Amar Sangbad
ঢাকা শুক্রবার, ২০ মে, ২০২২, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

বুদ্ধিজীবী হত্যার অন্তরালে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের শ্রদ্ধাঞ্জলি

ডিসেম্বর ১৫, ২০১৬, ০৬:০৯ এএম


গতকাল ১৪ ডিসেম্বর ছিলো শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। পাকসেনা অফিসার রাও ফরমান আলীর নীলনকশা মোতাবেক জামায়াত-শিবিরের ঘাতক বাহিনী তথা আলবদর বাহিনী বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের নির্মমভাবে হত্যা করেছিলো। বিজয় অর্জনের মাত্র দু’দিন আগে, পাকিস্তানি খান সেনাদের পরাজয় আসন্ন জেনে, প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হত্যার নীলনকশা করেছিলো। বাঙালি বুদ্ধিজীবী হত্যার মূল পরিকল্পনাটা পাকিস্তানি সেনাদের হলেও এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে জামায়াত-শিবির। জামায়াত-শিবিরের সহযোগিতা না থাকলে পাকসেনারা এত বুদ্ধিজীবী, এত নিখুঁতভাবে হত্যা করতে পারতো না। মাওলানা মওদুদীর ঘাতক বাহিনী জামায়াত-শিবির বরাবরই বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের প্রতিপক্ষ ভেবেছে। পৃথিবীর যে কোনো বুদ্ধিজীবী, যে কোনো মুক্তবুদ্ধির মানুষ ফ্যাসিবাদকে ঘৃণা করে। আর জামায়াত ও আলবদর বাহিনী ছিলো নিরেট ফ্যাসিবাদী সংগঠন। বুদ্ধিজীবীরা বিবেকের চর্চা করেন। তাঁরা ধর্মের বিরোধী নন কিন্তু ধর্মের নামে কুসংস্কার বিরোধী। তাঁরা জানেন, সাম্প্রদায়িকতা ধর্ম নয়। পাকিস্তানি শাসক ও তাদের বিশ্বস্ত তাবেদার জামায়াত-শিবির কোনো ধর্র্মীয় সংগঠন নয়, সাম্প্রদায়িক আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠন। কোনো খাঁটি বুদ্ধিজীবী অসাম্প্রদায়িক- ধর্মনিরপেক্ষ না হয়ে পারেন না। তাঁরা জানেন, রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। তাঁরা জানেন, ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র হয় না। তাঁরা জানেন, সবার ওপরে মানুষ সত্য, তার ওপরে নাই। তাই বুদ্ধিজীবীরা একেবারে গোড়া থেকে পাকিস্তান নামক ধর্মান্ধ রাষ্ট্র মেনে নিতে পারেন নি। বাঙালির ঘাড়ে উর্দু ভাষা চাপিয়ে দেবার বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম বুদ্ধিজীবীরা প্রতিবাদ করেন। বাংলাভাষাকে পঙ্গু করে দেবার জন্য তার বর্ণমালা ধ্বংস করার পরিকল্পনা করেছিলো, বাংলা বর্ণমালার পরিবর্তে আরবি ও রোমান বর্ণমালায় বাংলা লেখার প্রচলন করতে চেয়েছিলো। এর প্রতিবাদ করেছিলেন বুদ্ধিজীবীরা। বাংলাভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতিকে বিধর্মী বলে অপপ্রচার করেছিলো পাক শাসকগোষ্ঠী। এর প্রতিবাদ করেছিলেন বুদ্ধিজীবীরা। বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার গোড়াপত্তন করেছেন তাঁরা। পাকিস্তান ছিলো একটি স্ববিরোধী, অবৈজ্ঞানিক, গণবিরোধী রাষ্ট্র, এ কথা সাধারণ মানুষকে বুঝিয়েছিলেন তাঁরা। বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা পাক কালচার পন্থীদের বিপক্ষে বাঙালি কালচারের প্রাধান্য দিয়েছিলেন। পাকিস্তান সরকারকে চ্যালেঞ্জ করে বুদ্ধিজীবীরা রবীন্দ্রনাথকে রক্ষা করেছেন, রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকী পালন করেছেন। পাক শাসকগোষ্ঠী এবং জামায়াত-শিবির বুদ্ধিজীবীদের ভেবেছে হিন্দু এবং কমুনিস্ট। তাই বুদ্ধিজীবীদের ওপর ছিলো পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের সীমাহীন আক্রোশ। ১৪ ডিসেম্বর এবং তার আগেই বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা পাকিস্তানিদের আক্রোশের শিকার হয়েছে। তবে তাঁদের ঘর থেকে তুলে আনার অপকীর্তি জামায়াত-শিবিরের। এই কাজটা পাকসেনারা করতে পারতো না। ছাত্র হয়ে শিক্ষককে ধরে নিয়ে গেছে শিবিরের জল্লাদরা। যিনি চক্ষু চিকিৎসক তাঁর চোখ উৎপাটন করেছে, যিনি হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ তাঁর হৃৎপি- উপড়ে ফেলেছে, যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার তাঁর জিহবা কর্তন করেছে জল্লাদরা। অধিকাংশ শহীদ বুদ্ধিজীবীর লাশ খুঁজে পাওয়া যায় নি, তাঁদের শেষকৃত্য হয় নি। রায়ের বাজারের বধভূমিতে যে সকল বুদ্ধিজীবীর লাশ পাওয়া গেছে তা বিকৃত করে ফেলেছিলো যাতে স্বজনরা কবর দিতে বা দাহ করতে না পারে। ১৬ ডিসেম্বর যখন সারা বাঙালি জাতি রাস্তায় নেমেছে বিজয়ের উল্লাস করতে, তখন শহীদ বুদ্ধিজীবীর স্বজনরা দৌঁড়ে গেছে রায়ের বাজারের বধ্যভূমিতে লাশ খুঁজতে। সেখানে তাঁরা পাগলের মতো খুঁজে বেড়িয়েছেন স্বজনের লাশ। এমন নির্মম বর্বরতা পৃথিবীর আর কোনো দেশে ঘটেছে কিনা সন্দেহ। বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতিকে মেধাশূন্য করার পরিকল্পনা থেকে বুদ্ধিজীবী হত্যার নীলনকশা করা হয়েছিলো। একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তার বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়। সভ্যতা বিনির্মাণে ও বিকাশে সবচেয়ে বেশি অবদান থাকে বুদ্ধিজীবীদের। গণতন্ত্রের সঠিক সংজ্ঞা নির্ধারণ করেন বুদ্ধিজীবীরা, সংস্কৃতির কাঠামো নির্মাণ করেন, মূল্যবোধ গঠন করেন, বিজ্ঞানমনস্ক করেন বুদ্ধিজীবীগণ। যুক্তিবাদী মন তৈরি করেন তাঁরা। বাংলাদেশকে একটি পঙ্গু অথর্ব দেশে পরিণত করার লক্ষ্য থেকে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়েছিলো। বুদ্ধিজীবীদের আত্মদান যাতে বৃথা না যায় সে দিকে লক্ষ্য রেখে আমাদের শিক্ষা নেয়া উচিত।