রাজধানীতে যানজটের অভিশাপ পরিকল্পনার সঠিক বাস্তবায়ন চাই

শুধুমাত্র শুক্রবার ছাড়া সপ্তায় ৬ দিনই ঢাকা মহানগরীতে যানজট লেগেই আছে। সরকার গৃহীত সব ধরনের উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার পথে। ২০১১ সালের শুরুতে লেন পদ্ধতিতে গাড়ি চালানো, অটো সিগন্যাল চালু, পুরোনো গাড়ি উচ্ছেদ, সিসি ক্যামেরায় ভিডিও চিত্র দেখে আইন অমান্যকারী গাড়ি চালক আটক, বাধ্যতামূলক ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারসহ ৮ ধরনের উদ্যোগ নেয়া হলেও তা বাস্তবায়ন হয় নি। এ কারণে রাজধানীতে যানজট এখন নিত্যদিনের চিত্র হয়ে উঠেছে। একটি সূত্র বলেছে, নগর পরিকল্পনাবিদদের ধারণা, বিআরটিএ, সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক পুলিশের সমন্বয়হীনতার কারণে উদ্যোগগুলো বার বার ব্যর্থ হচ্ছে। এই অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে হলে দৃশ্যমান বাস্তবতা সামনে রেখে পদক্ষেপ নিয়ে তা কার্যকর করতে হবে। বছরের পর বছর ধরে ঢাকার রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ। উড়াল সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে যে সব এলাকায়, সে সব রাস্তা লণ্ড ভণ্ড, বিপন্ন হয়ে গেছে। সে কারণে যানজট হচ্ছে। আমরা উদ্বিগ্ন হচ্ছি যে, রাস্তা খোঁড়াখৃুঁড়িতে, ময়লা-আবর্জনায় এবং হকারদের ফুটপাত দখলের কারণে ঢাকা নগরী দিন দিন শ্রীহীন ও বেহাল হয়ে পড়ছে। হকারদের বেপরোয়া ফুটপাত দখলও যানজটের অন্যতম কারণ। তাছাড়া ঢাকার রাস্তায় প্রতিদিন গাড়ির সংখ্যা বাড়ছে। এর মধ্যে অবৈধ গাড়িও আছে। আমরা আগেও বলেছি, গাড়ির লাইসেন্স দেয়ার যে ঢালাও রীতি তা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সরকার তাৎক্ষণিকভাবে আইন করে ইলিশ মাছ ধরা যেমন বন্ধ করেছে, তেমনি এক বছর পর পর এবং পরিমিত সংখ্যায় গাড়ির লাইসেন্স দিলে যানজট নিরসনে তার ফল দেখা যাবে। নীরিক্ষা করে দেখতে হবে, ঢাকার রাস্তায় পরিবহন ধারণ ক্ষমতা কত? ধারণ ক্ষমতার বেশি গাড়ির অনুমতি দেয়া বন্ধ করলে যানজট কমবে বলে আমাদের ধারণা। গাড়ির সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতেই হবে। ভারতের রাজধানী দিল্লিতে জোড়-বিজোড় সংখ্যা মেনে চলা হয়। সড়ক ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। আমাদেরও নিয়মটি চালু করতে হবে। একদিন জোড় নাম্বারের গাড়ি চললে অন্যদিন চলবে বি-জোড় নাম্বারের গাড়ি। এতে রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা কমবে এবং যানজট পরাস্ত হবে। অবশ্যই সহজ কথাটি মানতে হবে যে, রাস্তায় অপরিমিত গাড়ির সংখ্যাই যানজটের মূলকারণ। কেন শুক্রবার যানজট নেই? এর উত্তর হলো, ওই দিন রাস্তায় গাড়ি কম থাকে। এই উৎসমূল থেকে ফর্মূলা নিয়ে রাস্তার ধারণক্ষমতা মোতাবেক গাড়ির লাইসেন্স দিতে হবে। অতিরিক্ত গাড়ি চলার অনুমতি দিলে কোনোদিনও যানজট কমবে না। একই সঙ্গে অবৈধ গাড়ি উচ্ছেদ করতেই হবে। আরো একটি বিষয় লক্ষ্য করা গেছে, সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করে যে উড়াল সেতু নির্মাণ করেছে একটি মহৎ পরিকল্পনা থেকে, তার সুষ্ঠু, সুপ্রয়োগ এখনো শুরু হয় নি। উড়াল সেতুগুলোর নিচেই প্রচণ্ড যানজট। উড়াল সেতুগুলো ঠিকমতো যানজট নিরসনে ভূমিকা রাখতে পারছে না। এখনো সদরঘাট থেকে গুলিস্তান যেতে ঘন্টার পর ঘন্টা সময় লাগে। অর্থাৎ উড়াল সেতুর সঙ্গে নিচের যানজট পরিস্থিতির কোনো সমন্বয় ঘটেনি। সমন্বয় একটি গুরুত্ব¡পূর্ণ ব্যাপার। রবীন্দ্রনাথের ছড়াটির কথা মনে পড়লো, ‘তাল গাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে সব গাছ ছাড়িয়ে।’ শুধু ছাড়িয়ে গেলেতো হবে না, লাগবে সমন্বয়, লাগবে বাস্তবমুখী পরিকল্পনা। ঢাকার যানজট এক কথায়, একবসায় নিরসন করতে পারবে না কেউ। এই জটিলতা নিরসনের সঙ্গে আরও ফ্যাক্টর জড়িত। ঢাকার পার্শ¦বর্তী নদীগুলো খনন করে নৌচলাচলের উপযোগী করতে হবে। মেট্রোরেল দ্রুত নির্মাণ করতে হবে। ঢাকায় অভ্যন্তরিণ রেল চালু করতে হবে। ঢাকার মানুষেরও একটু বাবুগিরি কমিয়ে পায়ে হাঁটার অভ্যেস করতে হবে। কলকাতার মানুষেরা অনেক পথ হেঁটে গন্তব্যে যায়। একটু হেঁটে গন্তব্যে গেলে যানজট কমে। ট্রাফিক নিয়মের সাংঘাতিক ঘাপলা আছে। তারও সংস্কার করতে হবে।