এক নিঃশব্দ প্রেমের গল্প

   যারা সিনেমার খোঁজ খবর রাখেন তাদের জানা আছে বিশ্বময় ইরানি সিনেমার মূল্যায়ণ কিংবা বাজার দর কোন পর্যায়ে! ইরানি সিনেমার এই উৎকর্ষতা মূলত সেখানের কিছু মেধাবী নির্মাতাদের জন্যই। আব্বাস কিয়ারোস্তামি, মহসিন মখমাল্বফ,সামিরা মখমাল্বফ, আজগর ফারহাদি, বাহমান গোবাদি,দারেউস মেহেরজুই এবং মাজিদ মাজিদির মতোন বেশ কিছু সিনেমা স্রষ্টার বাস ইরানে। আব্বাস কিয়ারোস্তামি কিংবা মহসিন মখমাল্বফের সিনেমা কিছুটা পোয়েট্রিক এবং সর্ব সাধারণের বোধগম্য না হলেও বাহমান গোবাদি কিংবা মাজিদ মাজিদির ছবিগুলো সর্বসাধারণের সাথে কানেক্ট করে যায়। বিশেষ করে মাজিদির ছবিগুলো ‘চিল্ড্রেন অফ হ্যাভেন’থেকে ‘দ্য উইলো ট্রি’ ও ‘সংস অফ স্পেরো’; সবগুলোই! তার প্রত্যেকটি সিনেমাই অসাধারণ, কি গল্পে, কি নির্মাণে! এর মধ্যে ‘বারান’ অন্যতম একটি।

‘বারান’সিনেমায় ইরানে বাস করা উদ্বাস্তু এক আফগান পরিবারের শুধুমাত্র করুণ কাহিনী উঠে এসেছে’বলে যারা মনে করেন তাদের সাথে সহমত পোষণ না করে বরং বলতে চাই বিশ্ব চলচ্চিত্র অঙ্গনে ‘বারান’অসাধারণ এক নিঃশব্দ প্রেমের সিনেমাও। প্রেমের সিনেমা হিসেবে নায়িকার হাত ধরে নায়কের মলামলি নেই যদিও, কিংবা নায়ক তার প্রেম প্রকাশ করতে যেয়ে নিজের হার্ট খুলে না ফেললেও; এই ছবিতে ‘What Is Love’ কাকে বলে তা স্বচক্ষে দেখতে পারবেন। ‘বেস্ট লাভ অলওয়েজ সাইলেন্ট’এই কথাটিরই যেন সফল চলচ্চিত্রায়ণ করেছেন মাজিদ মাজিদি তার ‘বারান’সিনেমায়।

ইরানিয়ান সিনেমার ক্ষেত্রে যা মনে হয়, এবং বরাবরই বলি সেটা তাদের সিনেমার মূল বিষয় হচ্ছে একটা ভালো গল্প বলে যাওয়া। হোক তা সাদামাটা, কিন্তু সিনেমায় ইরানিদের গল্প উপস্থাপনের যে ভঙ্গিমা তা মুগ্ধ হওয়ার মত। বারান সিনেমার কাহিনী প্রেক্ষাপট ১৯৭৯ সালের ইরান। সোভিয়েত আমলে যখন তালেবানরা আফগানিস্তানে গৃহযুদ্ধ বাধিয়ে ফেলেছে। তখন প্রায় ১৫ লাখ আফগান ঘর ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছিল পাশের দেশ ইরানে। আশ্রয়হীন সেই মানুষদের গল্প নয় বারান, বরং অসাধারণ প্রেম আখ্যান হচ্ছে মাজিদির বারান। যথারীতি মাজিদির আর আর সিনেমার মতো বারানের কাহিনী খুব সাদামাটা।

ইরানিয়ান একটি আন্ডার কনস্ট্রাকশন বিল্ডিংয়ে কাজ করে একদল শ্রমিক, যেখানে আশ্রয়হীন কিছু আফগান শ্রমিকও কাজ করেন। মাঝেমাঝেই ওই নির্মাণাধীন বিল্ডিংটিতে হানা দেয় ইরানের সরকারি লোকজন, তারা খোঁজ করে কোনো অবৈধ আফগান বিল্ডিংটিতে কাজ করে কি না; কারণ তাদের জন্য ইরান সরকার আলাদা ব্যবস্থা করেছে। এইসব সরকারি লোকজন দেখলেই অবৈধ আফগান অবিবাসীরা ছুটোছুটি শুরু করে দেয়, কিংবা লুকিয়ে থাকে। তো ওই বিল্ডিংয়ে কাজ করার সময় পরে গিয়ে মারাত্মক আহত হয় বয়স্ক নাজাফ নামের এক আফগান শ্রমিক, তাকে কিছু টাকা পয়সা দিয়ে সেখান থেকে বিদায় করে সুপার ভাইজার। ক’দিন পর জানা হয়, ওই আফগান শ্রমিকটি পঙ্গুত্ব বরণ করেছে; এবং তার পরিবর্তে ওই বৃদ্ধের একটি তরুণ বয়সের ছেলে ‘রহমত’কে নিয়ে হাজির হয় তারই স্বজন। সুপারভাইজারকে অনুরোধ করে পঙ্গুত্ব বরণ করে নেয়া বৃদ্ধের ছেলেটিকে এখানে কোনো কাজ দিতে, তা না হলে তার পরিবার না খেয়ে থাকবে। সুপারভাইজার রহমতকে কাজ দেয়, কিন্তু রহমততো বালু, সিমেন্ট, ইট, সুড়কি বহন করার মত ভারি কাজ সে করতে পারে না। ফলত নির্মাণাধীন বিল্ডিংটিতে লতিফ নামের যে ছেলেটি সবাইকে বাজার করে রান্না করে খাওয়াত, একটু পর পর চা পান করাত সবাইকে; তাকে সেই কাজ থেকে অব্যাহতি দিয়ে রহমতকে সে কাজের জন্য মনোনীত করে দেয় সুপারভাইজার। সুখের দিন ছিল ছেলেটির, ইট, বালি, সুড়কি টানার চেয়ে তুলনামূলক সে সহজ কাজ করে বেড়াত। স্বাভাবিকভাবেই ছেলেটি রহমতের উপর বিগড়ে যায়, তাকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রাখে; তার জন্যইতো এত আরামের চাকরিটি গেল। ইরানি হওয়া সত্বেও এখন তাকে ভারি বোঝা বহন করে নীচ তলা থেকে উপর তলায় উঠানামা করতে হয়। খুব অসহ্য লাগে তার। রহমতের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে নানাভাবে হেনস্তা করার চেষ্টা করে সে। অন্যদিকে রহমতের হাতের রান্না খেয়ে নির্মাণাধীন বিল্ডিংয়ের সবাই তৃপ্তির ঢেকুর তুলে। তার প্রতি শ্রমিকদের প্রশংসা লতিফের ঈর্ষাবোধ আরো দ্বিগুন করে। রহমতের প্রতি নানাভাবেই সে বিক্ষিপ্ত, সে তাকে চা দিলে না পান করে লতিফ উবু করে কাপটি ফেলে দেয়; এমনকি তার হাতের রান্না পযর্ন্ত সে বিতৃষ্ণায় গেলে। রহমতও ব্যাপারগুলো ঠিকই বোঝে, কিন্তু সে কোনো কথা বলে না; শুধু মায়াবি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।

বারানের বিরহে কাতর লতিফএকদিন হঠাৎ লতিফ রান্না ঘরে ঢুঁ দিয়ে সে থ্ হয়ে যায়। নির্বাক হয়ে যায়, মুহুর্তেই তার মধ্যে রহমতকে নিয়ে জমানো সকল ক্রোধ বিলিন হয়ে যায়। কারণ রান্না ঘরে লতিফ যাকে দেখে, সে একজন মেয়ে! রহমত নামে ছদ্মবেশে সে এখানে কাজ করছে; আসলে তার নাম রহমত নয়; সেই হচ্ছে বারান। নির্মাণাধীন ভবনে পঙ্গুত্ব বরণ করা আফগান নাজাফের মেয়ে সে। এমনিতেই আফগানদের কেউ কাজ দেয় না, তারউপর সে মেয়ে; এদিকে ঘরে উপার্জনক্ষম কেউ নেই তার, ফলে বাধ্য হয়েই ছেলের বেশ ধারণ করে বাবার জায়গায় কাজ করতে আসে তরুণীটি। লতিফের বোধধয় ঘটে, সে ভাবে এতোদিন অন্যায় আচরণ করেছে মেয়েটির সাথে। নিজের মধ্যে এক ধরণের প্রেমেরও আভাস পায় ছেলেটি। মুগ্ধ দৃষ্টিতে বারানের দিকে অপলক চেয়ে থাকে সে। ইদানিং সে একটু পরিপাটি হয়েই বারানের সামনে যায়, মেয়েটির সাথে হঠাৎ সে খুব ভালো আচরণ শুরু করে দেয়। ক’দিন আগেও যে চা দিলে ফেলে দিত, এখন তার হাতের চা পান করতে সবার আগে দৌড়ে যায় লতিফ। ছদ্মবেশী আফগান মেয়েটির সবকিছু তারকাছে ভালো লাগতে থাকে। তার আচরণে মাত্র ক’দিনই বৈপ্লবিক পরিবর্তন সুচিত হয়। বারানকে প্রায় সারাক্ষণই চোখে চোখে রাখে সে, অন্যকেউ যাতে বুঝতে না পারে ‘রহমত’ নামের ছেলেটি আসলে বারান নামের একজন মেয়ে, এরজন্যই মূলত লতিফ তার পাশাপাশি থাকে। যদিও বোরান তখনও জানে না যে ছেলেটি তাকে চিনে ফেলেছে! কিন্তু একদিন নির্মাণাধীন ভবনে সরকারি লোকজন হানা দেয়, তাদের সামনে পড়ে ছদ্মবেশী মেয়েটি। কিছু বোঝার আগেই তাকে নিয়ে দৌড়ে যেতে থাকে লতিফ। কারণ লতিফতো জানে, যদি ‘বারান’ ধরা পড়ে, তাহলে সে যে মেয়ে এটা প্রকাশ হয়ে যাবে। সরকারি লোকজনের সাথে ধস্তাধস্তি করে মেয়েটি চলে যেতে বলে জাফর। ফলে আফগান ওই মেয়েটিকে আর ধরতে পারে না পুলিশ, উল্টো সরকারি কাজে বাধা দেয়ার অপরাধে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে আসা হয় লতিফকে। যদিও পরে সুপারভাইজার তাকে ছাড়িয়ে আনে, কারণ সেতো ইরানিয়ান শ্রমিক, তার ওয়ার্ক পার্মিট আছে।

