রাসেলের জন্মদিনে কাঁদলেন প্রধানমন্ত্রী শোকের স্মৃতি হোক শক্তি

গত ১৮ অক্টোবর ছিলো বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠপুত্র শেখ রাসেল’র ৫২তম জন্মদিন। ১৯৬৪ সালের এই দিনে তিনি ৩২ নম্বর ধানমণ্ডির বঙ্গবন্ধু ভবনে জন্মগ্রহণ করেন। রাসেলকে যখন হত্যা করা হয় তখন তিনি ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলের ৪র্থ শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। এই ৩২ নম্বর ধানম-িতে এসেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী; তিনি রাসেলকে কোলে তুলে আদর করেছিলেন। রাসেল’র জন্মদিনের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছোট্ট ভাইটির ম্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কান্নায় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, রাসেল’র যখন জন্ম তখন বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের বিরোধী দলীয় প্রার্থী মিস ফাতেমা জিন্নাহর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ব্যস্ত। তখন বঙ্গবন্ধু চট্টগ্রামে নির্বচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন। আইয়ুব খানের মার্শাল ল’র যুগ সেটা। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জন্মের পর রাসেল পরিবারের সকলের স্নেহ পেলেও পিতার স্নেহ পেয়েছে খুব কম।

১৯৬৬ সালে ৬ দফা পেশ করার পর থেকে বঙ্গবন্ধুর লাগাতার কারাবরণ শুরু হয়। একটানা তিন বছর কারাবরণ করার পর বঙ্গবন্ধু ৬৯-এর গণ অভ্যুত্থানের পর মুক্তি পান। এর মধ্যে রাসেল পিতার সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত ছিলেন। এক ধরনের পিতৃস্নেহ বঞ্চিত পরিবেশে রাসেল বড় হয়ে ওঠেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, যখনই পরিবারের সকলে কারাগারে যেতাম বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে, তখন রাসেলও সঙ্গে থাকতো। কিন্তু সাক্ষাতের সময় শেষ হলেও বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে রাসেলকে নিয়ে আসা খুব কষ্ট হোতো।

এ সব কথা বলার সময় প্রধানমন্ত্রী কান্নায় বাষ্পরুদ্ধ হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, তাঁর মা রাসেলকে সান্ত¡না দিয়ে বলতেন, ‘আমিই তোর বাবা।’ খেলতে খেলতেও রাসেল তাঁর পিতা বঙ্গবন্ধুকে খুঁজে বেড়াতেন। রাসেল শুধু পরিবারের নয়, ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের আদরের পাত্র ছিলেন। শুধু বঙ্গবন্ধুর পুত্র হিসেবে নয়, একটি ফুটন্ত গোলাপের মতো নম্র কোমল শিশু হিসেবে। মহান মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস ধানমণ্ডির ১৮ নং বাড়িতে ছিলেন শেখ হাসিনা-রেহানা ও বঙ্গমাতা। তখন নিঃসঙ্গ, ম্রিয়মান পরিবেশে রাসেলের দিনগুলো কেটেছে। এরপর, স্বাধীন বাংলাদেশে রাসেল পিতাকে পেলেও ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকরা তাঁকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে।

ঘাতকরা বলেছিলো তাঁকে মায়ের কাছে নিয়ে যাওয়া হবে। এই হত্যাযজ্ঞকে প্রধানমন্ত্রী কারবালার হত্যার সঙ্গে তুলনা করেন। কিন্তু কারবালায় এজিদ বাহিনী নারী ও শিশুদের হত্যা করেনি। অর্থাৎ ধানমণ্ডির ঘটনাটি কারবালার ঘটনার চেয়েও বিয়োগান্তক, অমানবিক, নিষ্ঠুরতার আধুনিক সংস্করণ। রাসেলের নাম রাখার ব্যাপারে স্মৃতিচারণা করে প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, বঙ্গবন্ধু ইংরেজ মনীষী ব্রাট্রান্ড রাসেলের অনুরাগী ছিলেন। তিনি বেগম মুজিবকে রাসেলের লেখা প্রায়ই অনুবাদ করে শোনাতেন। বেগম মুজিব ছিলেন জ্ঞানপিপাসু। তিনি অনুবাদ শুনে মনীষী রাসেলের ভক্ত হয়ে যান। এ জন্য তাঁর কনিষ্ঠ সন্তানের নাম রাখেন রাসেল। বঙ্গবন্ধুর পরিবারে যে জ্ঞানের অনুশীলন হতো, জ্ঞানী -গুণীদের কদর ছিলো তার দৃষ্টান্ত প্রধানমন্ত্রীর স্মৃতিচারণায় ফুটে উঠেছে।

জানা গেছে, ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করলেও বেগম মুজিব বাংলা সাহিত্যের অমর কথা শিল্পীদের উপন্যাস পড়তেন। বেগম মুজিব তাঁর ছেলেমেয়েদের সংযম, নিরহংকার, শালীনতা, সাংস্কৃতিক চেতনা শিক্ষা দিয়েছিলেন। রাসেল বেঁচে থাকলে, বড় হবার সুযোগ পেলে বাংলাদেশের যোগ্য, সুনাগরিক হতেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এমন পাশবিক ঘটনা যেন আর না ঘটে। আমাদের মতো পিতা-মাতা- ভাই ও স্বজন হারা যেন আর কেউ না হন। তিনি বাংলাদেশের শিশুদের লেখাপড়া শিখে মানুষের মতো মানুষ হওয়ার আহবান জানান।