প্রাথমিক শিক্ষার কাঠামো পরিবর্তন তালগোল পাকিয়ে ফেলেছে

পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়াই প্রাথমিক শিক্ষাকে পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণীতে উন্নীত করে রীতিমত তালগোল পাকিয়ে ফেলা হয়েছে। অষ্টম শ্রেণীতে পাঠদান করানোর মতো যোগ্যতা সম্পন্ন ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো না থাকা সত্ত্বেও এই শিক্ষাকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ন্যস্ত করার কারণেই এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। 

এতে উদ্বেগ-উৎকন্ঠায় রয়েছেন শিক্ষার্থী, অভিভবক, শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রশাসনের কর্মকর্তারা। এ ছাড়াও পরীক্ষামূলক ভাবে ২০১৩ এবং ২০১৪ সালে মোট ৬২৭ টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত চালু করা হলেও সেগুলোতে প্রত্যাশা অনুযায়ী ফল মেলেনি। ওই সব স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা পঞ্চম শ্রেণী উত্তীর্ণ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট এলাকার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে চলে গেছে। কারণ ওই সব বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা সম্পন্ন শিক্ষক এবং পর্যাপ্ত অবকাঠামো নেই।
বর্তমানে অষ্টম শ্রেণীর জেএসসি ও মাদ্রাসার জেডিসি পরীক্ষা নেয়া হয় শিক্ষা বোর্ডের অধীনে, যা শিক্ষামন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সংস্থা। কিন্তু অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষা কার্যক্রম প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ন্যস্ত হওয়ায় এই পরীক্ষা নিতে হবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বোর্ডের মাধ্যমেই। কারণ গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব কোন শিক্ষাবোর্ড নেই। এ সব বিষয়ের সমাধান না করে তড়িঘড়ি করে প্র্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণীতে উন্নীত করণের কারণে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক শিক্ষার স্তরে অরাজকতা সৃষ্টি হতে পারে। এ বিষয়ে অভিজ্ঞ শিক্ষাবিদরা বলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লজিস্টিক সাপোর্ট যেমন নেই, তেমনি শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা ভিত্তিক যোগ্যতা সম্পন্ন শিক্ষকও নেই। মোটকথা হঠাৎ করে প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণীতে উন্নীত করতে গিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থায় হ-য-ব-র-ল অবস্থার সৃষ্টি করা হচ্ছে। প্রকৃত পক্ষে এই উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষার মানোন্নয়নের বিভিন্ন প্রকল্পের কোটি কোটি টাকা খাওয়া দাওয়ার আয়োজন করা হয়েছে।নতুন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে হলে নতুন পাঠ্যক্রম প্রণয়ন, প্রতিষ্ঠানের কাঠামো, শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, জনবল, ব্যবস্থাপনা সব কিছুই নতুন করে সাজাতে হবে। নিয়োগ দিতে হবে স্নাতক ও বিএড ডিগ্রিধারি শিক্ষক। কিন্তু প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণীতে উন্নীত করণের জন্য বিশেষভাবে কোনো অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়নি। এ ছাড়াও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং এই সরকারের আমলে জাতীয়করণ হওয়া প্রায় ২৬ হাজার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক দিয়ে মোটেও অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত মানসম্মত পাঠদান সম্ভব নয় বলে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন। তাদের মতে নামকওয়াস্তে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাজের দায়িত্ব প্রাথমিক ও গণ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ন্যস্ত করলেই প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নত হবে না। আমরা জেনেছি, গণশিক্ষা মন্ত্রণলয়ের মাননীয় মন্ত্রীর অতি গরজে প্রাইমারি শিক্ষাকে ৫ম থেকে ৮ম শ্রেণীতে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। স্বনাম ধন্য শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ তাড়াহুড়ো করে এমন কাজ করতেন কিনা সন্দেহ। ‘নেই কাজতো খই ভাজ’-এমন দৃষ্টি প্রয়োগ করা প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে ঠিক হয় নি। সেই ব্রিটিশ আমল থেকে প্রায় আড়াই শত বছর ধরে ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষার স্তর চলে আসছে। এই যৌক্তিকতা গণমানুষের মনস্তত্বের সঙ্গে মিশে গেছে। শিশুশিক্ষার পর্বটা ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত যথার্থ। ৬ষ্ঠ থেকে শুরু হয় কৈশোরোত্তীর্ণ কালের পর্ব। সেখানে চট করে মাধ্যমিক স্তরের একটি অংশকে বোটা থেকে ছিঁড়ে প্রাথমিকে আর প্রাথমিক স্তরের বোটা থেকে ছিঁড়ে মাধ্যমিক স্তরে গায়ের জোরে খাপ খাওয়ানোর অর্থ কী? টাকার শ্রাদ্ধ করা ছাড়া আর কী উপকার হবে এতে? গণশিক্ষা মন্ত্রণলয়কে এই সমস্যার সমাধান দিতে হবে।