আব্দুল্লাহ আল মাসুদ, সিরাজদিখান (মুন্সীগঞ্জ)
ডিসেম্বর ২৭, ২০১৯, ১০:০৬ এএম
মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে দিন দিন খেজুর গাছ হারিয়ে গেছে। এক শ্রেণির গাছির অসাবধানতার কারণে গাছের মাথা মরে যাচ্ছে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গাছি না থাকায় খেজুর গাছের রস বের করার সঠিক পদ্ধতি না জানার কারণে অনেক খেজুর গাছ অকালে মরে গেছে।
এছাড়া জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের কারণে প্রায় খেজুর গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। এসব কারণে দিন দিন খেজুর গাছ বিলুপ্ত হওয়ায় খেজুরের রস ও খেজুর গাছ এখন আর দেখা যায়না।
জানা যায়, আরবি খেজুর পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীনতম ফল। প্রধানত পূর্ব ও উত্তর আফ্রিকা দেশগুলোতে এ ফলের চাষ প্রচলন বেশি। অনেকের মতে ইরাক অথবা মিসর খেজুর ফলের আদি স্থান।
প্রাচীনকাল থেকে খেজুর ফলের বাগান সৃষ্টি করা এবং তা থেকে প্রাপ্ত খাদ্য ও ফলের উৎস হিসেবে খেজুর মানুষের জীবন ধারণের অন্যতম অবলম্বন ছিল। আরব দেশগুলোর মরুভূমি এলাকায় যেখানে অন্য কোনো গাছপালা জন্মানো সহজ হয় না সেখানে খেজুর বাগান সৃষ্টি করে মরুদ্যান সৃষ্টি করা হতো।
আরবি খেজুর যেসব দেশে বেশি চাষ হয় তার মধ্যে মিসর, সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, পাকিস্তান, আলজেরিয়া, সুদান, ওমান, লিবিয়া ও তিউনেশিয়া অন্যতম। চীন, ভারত ও আমেরিকার কিছু অংশে সফলভাবে খেজুর চাষ করা হচ্ছে।
রমজান মাসে সৌদি খেজুর দিয়ে ইফতারি করার প্রচলন মুসলিম দেশগুলোতে আছে। বাংলাদেশসহ সব মুসলিম দেশ প্রচুর খেজুর আমদানি করে অথবা নিজেদের উৎপাদন থেকে রমজান মাসে প্রচুর খেজুরের চাহিদা পূরণ করে থাকে।
আর বাংলাদেশের বৃহত্তর ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশালসহ সারা দেশে কম-বেশি খেজুর চাষ করা হয় মূলত রস ও গুড় তৈরির কাজে। দেশি জাতের খেজুর গাছে যে পরিমাণ ফল ধরে তা উন্নত মানের নয়, তাই ফল হিসেবে খাওয়ার তেমন প্রচলন নেই।
গত ১৫-২০ বছর ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকার কিছু আগ্রহী চাষি সীমিত আকারে খেজুর চাষ করে সফল হয়েছে। তারা বীজ থেকে তৈরি বাগান করায় তাতে জাতের গুণাগুণ রক্ষা হয় না। আধুনিক সঠিক প্রযুক্তি ব্যবহার ও পরাগায়নে সক্ষমতার অভাবে খেজুর গাছ থেকে তারা কম ফলন পায়।
উপজেলার বয়রাগাদী ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. সেন্টু মিয়া বলেন,একসময় গৌরব আর ঐতিহ্যের প্রতীক মধুবৃক্ষ থেকে সু-মধুর রস বের করে গ্রামের ঘরে ঘরে পুরোদমে শুরু হতো পিঠা, পায়েস ও গুড় পাটালি তৈরির ধুম।
গ্রামে গ্রামে খেজুরের রস দিয়ে তৈরি করা নলের গুড়, ঝোলা গুড়, দানা গুড় ও পাটালি গুড়ের মিষ্টি গন্ধেই যেন অর্ধভোজন হয়ে যেতো। খেজুর রসের পায়েস, রসে ভেজা পিঠাসহ বিভিন্ন সুস্বাদু খাবারের তো জুড়িই ছিল না। কিন্তু কালের আবর্তে প্রকৃতি থেকে আজ খেজু গাছ একেবারেই হারিয়ে গেছে।
সিরাজদিখান উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুবোধ চন্দ্র রায় বলেন, আমাদের দেশে খেজুরের চাষ করা যায়। যে এলাকাগুলোতে পর্যাপ্ত রোদ, কম আর্দ্রতা, শুকনা ও কম বৃষ্টিপাত, উষ্ণ আবহাওয়া এ ফল চাষের জন্য উপযোগী। বেশি শীত এবং সাময়িক জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ত সহিষ্ণু গুণাগুণ এ গাছের আছে।
ফুল ফোটা ও ফল ধরার সময় বেশি বৃষ্টিপাত ভালো না। একই কারণে এ দেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলীয় এবং পার্বত্য জেলাগুলোতে সৌদি খেজুর চাষ সম্প্রসারণ করার সুযোগ আছে। বেলে-দো-আঁশ মাটি এ জাতের খেজুর চাষের জন্য বেশি উপযোগী।
খেজুরের চারা সমতল থেকে এক ফুট ওপরে রোপণ করতে হবে। এজন্য গর্ত ভরাট করা মাটি উঠিয়ে মধ্যভাগ উঁচু করে নিতে হবে। এরপর ক্রমান্বয়ে তা বাইরের দিক ঢালু করে নালা বরাবর মিলাতে হবে।
গাছ রোপণ করা হলে গাছের গোড়া থেকে ২.৫ ফুট দূরে বৃত্তাকার করে ১০-১২ ইঞ্চি চওড়া ও ১২ ইঞ্চি গভীর নালা তৈরি করে এ নালার মাটি বাইরের দিক সুন্দরভাবে বৃত্তাকারে উঁচু আইল বেঁধে দিতে হবে। গাছ রোপণ শেষে নালায় ৮-১০ দিনের ব্যবধানে পানি দিয়ে নালা ভর্তি করে দিতে হবে। গাছ এ নালার পানি শুষে নেবে।
এমআর