ভবনে ফিরে বিষণ্ন লাগে লতিফের। কারণ ধাওয়া খাওয়ার পর এখানে আর মেয়েটি কাজ করতে আসে না। তার জন্য মন খারাপ হয় তার, হঠাৎ একদিন ছুটি নিয়ে তাকে খুঁজতে বেড়িয়ে পড়ে। অনেক নাটকীয়তার পর তাকে খুঁজে পায় সে, তবে এবার আর ছদ্মবেশে নয়; একেবারে মেয়ে রূপেই। দূর থেকে মেয়েটিকে দেখে সে, দেখে যে স্রোতস্বিনী ঝর্ণা ধারা থেকে বড় বড় পাথর কুড়ানোর কাজ করছে। এসব দেখে মেয়েটির প্রতি আরো সহানুভূতি জন্মে তার। মেয়েটির এমন কষ্ট দেখে চোখ ভরে যায় জলে। সত্যিই মেয়েটিকে ভালোবেসে ফেলে সে। মেয়েটির পঙ্গু বাবার সাথে দেখা করে, মেয়েটির বাবা নাজাফ তাকে দেখেই চিনে ফেলে; তার সাথে মিথ্যে বলে যে সুপারভাইজার তাকে টাকা দিয়ে পাঠিয়েছে। এদিকে আফগানিস্তানের পরিবেশও ঠান্ডা হয়েছে। এবার কিছু টাকা হলেই নিজ দেশে ফিরে যেতে পারে বারানের পরিবার। একথা শুনে ইরানিয়ান যুবক লতিফ, সে বারানের পরিবারের জন্য টাকা যোগানে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সুপারভাইজারের কাছ থেকে অগ্রীম টাকা নেয় সে, কিন্তু এই টাকাতো খুবই অপ্রতুল। তার আরো টাকা চাই, ফলে যে ওয়ার্কপার্মিটটি ছিল তাও অবশেষে বিক্রি করে দেয়। যথারীতি এবারো মিথ্যে বলেই সঞ্চিত সমস্ত টাকা এনে বারানের বাবা নাজাফের কাছে তুলে দেয় লতিফ। পৃথিবীর কেউ হয়তো বুঝতে পারে না; কিন্তু বারান ঠিকই বুঝে, আর মায়াবী চোখে শুধু চেয়ে থাকে যুবকটির দিকে। অতঃপর একদিন ঠিকই কোনো স্মৃতি না রেখেই বারান ফিরে যায় নিজের দেশে, ও হ্যাঁ, একটি স্মৃতি সে রেখে যায় বটে, কাদার মধ্যে তার পায়ের চিহ্ন। কিন্তু সেটাও যে বৃষ্টিতে মিলিয়ে যায়। ছবির শেষ দৃশ্যটি ‘মন্তাজ’হিসেবে অসাধারণ, কিন্তু স্মৃতিচিহ্ন মিলিয়ে গেলেও তাদের পরস্পরের মধ্যে যে আত্মিক সম্পর্ক তা ঠিকই অটুট থাকে। এভাবেই এক ধরণের বিষাদময়তা নিয়ে শেষ হয় সিনেমা ‘বারান’।

ইতালিয়ান পরিচালক নাকি একবার মনের দুঃখে বলেছিলেন ‘Film making has now reached the same stage as sex – it’s all technique and no feeling.’’। তিনি হয়তো ইরানিয়ান সিনেমাগুলো না দেখেই এই কথাটা বলে ফেলছিলেন; দেখলে নিশ্চয় এই কথা তিনি বলতেন না। ইরানিয়ান সিনেমার দর্শক মূলত কাহিনীর সাথে নিজেদের আবদ্ধ করে ফেলেন,মিলে মিশে একাকার হয়ে যান সিনেমার গল্পের সাথে; ইরান সিনেমার দর্শকদের বোঝার দরকার হয় না লাইট, সেট আর ক্যামেরার কারিকুরি। সিনেমা নির্মাণকারীও কোন ধরণের মাতব্বরি না করে সাধারণ একটি গল্পকে অসাধারণ করে চিত্রায়িত করে ফেলেন। এই অর্থে নির্মাতা মাজিদ মাজিদির এক অসাধারণ চিত্রায়ন বলা যেতে পারে ‘বারান’কে।

সাধারণ একটি গল্প অথচ অথচ মাজিদ মাজিদির হাতে পড়ে তা আর সাধারণ থাকে না; হয়ে উঠে অদ্ভুত অসাধারণ এক চিত্রায়ণ। কাহিনীর সাথে দর্শকের মিলে মিশে একাকার হয়ে যাওয়াটাই ইরানি সিনেমার বিশেষত্ব। কাহিনী দর্শককে টেনে সামনে নিয়ে যায়; এখানে অতিনাটকিয়তা নেই। হয়তো মন্থর গতি, কিন্তু কোথাও অসঙ্গতি নেই, পাত্র-পাত্রীর মাঝে কোনো অতি-অভিনয়ের বিন্দু মাত্র লেশ পাওয়া যায় না পুরো সিনেমায়। মাথায় হিজাব আর সাড়া শরীর কালো বোরকায় ঢাকা থাকলেও নায়িকাকে কখনোই মনে হয় না গ্ল্যামারলেস। সব মিলিয়ে এক অসাধারণ নির্মাণই বলা যেতে পারে ‘বারান’কে।