ডান-বামদের যত হিসাব

আবদুর রহিম প্রকাশিত: আগস্ট ২১, ২০২৩, ১১:৪৫ পিএম
ডান-বামদের যত হিসাব
  • দ্বাদশ নির্বাচনপূর্ব ডান ও বামপন্থিদের স্নায়ুযুদ্ধ এখন প্রায় দৃশ্যমান  
  • শেষবেলায় যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যাবে না ভারত—মনে করছেন অনেকে
  • দুর্নীতি ও ব্যাংক খেলাপি ব্যক্তির ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কা
  • দেশে ডানপন্থিদের বড় অংশই ভেতরে ভেতরে এক হয়ে যাচ্ছে  
  • আ.লীগ ও বিএনপিতে বামপন্থিরা আতঙ্কে   অনেকেই রেডমার্কে    
  • বিদেশিদের তুষ্ট করার অসুস্থ প্রতিযোগিতাকে দুঃখজনক বলছেন বিশ্লেষকরা

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভিনদেশিদের ছায়ালড়াই দৃশ্যমান হয়ে গেছে। জাতীয় নির্বাচনের আগে দেশের রাজনৈতিকপাড়াগুলোতে চলছে বিদেশি হস্তক্ষেপের হিসাব-নিকাশ। সাধারণ মানুষও নজর রাখছেন— বিদেশিরা কী করছেন। সমপ্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও একাধিকবার বলেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ক্ষমতার পরিবর্তন করাতে চায়। আওয়ামী লীগকে তাদের পছন্দ নয়। অন্যদিকে  পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত শেখ হাসিনা সরকারের পক্ষে মার্কিন সরকারকে প্রেসনোট দিয়েছে, তাতে বলা হয়েছে— হাসিনা সরকার দুর্বল হলে বাংলাদেশে ডানপন্থিদের উত্থান ঘটবে। সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দাবির আড়ালে এখানে ডান ও বামপন্থিদের একটি স্নায়ুযুদ্ধ চলছে। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন থেকে চীন, রাশিয়া ও ভারতের প্রভাবে এখানে বামপন্থিদের উত্থান ঘটেছে। আদর্শিক স্বার্থসিদ্ধি করতে গিয়ে বামপন্থিদের দ্বারা ডানপন্থিদের অনেকেই ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। গত কয়েক বছরে এর বড় একটি সমীকরণ মার্কিন সরকারের হাতে রয়েছে। 

এ ছাড়া বাংলাদেশের নির্বাচনি ব্যবস্থার ওপর মার্কিন সরকার যে অসন্তোষ রয়েছে তা নানাভাবেই প্রকাশ করা হয়েছে একই সঙ্গে সরকারকে দুর্নীতি, ব্যাংক খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেও ঐকমত্য হচ্ছে ডানপন্থি ব্লকের বড় অংশ। এ বিষয়টি আবার বামপন্থি ব্লকের হিন্দুস্তানি অংশ ভালোভাবে নিতে পারছে না। তারা মনে করছে, শেখ হাসিনা সরকারের পরিবর্তন হলে বাংলাদেশে ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দলের উত্থান ঘটবে। এ জন্য তারা বিএনপিকে ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানেরও রাজনৈতিক মূল ভিত্তি ছিল ডানপন্থি। তাই ওপারের বামপন্থিরা শেখ হাসিনা সরকারকেই আবার ক্ষমতায় রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। তবে সাবেক প্রেসিডেন্ট পুত্র তারেক রহমান দেশের ডানপন্থিদের পক্ষেই রয়েছেন বলে সূত্রের দাবি। নির্বাচনপূর্ব এ ব্লকের একটি বিস্ফোরণ হচ্ছে বলেই মনে করা হচ্ছে। তারেক রহমানের আহ্বানে দেশের সব ডানপন্থিরাই একজোট হয়ে যাবে। 

রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, রাজনৈতিক হিসাবের আড়ালে আদর্শ বাস্তবায়নের ভূ-রাজনীতিতে পড়ে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির অনেক হাইকমান্ডও এখন আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। বিএনপির মধ্যে বড় একটি বামপন্থি ভর করছে যেকোনো সময় ডানপন্থি যুক্তরাষ্ট্র ব্লকের বিজয় ঘটলে বিএনপির অনেকেই মাইনাস হয়ে যেতে পারেন। এ শঙ্কা কাজ করছে আওয়ামী লীগের মধ্যেও। যারা দীর্ঘ সময় বাম ব্লকের রাজনীতি করেছেন নির্বাচনকে সামনে রেখে তারা বড় ঝুঁকিতে রয়েছেন। আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে পর্দার আড়ালে এখন পর্যন্ত ডান ব্লকের অবস্থান বেশি মজবুত বলেই অনেকেই মনে করছেন। বড় দুদলের অনেকেই বাম ব্লককে চাপে ফেলতে শক্তিশালী ডান ব্লকের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন। দীর্ঘ সময়ে বাম ব্লকে থেকে যারা সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন তাদের সম্পদ যেকোনো সময় ক্রোক হতে পারে। ডানপন্থিদের হাতেই পুরোনো শক্তি আবার ফিরে যেতে পারে। ডানপন্থি রাজনৈতিক বিশ্লেষকের ভাষ্য, বাংলাদেশের প্রায় ৯০ শতাংশের উপরে ডানপন্থিদের অবস্থান। গুটিকয়েক বাম ব্লক এখানে আধিপত্য বিস্তার করে আদর্শ বাস্তবায়নে বড় একটি অংশকে জিম্মি করে রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেকেই এ অবস্থানকে ভালো চোখে দেখছে না। তাই আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে বেশির ভাগ মানুষের আদর্শের পথকে যুক্তরাষ্ট্র সাপোর্ট করবে বলে মনে করা হচ্ছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ভারত এখন উপরে উপরে সরকারের পক্ষে সাফাই গাইলেও শেষবেলায় এসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যাবে না তারা। ডানপন্থিদের গুরুত্ব দেয়ার জন্য মার্কিন সরকার আহ্বান জানালে নীরব রাজনীতির কৌশল গ্রহণ করবে ভারত। এতেও যদি ডানপন্থি ব্লক সুবিধা করতে না পারে তাহলে সুনির্দিষ্ট ব্যক্তির উপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে বলে সূত্রের দাবি। চলতি বছরের মাঝামাঝি থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ব্যাপারে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। প্রথমে বাংলাদেশকে গণতন্ত্র সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানায়নি। জো বাইডেন দায়িত্ব গ্রহণের পর বাংলাদেশের মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, বাংলাদেশের মানবাধিকার নিয়ে আপত্তি জানিয়ে র্যাবসহ র্যাবের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এরপর মার্কিন প্রশাসন থেকে সুস্পষ্টভাবে বলা হচ্ছিল, বাংলাদেশের আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন তারা অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং অংশগ্রহণমূলক দেখতে চায়। পিটার ডি হাস বাংলাদেশে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশমুখী অভিযান আরো শক্তিশালী হয়। বাংলাদেশের ব্যাপারে তাদের হস্তক্ষেপ এবং নানারকম তৎপরতা ক্রমশ চাপের পর্যায়ে চলে যায়। গত এক বছরে অন্তত ১০ জনের বেশি মার্কিন কর্মকর্তা বাংলাদেশে এসেছেন। উজরা জেয়া, ডেনাল্ড লুর মতো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও বাংলাদেশ সফর করে গেছেন। আগামী নির্বাচন পূর্ব মুহূর্তে তাদের শাক্তিশালী হস্তক্ষেপ আরো শক্তিশালী হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। 

বাংলাদেশে আওয়ামী বিরোধী রাজনৈতিকদল বিএনপিসহ অনেকেই এখন কোমর বেধে রাজপথে নামছেন। বিশেষ করে রাজপথের প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপি পদযাত্রা, গণমিছিল, অবস্থান কর্মসূচি, সমাবেশ, মহাসমাবেশের মতো কর্মসূচি দিয়ে নিজেদের শক্তি সঞ্চয় করেছে। আগামী সেপ্টেম্বরকে টার্গেট করে তারা আরো কঠিন কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামছে বলেও বিএনপি সূত্রগুলো বলছে। ঢাকা মুখী কর্মসূচিকে টার্গেট করেই তারা আন্দোলনের রোডম্যাপ ঠিক করেছে। বৃহৎ অবস্থান, সচিবালয় ঘেরাও, নির্বাচন কমিশন ঘেরাওসহ আরো কঠিন কর্মসূচি হাতে নিচ্ছে দলটি। এর সঙ্গে অন্য ডানপন্থি যে রাজনৈতিক দল রয়েছে তারাও সর্বশক্তি নিয়ে মাঠ নামবে। এ নিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলছেন, দেশে যে সংকট তা থেকে বের হতে রাজপথে নামা ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় নেই। 

তিনি বলেন,  ‘আমি আপনাদের একটি আশঙ্কার কথা বলি, এটি বলা দরকার, জাতির জানা উচিত। সরকার দেশে ভয়াবহ কিছু ঘটানোর পরিকল্পনা করছে, যাতে নির্বাচনে বিরোধী দলকে সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন করা যায়। তারা আরেকটি নির্বাচন করতে চায়, যেমন অতীতে করেছে।’সেটি আর হতে দেয়া হবে না।  আজকে বাংলাদেশে যে সংকট, সেই সংকটের মূলে হচ্ছে এই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একদলীয় শাসনব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্য। সেই লক্ষ্যে গত প্রায় ১৫ বছরে বাংলাদেশের মানুষের ওপরে যে অকথ্য নির্যাতন করা হয়েছে রাষ্ট্রকে দিয়ে, বলা যেতে পারে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস গড়ে তুলে ‘টোটালি একটি ডিপ স্টেট’ তৈরি করা হয়েছে। এখন এখানে যদি কোনো দেশ কোনো ব্যক্তির পক্ষে অবস্থান নেয় তা হবে দুঃখজনক। 

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের  এক মন্তব্যে বলেছেন, ‘২০-২২টি দেশে এ বছর নির্বাচন হচ্ছে। কিন্তু কোথায় কারও কোনো কথা, কোথাও নির্বাচন নিয়ে বা অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে কোনো কথা নেই। ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্ট প্রার্থীকে মেরে ফেলেছে। এসব নিয়ে তো কেউ কোনো কথা বলে না বড় বড় দেশ, শক্তিগুলো। আমাদের দেশ নিয়ে এত মাথাব্যথা কেন? কারণটা কী? আমরা তো বুঝি না।’ ইতিহাসবিদ সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেছেন  আমরা চাই একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হোক। জনগণ যেন ভোট দিতে পারে। জনগণ ভোট থেকে বিমুখ হয়ে গেছে। প্রতিটি উপনির্বাচনে ভোটারের উপস্থিতি আমাকে বেদনা জাগায়। আজকে বাংলাদেশ সঠিক পথে নেই। এর জন্য জনগণকে আবারও এগিয়ে আসতে হবে।’ ঢাকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ইব্রাহীম খলিল। তিনি বলেন, রাজনীতি-রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জন্য দ্বন্দ্ব-লড়াই এটি আমাদের জন্য দুঃখজনক। দেশ-জনগণের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে বিদেশি প্রভুদেরকে তুষ্ট করার অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে। আমাদের রাজনীতিকদের মধ্যকার এ আত্মঘাতী প্রতিযোগিতার পরিসমাপ্তি ঘটানো দরকার। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, নির্বাচন আসলে বিদেশিরা সব সময় তাদের স্বার্থ নিয়ে কথা বলে। তারা যাকে নিরাপদ মনে করবে তার পক্ষ হয়ে কাজ করছে। এগুলো নতুন বিষয় নয়। সব সময় হয়ে আসছে। এবারও তা দেখছি যুক্তরাষ্ট্র কিছু বললে অনেক রাজনৈতিক দল খুশি হচ্ছে। আবার ভারত কিছু বললেও কয়েকটা রাজনৈতিক দল খুশি হচ্ছে। এগুলোর প্রভাব কতটুকু পড়বে এখনি তা বলা যাচ্ছে না। তবে জনগণ যে দিকে তাদের রায় দেবে এবার তারাই বেশি শক্তিশালী হবে বলে মনে করছি।