সরকার ও ইসির জন্য বড় পরীক্ষা
—নাজমুল আহসান কলিম উল্লাহ
হিরো আলম থাকলেও হয়তো কিছুটা প্রতিযোগিতা হতো
—বদিউল আলম মজুমদার
চিত্রনায়ক ফারুকের মৃত্যুর পর শূন্য হয় ঢাকা-১৭ আসন। এই আসনে উপনির্বাচনের জন্য তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। এরপর থেকেই আলোচনা ছিল কে হচ্ছেন ঢাকা-১৭ আসনের নৌকার কাণ্ডারি। রাজপথের প্রধান বিরোধীদল বিএনপি রাজনীতির মাঠে থাকলেও ভোটের মাঠে অনুপস্থিত রয়েছে। আ.লীগ অবশ্য বলছে, অন্যের কাধে ভর করে ভোটের মাঠে ঠিকই আছে বিএনপি। ঢাকা-১৭ আসনে ক্ষমতাসীন আ.লীগের প্রার্থী ইতোমধ্যে চূড়ান্ত করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের যাচাই-বাছাই পর্বেও টিকে গেছে টেলিভিশনের পরিচিত মুখ মোহাম্মদ আলী আরাফাত। ভোটের মাঠে আরাফাতের তেমন পরিচিতি না থাকলেও নৌকার প্রার্থী হিসেবে মাঠ থাকবেন তিনি। এ নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নিলেও আলোচিত ইউটিউবার হিরো আলম প্রতিদ্বন্দ্বিতা ঘোষণা করায় নেটিজেনদের মধ্যে কিছুটা আগ্রহ তৈরি হয়। কিন্তু গতকাল নির্বাচন কমিশন তার মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করায় হিরো আলমের ভক্তরা হতাশ হয়েছেন। আর নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলছেন, যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকায় শেষ পর্যন্ত ভোট প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হচ্ছে না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ঢাকা-১৭ আসনে গোপনে গোপনে আ.লীগ যাকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করত অর্থাৎ আশরাফুল আলমের (হিরো আলম) প্রার্থিতা বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন। এতে স্থানীয় ভোটাদের মধ্যেও নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ কমে যাবে বলে মনে করছেন তারা। তবে হিরো আলমসহ যাদের প্রার্থিতা বাতিল করা হয়ে তাদের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন ঢাকা-১৭ আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মুনীর হোসাইন খান। তিনি জানান, অসম্পূর্ণ ফরম, ভোটারদের স্বাক্ষর না থাকাসহ বেশ কিছু কারণে আটজনের মনোনয়ন বাতিল করা হয়। তিনি আরো বলেন, বাতিল হওয়া ব্যক্তিরা চাইলে নির্বাচন কমিশনে আপিল করতে পারবেন। এই আসনে ১৫ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন, এর মধ্যে সাতজনের মনোনয়নপত্র বৈধ হয়েছে, বাকি আটজনের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।
বৈধ প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, জাতীয় পার্টি সিকদার আনিসুর রহমান, বাংলাদেশ কংগ্রেসের মো. রেজাউল ইসলাম স্বপন, গণতন্ত্রী পার্টির মো. কামরুল ইসলাম, গণতন্ত্রী পার্টির অশোক কুমার ধর (মহাসচিব মনোনয়ন দিয়েছেন) বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের মো. আখতার হোসেন, তৃণমূল বিএনপির শেখ হাবিবুর রহমান। এ ছাড়া মনোনয়ন বাতিল হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন জাকের পার্টির কাজী মোহাম্মদ রাশিদুল হাসান, জাতীয় পার্টির রওশন এরশাদপন্থি মোহাম্মদ মামুনুর রশিদ, মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম ভূঁইয়া স্বতন্ত্র, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট বিএনএফের মো. মুজিবুর রহমান, আবু আজম খান স্বতন্ত্র, আশরাফুল হোসেন (হিরো আলম) স্বতন্ত্র, শেখ আসাদুজ্জামান জালাল।
জানা গেছে, এই নির্বাচনকে ঘিরে জাতীয় পার্টির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব প্রকাশ্য হয়েছে। পার্টির চেয়ারম্যান ও প্রধানপৃষ্ঠপোষক দলীয় মনোনয়ের ক্ষেত্রে ভিন্ন মেরুতে অবস্থান করছেন। দুজন দুই ব্যক্তিকে দলীয় মনোনয়ন দিয়ে নিজেদের দ্বন্দ্ব আরেক দফা প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছেন। অবশ্য জাপার প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম রওশন এরশাদের মনোনীত প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল হয়ে যাওয়ায় এ ইস্যুতে দ্বন্দ্বের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা আপাতত থাকছে না। এ দিকে বহুদিন পর এ আসনে ব্যালটে ভোট হতে যাচ্ছে। যদিও এ নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। অনেকেরই প্রশ্ন, গাজীপুর, বরিশাল, খুলনাসহ বেশ কয়েকটি নির্বাচন ইভিএমে হলেও হঠাৎ করে ঢাকার এই গুরুত্বপূর্ণ আসনের নির্বাচন ব্যালটে কেন? এ প্রসঙ্গে রিটার্নিং কর্মকর্তা মুনীর হোসাইন খান বলেন, এই সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনের, আমি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। আমার কাজ শুধু নির্বাচন পরিচালনা করা, আমি সেটিই করছি।’
