেখা হয়েছিল এক অবিশ্বাস্য ও চরম ট্র্যাজেডি।

নিজেদের মাটিতে বিশ্বকাপ হওয়ায় শিরোপার স্বপ্নে বিভোর ছিল পুরো লাতিন দেশটি। বেলো হরিজন্তের মিনেইরো স্টেডিয়ামে জড়ো হওয়া প্রায় ৬২ হাজার দর্শক অপেক্ষায় ছিলেন ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী সাম্বা ফুটবলের জাদুকরী প্রদর্শনীর। কিন্তু নব্বই মিনিট শেষে গ্যালারিতে উপস্থিত কোটি কোটি চোখ যে দৃশ্য দেখেছিল, তা আজও বিশ্বাস করা কঠিন। সেমিফাইনালে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলের বিধ্বংসী পরাজয়-যা বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপর্যয় এবং ব্রাজিল ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে বেদনাদায়ক রাত হিসেবে চিহ্নিত।

চোটের কারণে সেই ম্যাচে দলের প্রাণভোমরা নেইমার জুনিয়র খেলতে পারেননি, আর কার্ডের নিষেধাজ্ঞায় অধিনায়ক থিয়াগো সিলভাও ছিলেন মাঠের বাইরে। তবু পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের রক্ষণভাগ এভাবে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়বে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। ১৯৫০ সালের ঘরের মাঠের ‘মারাকানা ট্র্যাজেডি’র পুরনো ক্ষত মুছে নতুন ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন দেখছিল ব্রাজিল। কিন্তু সেই স্বপ্নের রাতে জার্মানি তাদের নির্মম ও নিখুঁত দক্ষতায় স্বাগতিকদের ছিন্নভিন্ন করে দেয়।

ম্যাচের মাত্র ১১ মিনিটে থমাস মুলারের গোলে এগিয়ে যায় জার্মানি। এরপর শুরু হয় বিশ্ব ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর ও অবিশ্বাস্য সাতটি মিনিট। ২৩ মিনিটে মিরোস্লাভ ক্লোসা গোল করে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন এবং বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড গড়েন। এর ঠিক এক মিনিট পরেই টনি ক্রুস করেন দলের তৃতীয় গোল। ২৬ মিনিটে আবারও ব্রাজিলের জালে বল পাঠান ক্রুস। ব্রাজিল দল তখন সম্পূর্ণ দিশেহারা, তাদের রক্ষণভাগ যেন মুহূর্তেই উবে যায়। ২৯ মিনিটে সামি খেদিরা পঞ্চম গোলটি করলে পুরো মিনেইরো স্টেডিয়াম যেন এক শ্মশানে পরিণত হয়। স্কোরবোর্ডে তখন ৫-০, অথচ ম্যাচ তখনও আধ ঘণ্টাও পার হয়নি।

ডাগআউটে দাঁড়িয়ে অসহায়ের মতো নিজের দলের এই পতন দেখছিলেন বিশ্বকাপজয়ী কোচ লুইজ ফেলিপে স্কলারি। মাঠে ডেভিড লুইজ, মার্সেলো ও অস্কারদের চোখেমুখে তখন শুধুই কান্নার রোল। প্রথমার্ধেই পাঁচ গোল হজম করা ব্রাজিল দ্বিতীয়ার্ধেও আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। উল্টো বদলি হিসেবে নেমে জার্মান ফরোয়ার্ড আন্দ্রে শুর্লে ৬৯ ও ৭৯ মিনিটে আরও দুটি গোল করলে স্কোরলাইন দাঁড়ায় ৭-০। শেষ মুহূর্তে অস্কারের সান্ত্বনাসূচক গোলটি শুধু ব্যবধানই কমিয়েছে, যা পরাজয়ের মহাসমুদ্রে কোনো সান্ত্বনা দিতে পারেনি। ম্যাচ শেষে অশ্রুসিক্ত ডেভিড লুইজের কান্নার মুখটিই হয়ে ওঠে সেই রাতের চিরস্থায়ী প্রতীক।

ইতিমধ্যে ১২ বছর কেটে গেছে। বিশ্বকাপে ব্রাজিল আরও অনেক ম্যাচ খেলেছে, অনেক বড় জয়ও পেয়েছে। কিন্তু ২০১৪ সালের ৮ জুলাইয়ের সেই দুঃস্বপ্ন আজও সাম্বা ফুটবলের দেশ থেকে মুছে যায়নি। নিজেদের মাঠে, বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের মতো মঞ্চে সাত গোল হজম-ফুটবলের ইতিহাসে এমন অপমানের নজির সত্যিই বিরল। সেই ম্যাচের পর থেকেই ফুটবল বিশ্বে প্রতিপক্ষ সমর্থকেরা ব্রাজিলের সঙ্গে জুড়ে দেয় ‘সেভেন আপ’ ট্রলটি। সময় বদলেছে, মাঠে নতুন খেলোয়াড় এসেছে, ডাগআউটে নতুন কোচ বসেছে; কিন্তু ‘৭-১’ এখনো ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের ইতিহাসে এক চিরস্থায়ী ক্ষত, যা যত বছরই পেরিয়ে যাক, সমর্থকদের হৃদয়ে আজীবন তাজা থাকবে।

জেএইচআর