রাজধানীর বুকে পার্বত্য মেলা

পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর  উৎপাদিত পণ্যসামগ্রীর প্রচার ও বিপণনের মাধ্যমে তাদের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার লক্ষ্যে প্রতি বছরের মত এবারও এ মেলার  আয়োজন করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়।যদিও করোনা ভাইরাসের কারণে গত দুইবছর ধরে বন্ধ ছিলো এই মেলা।

পার্বত্য মেলা রাজধানীর বুকে বসছে প্রায় এক দশই ধরেই। মাঝে দুই বছর করোনার কারণে মেলা হয়নি। কিন্তু এ কমপ্লেক্সে মেলার আসর এবারই প্রথম। আগে মেলা হতো বেইলি রোডের এ জায়গায়, যখন কমপ্লেক্সের মাঠটি ফাঁকা ছিল। আবার শিল্পকলা একেডেমিতেও বসেছে কয়েকবার।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান গত বুধবার বেলা ৩টায় এ মেলার উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং।

৮ জানুয়ারি পর্যন্ত এ মেলায় ৯১টি স্টলে সরকারি প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী, প্রতিষ্ঠিত উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী, তিন পার্বত্য জেলায় উৎপাদিত কৃষিপণ্য সামগ্রী, হস্তশিল্প, ঐতিহ্যবাহী কোমর তাঁতে বোনা পণ্য এবং পাহাড়ি খাবার প্রদর্শন ও বিক্রির ব্যবস্থা থাকবে।

সেই সঙ্গে প্রতিদিন বিকাল ৫টা থেকে পাবর্ত্য জেলা রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলার শিল্পীদের অংশগ্রহণে হবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথাগত চাষপদ্ধতি জুমের ওপরই পাহাড়ি সমাজ নির্ভর করত একসময়। সেসব দিন পাল্টে গেছে। পার্বত্য তিন জেলা রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির দূর পাহাড়ি জনপদে জুমের জৌলুশ কমেছে। বছরের ঠিক এ সময়টায়, এই শুকনো শীতের মৌসুমে ফসল একেবারেই কম। কিছু মরিচ, নানা পদের আলুই জুমের সম্বল। এমন দুই পদের আলু, চাকমা ভাষায় যাদের নাম মো আলু ও জুরো আলু। দুই পদের আলু দেখিয়ে সজল কুমার চাকমা জানালেন, ‘এসব এসেছে খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি থেকে। মেলার জন্যই সংগ্রহ করেছি আমরা।’

সজল চাকমা পার্বত্য জেলা রাঙামাটি জেলা পরিষদের স্টল দেখভাল করছেন। এ স্টল বসেছে রাজধানীর বেইলি রোডের শেখ হাসিনা পার্বত্য চট্টগ্রাম কমপ্লেক্সের পার্বত্য মেলায়। কমপ্লেক্সের নিচতলায় এমন গোটা পঞ্চাশেক স্টল আছে, যেখানে পাহাড়ি সবজি, চাল, নানা ধরনের বীজ, নানা ফল–ফসলের সম্ভার।

১৯৯৭ সালে পার্বত্য চুক্তিতে থেমেছে দুই দশকের লড়াই। পাহাড়ের আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে এসেছে নানা পরিবর্তন। জুমের সঙ্গে অধুনা যুক্ত হয়েছে হর্টিকালচার বা ফলের বাগান। দেশি আম থেকে শুরু করে বিদেশি ড্রাগন ফল বা রাম্বুটান—বাদ নেই কিছুই। বয়নশিল্পের খ্যাতি তো পুরোনো। এই যে বিপুল পণ্যসামগ্রী তৈরি হচ্ছে পাহাড়ে, তার প্রচার ও প্রসার আর সেই সঙ্গে স্থানীয় মানুষের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা—পার্বত্য মেলা আয়োজনের লক্ষ্য এটাই। এ মেলার আয়োজক পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয় এমনটাই বলে।

পাহাড়ে ফল চাষের প্রসারে খ্যাতি আছে। পার্বত্য মেলায় পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের স্টলটি ঠাসা নানা ফলে। কী নেই সেখানে, লাল–সাদা–কালো তিন রঙের জুমের বিন্নি চাল, কলা, অপ্রচলিত কাজু, মাল্টা, কমলা অন্তত ৩০ ধরনের ফল–ফসল। বোর্ডের মিশ্র ফল প্রকল্পের বাগানে ফলে এসব, জানালেন প্রকল্প পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম। তবে নাগরিক ঢাকাবাসীর জন্য তথ্য, এসব ফল বিক্রি হবে না। মেলার এই এক প্রতিষ্ঠান, যাদের পণ্য ‘বিক্রির জন্য নহে’।

কিন্তু নগরবাসীকে নিরাশ করবে না মেলার পাহাড়ি বয়নশিল্পের ২০টির মতো স্টল। এসব বসেছে কমপ্লেক্সের তিনতলায়। তবে এগুলো ওপরে হওয়ায় আগের বছরগুলোর তুলনায় বিক্রিবাট্টা অপেক্ষাকৃত কম হচ্ছে বলেই জানান রাঙামাটি থেকে আসা তুষিতা চাকমা। তাঁর দোকানসহ প্রায় সব স্টলেই চাকমা নারীদের পিনন–হাদি, পুরুষের লুঙ্গি, মাফলার, নারীদের থ্রিপিস, চাদর, গামছা—অভাব নেই কিছু।

পোশাক, ফল–ফসল ছাড়াও খাদ্যরসিকদের জন্যও মেলায় আছে ভালো আয়োজন। বিন্নি চালের গরম গরম পিঠা, কলা পিঠা, বিন্নির লাড্ডু, বাঁশের ভেতরে রান্না মুরগির চুমো হেবাং, মমো কত কিছু। বান্দরবানের দুই বন্ধু ই মং আর পুন্যাহ মারমার স্টলে মারমাদের ঐতিহ্যবাহী মুংডি, মুরগির ঝাল মাংস আর সঙ্গে জাপানি খাদ্য রামেনের ফিউশন চোখে পড়ে। কেউ গেলে চেখে দেখতেই পারেন। আর হ্যাঁ এসব কেনাকাটা করে, খেয়েদেয়ে বিনোদনের খোরাক আছে। প্রতিদিন বিকেল পাঁচটা থেকে তিন পার্বত্য জেলার শিল্পীরা তুলে ধরবেন তাঁদের ঐতিহ্যবাহী গান, নৃত্য, নাটক। বিশাল কমপ্লেক্সের দুই প্রান্তে ঢাউস দুই পর্দায় মিলনায়তনের অনুষ্ঠান দেখা যাবে। ঘুরতে–কিনতে–খেতে খেতে সুর মিলবে কানে।

খাগড়াছড়ি থেকে আসার বিক্রেতা হুসুন চাকমা বলেন, এখানে প্রতিবছর আমাদের মেলা বসে। ভালো লাগে। করোনার জন্য ক্রেতা কম হলেও ভালো লাগছে।
ঘুরতে আসা এক দর্শনীর্থী বলেন, এখানে ঘুরতে এসে ভালো লাগছে। প্রথমবার এসেছি। আশা করছি সামনেও আসবো। পার্বত্য জেলার মানুষের জীবন বৈচিত্র প্রকাশ করছে এ মেলা।