অবশ্য ক্ষমতাসীন দল আ.লীগের প্রার্থী মোহাম্মদ আলী আরাফাত মনে করেন, এটি সঠিক সিদ্ধান্ত। যখন ইভিএমে নির্বাচন হয়েছে, তখন সেটিকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। আর এখন যখন ব্যালটে নির্বাচন হচ্ছে কেউ কেউ সেটাকেও ভালোভাবে দেখছে না। ব্যালট পেপার থাকলে জোর করে সিল মারার প্রবণতা থাকে, সে কারণেই ব্যালটে যাওয়া হলো কি-না জানতে চাইলে আ.লীগের এই প্রার্থী বলেন, ‘আমরা সুষ্ঠু একটি নির্বাচন চাই, সেটি যেভাবেই হোক।’
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ঢাকা-১৭ আসনের নির্বাচনটি গুরুত্ব বহন করছে সব মহলে। এটি নির্বাচন কমিশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন অনেকে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে এই উপনির্বাচনটি নির্বাচন কমিশনের জন্য এটি বড় পরীক্ষা। বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ইসি স্বচ্ছতার পরিচয় দিতে পারেনি বলে নির্বাচন সংশ্লিষ্টদের অনেকেই দাবি করেছিলেন। সে ক্ষেত্রে ঢাকা ১৭ আসনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান ইসির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। যেহেতু এই উপনির্বাচনে আ.লীগের শক্ত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই, সেহেতু এতে ঠিক কত শতাংশ ভোটার কেন্দ্রে আসবে তা নিয়ে চিন্তায় রয়েছে ক্ষমতাসীনরা। মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় আশরাফুল আলম বলেন, ‘তার জনপ্রিয়তার কাছে হেরে যাবে বলেই মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। তিনি বলেন, বারবার আমার মনোনয়ন বাতিল করা হয়, আমাকে হাইকোর্টে যেতে হয়, আমি নির্বাচন করার বেশি সময় পাই না। আমার জনপ্রিয়তাকে ভয় পায় বলেই আমাকে শুরুতেই হারিয়ে দেয়া হয়।’
সামগ্রিক বিষয় নিয়ে কথা হয় জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষক পরিষদের (জানিপপ) চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. নাজমুল আহসান কলিম উল্লাহর সঙ্গে। তিনি আমার সংবাদকে বলেন, বাংলাদেশের ধনকুবের অর্থাৎ এলিট শ্রেণির ব্যক্তিরা গুলশান (ঢাকা-১৭) এলাকায় বসবাস করে। এই আসন থেকে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদও নির্বাচন করেছেন। কাজেই আমরা বলতে পারি এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি আসন। সেখান থেকে যারা নির্বাচন করছেন যেমন ধরুন মোহাম্মদ আলী আরাফাত ও জাতীয় পার্টির শিকদার আনিসুর রহমান দুজনেই এবার প্রথমবার নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। কাজেই কিছুটা হয়তো নির্বাচনি আমেজ থাকতে পারে।
তিনি আরো বলেন, এই নির্বাচনে যেহেতু বিএনপি অংশ নিচ্ছে না সেহেতু একটু চাপ তো থাকবেই। জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে এই উপনির্বাচনের ওপর আন্তর্জাতিক মহলের নজর থাকবে। তাই এই নির্বাচন সরকার বা নির্বাচন কমিশন উভয়ের জন্যই বড় পরীক্ষা বলে আমি মনে করি। একটি বিষয় মনে রাখবেন, বিন্দু বিন্দু জলেই কিন্তু সিন্ধুর সৃষ্টি হয়, তাই এই নির্বাচন হালকাভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এ ছাড়াও তিনি বলেন, নির্বাচন ইভিএমে হবে নাকি ব্যালটে হবে সেই সিদ্ধান্ত একান্তই ইসির। আইনে তাদের সেই অধিকার দেয়া আছে।
এ প্রসঙ্গে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার আমার সংবাদের এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনের আগে এই উপনির্বাচনে ব্যালটের ব্যবহার ইতিবাচকভাবেই দেখছি। কেননা, ইভিএমের ভোট নিয়ে তো অনেক অভিযোগ রয়েছে। বরিশালের নির্বাচনেও ইভিএম নিয়ে অভিযোগ ছিল। তা ছাড়া হিরো আলমও অভিযোগ করেছিল, তাকে জোর করে হারিয়ে দেয়া হয়েছে। আমরা তো অনেক দিন ধরেই এটি বলে আসছিলাম। ব্যালটে নির্বাচন করলে আগের মতো ব্যালট ছিনতাই বা জাল ভোটের শঙ্কা দেখছেন কি-না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সেটি তো উড়িয়ে দেয়া যাবে না। কিন্তু সেটি করলে মানুষ তা দেখতে পাবে, জানাজানি হবে, এটি সরকারের জন্য ভয়াবহ হতে পারে। এই নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে কি-না, জানতে চাইলে এই বিশ্লেষক বলেন, মানুষ তো বেস্ট বেছে নেয়ার সুযোগই পাচ্ছে না। আপনাকে যদি মিনারেল ওয়াটার ও লাইনের পানি দেয়া হয় তখন আপনি সেটি বেছে নিতে পারবেন কিন্তু এখন তো সেটারই সুযোগ হচ্ছে না। হিরো আলম থাকলেও হয়তো কিছুটা প্রতিযোগিতা হতো এবং আওয়ামী লীগের জন্য কঠিন অবস্থা তৈরি হতো। তিনি বলেন, হিরো আলমকে পরিকল্পিতভাবেই নির্বাচন থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে যাতে করে তারা সহজেই নির্বাচনটি বিতর্ক ছাড়াই করতে পারে। জাতীয় নির্বাচনের আগে এই নির্বাচন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলেও মনে করেন ড. বদিউল আলম মজুমদার।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন