সিন্ডিকেটে বেসামাল সবজিবাজার

আব্দুল কাইয়ুম প্রকাশিত: মে ২০, ২০২৩, ০৯:৪৮ এএম
সিন্ডিকেটে বেসামাল সবজিবাজার

নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে কাঁচাবাজার। উল্লম্ফন গতিতে বেড়েই চলছে মাছ, মাংস ও সবজির দাম। ত্রেতারা বলছেন, কতিপয় সিন্ডিকেটের খপ্পরে বেসামাল কাঁচাবাজার। অতিরিক্ত মুনাফার আশায় দ্রব্যের দাম কয়েকগুণ বৃদ্ধি করেছেন ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, টানা খরায় ফসলের অনেক ক্ষতি হয়েছে। এরপরই ঘূর্ণিঝড় মোকার প্রভাবেও কাঁচাবাজারে পণ্যের দামে ছন্দপতন হয়েছে। এদিকে জ্বালানি ও সারের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। দেশে পর্যাপ্ত ডলার না থাকায় এলসি করতে পারছেন না আমদানিকারকরা। এ ছাড়া পরিবহন খরচও বেড়েছে বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের। 

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, বাজার আড়তদার সিন্ডিকেটে সাধারণ মানুষ জিম্মি হয়ে পড়েছে। তাদের অতিরিক্ত মুনাফার কারণে কয়েকগুণ চড়া দামে সাধারণ মানুষকে কিনতে হচ্ছে তরকারি। অভিযোগ উঠেছে, প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা, বাজার মনিটরিং কমিটি ও প্রশাসনকে ম্যানেজ করে দিনের পর দিন সিন্ডিকেটের অবৈধ কারবার চলছে। রমজানে নিত্যপণ্যে দাম কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে থাকলেও এখন বেসামাল হয়ে পড়েছে রাজধানীসহ সারা দেশে কাঁচাবাজার। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম প্রতিদিন বেড়েই চলেছে। মাছ, মাংস ও সবজির বাজার দিন দিন আরও চড়া হচ্ছে। আদায় লেগেছে আগুন, জিরার দাম অস্বাভাবিক। আর পেঁয়াজ, কাঁচামরিচের দাম এখন আকাশছোঁয়া। তেল-চিনি, মাছ-মাংসের দাম বাড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন পদের মসলার অস্বাভাবিক দাম। গতকাল শুক্রবার সকালে রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, পেঁয়াজ, আদা ও রসুনের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম গত সপ্তাহের চেয়েও বেড়েছে। সাধ্যের মধ্যে মিলছে না মাছ। বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মাত্র এক দিনের ব্যবধানে বাজারে প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম ১০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়। ৩০০ টাকা কেজির কমে মিলছে না আদা। চীন থেকে আমদানি করা ভালো মানের আদার দাম উঠেছে কেজিপ্রতি ৪০০ টাকায়। 

সবজির বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সপ্তাহের ব্যবধানে কোনো সবজির দাম কমেনি; বরং এ বছর চড়া দামের সবজির তালিকায় যোগ হয়েছে সচরাচর স্থিতিশীল থাকা আলুও। এখন অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বাড়তি দামে আলু কিনতে হচ্ছে ক্রেতাদের। বাজারে আলুর দাম আরও বেড়ে এখন প্রতি কেজি ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যা গত দুদিন আগেও ছিল ৩৫ টাকা। আলুর দাম বাড়ার বিষয়টি উঠে এসেছে ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যেও। সংস্থাটি বলছে, বাজারে গত এক মাসের ব্যবধানে আলুর দাম ২৯ শতাংশ বেড়েছে। ওয়েব সাইটে দেয়া সংস্থাটি জানিয়েছে, রাজধানীর বাজারগুলোতে গত সপ্তাহের তুলনায় দেশি পেঁয়াজ কেজিতে ১৫ টাকা বেড়ে ৭৫ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত এক মাসে পেঁয়াজের দাম কেজিতে ১২১ শতাংশ বেড়েছে বলে সরকারি এই সংস্থাটির তথ্যে দেখা গেছে। সপ্তাহের ব্যবধানে দেশি ও আমদানি রসুনের দাম পরিবর্তন হয়নি, কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৪০ থেকে ১৬০ টাকায়। দেশি আদা কেজি ৩২০ থেকে ৩৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে এবং আমদানি আদা কেজি ২৫০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কাঁচামরিচের কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৩০ থেকে ২০০ টাকায়।

আর বছরের ব্যবধানে দাম বেড়েছে প্রায় ৭৪ শতাংশ। গত বছর এ সময়ে প্রতি কেজি আলুর দাম ছিল ১৮ থেকে ২৫ টাকা। যা এখন ৩৫ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সবজির পাশাপাশি উত্তাপ ছড়াচ্ছে মাছের বাজারও। হুট করে সব ধরনের মাছের দাম কেজিপ্রতি ৩০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ৬০০ টাকা কেজির কমে কেনা যাচ্ছে না টেংরা, কই, শিং ও চিংড়ি মাছ। চাষের রুই-কাতলা বিক্রি হচ্ছে ৩২০ টাকার বেশি দামে। দুই কেজি বা তার চেয়ে বড় হলে দাম কেজিতে আরও ১০০-২০০ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে। এমনকি ছোট আকারের পাঙ্গাশ-তেলাপিয়া মাছের দামও এখন কেজিপ্রতি ২৪০-২৫০ টাকা। যা স্বাভাবিক সময়ে ২০০ টাকা কেজি বা তারও কমে পাওয়া যেত। খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভারতের পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ থাকায় দেশি পেঁয়াজের ওপর চাপ বাড়ছে। এর প্রভাবে দাম বাড়ছে। আমদানিকারকরা বলছেন, বাজার স্বাভাবিক রাখতে আমদানির বিকল্প নেই। পেঁয়াজ আমদানি না করা গেলে বাজার আরো ঊর্ধ্বমুখী হবে। কারণ বাজারে দেশি পেঁয়াজের সরবরাহ কমে গেছে। ঋণপত্র খোলায় (এলসি) জটিলতার কারণে চাহিদামতো আদা ও রসুন আমদানি করতে পারছেন না তারা।

আমদানিকারক সংস্থা অ্যাগ্রো কমোডিটি ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রেজাউল করিম আজাদ বলেন, চীন থেকে সবচেয়ে বেশি আসে আদা ও রসুন। চীনে এখন আদার বুকিং দর অনেক চড়া। দুই হাজার ৫০০ ডলারের আদা কিনে দেশের বাজারে পৌঁছতে কেজি ৩০০ টাকার ওপরে পড়বে। এই দামে তো আদা বিক্রি হবে না। রসুনের অবস্থাও তাই। এদিকে হঠাৎ করেই গরম হয়ে উঠেছে মসলাজাতীয় পণ্যের বাজার। মাত্র এক মাস আগে যে পেঁয়াজ ৩০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে তার দাম এখন ৮০-৯০ টাকা। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ৫০-৬০ টাকা। একইভাবে এক মাসের ব্যবধানে ১০০ টাকার রসুন হয়েছে ১৮০-২০০ টাকা, ২৫০ টাকার আদা হয়েছে ৩৫০ টাকা। এর বাইরে আমদানি করা সব ধরনের গরম মসলারও দামও বেড়েছে অস্বাভাবিক। বিক্রেতারা বলছেন, সামনে কোরবানির ঈদ থাকায় মসলার দাম আরও বাড়বে। এদিকে আমদানিকারক ও পাইকারি মসলা ব্যবসায়ীরা দাম বৃদ্ধির জন্য চারটি কারণ উল্লেখ করছেন। তাদের মতে, প্রধান কারণ ডলারের দাম বৃদ্ধি। দ্বিতীয় কারণ এলসি খোলায় জটিলতা, তৃতীয়ত, উচ্চ শুল্ক আরোপ এবং চতুর্থ কারণ বিশ্ববাজারে দাম বৃদ্ধি। তবে বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্যবসায়ীরা যেসব কারণ উল্লেখ করছেন, তার সব সঠিক নয়। তারা সংকটের কথা বলে সিন্ডিকেট করে দাম বাড়াচ্ছে মসলার। 

বাজার দর নিয়ে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা নানামুখী সংকটের কথা বলে সিন্ডিকেট করে মসলার দাম বাড়াচ্ছে। এভাবে সব ধরনের ভোগ্যপণ্যের যদি অস্বাভাবিক দাম বাড়ানো হয় তা হলে দেশের মানুষ কীভাবে বাঁচবে। তাদের তো আর আয় কমছে না। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও কেন জানি ঢিলেমিভাব দেখাচ্ছে বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে। এটি মোটেই কাম্য নয়। সরকারি বিপণন প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের তথ্য বলছে, খুচরা বাজারে এক বছর আগে পেঁয়াজের কেজি ছিল ৪০ টাকা, আর এক মাস আগে ছিল ৩০ টাকা। আর এখন বিক্রি হচ্ছে ৮০-৯০ টাকায়। এক বছর আগে রসুনের কেজি ছিল ৮০ টাকা, এক মাস আগে ১০০ টাকা এখন বিক্রি হচ্ছে ১৮০-২০০ টাকায়। এক বছর আগে আদার কেজি ছিল ১০০ টাকা, এক মাস আগে ছিল ২৫০ টাকা, আর এখন দাম হয়েছে ৩৫০ টাকা। গরম মসলার মধ্যে এক বছর আগে জিরার কেজি ছিল ৪০০ টাকা, এক মাস আগে ৬০০ টাকা এবং এখন বিক্রি হচ্ছে ৮০০ টাকা কেজিতে। দারুচিনির কেজি এক বছর আগে ছিল ৪০০ টাকা, এক মাস আগে ৪২০ টাকা, এখন হয়েছে ৫২০ টাকা। এক বছর আগে লবঙ্গের কেজি ছিল এক হাজার ২০০ টাকা, এক মাস আগে এক হাজার ৪০০ টাকা, এখন হয়েছে এক হাজার ৬০০ টাকা। এভাবে সব ধরনের মসলার দাম বেড়েছে অস্বাভাবিক।