দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিকল্প নেই
—অধ্যাপক ড. বে-নজির আহমেদ, জনস্বাস্থ্যবিদ
এক দিনে ১৩ মৃত্যু হাসপাতালে ১৬৭৩
উদ্বেগের কারণ ঢাকার বাইরের রোগী
ডেঙ্গু সারা বছরই থাকবে বর্ষায় বাড়বে শীতে কমবে
—অধ্যাপক ড. কবিরুল
বাশার, কীটতত্ত্ববিদ
চলতি বছর দেশে ডেঙ্গুতে রেকর্ড সংখ্যক আক্রান্ত ও মৃত্যু হয়েছে। বিগত বছরগুলোতে মে থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যু হতো বেশি। অক্টোবর মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ অনেকটাই কমে আসত। কিন্তু চলতি বছর অক্টোবর মাসেও বাড়ছে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। অক্টোবর মাসের প্রথম ১৩ দিনেই আক্রান্ত ৩১ হাজার ৭৯৮ এবং মৃত্যু ১৫৯ জনের। এমতাবস্থায় আসছে শীতে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতীতে শীতকালে সাধারণত ডেঙ্গুজ্বর হতো না, কিন্তু এডিস মশা তার ধরন পাল্টেছে। তাই শীত-বর্ষা গরম সব সময়ই ডেঙ্গু এখন হচ্ছে। সেই সঙ্গে আগামী শীতেও ডেঙ্গুর দাপট থাকবে। ডেঙ্গু রোগী বাড়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে মশার সংখ্যা বাড়ছে, আর প্রতিদিনই ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমারজেন্সি অপারেশন অ্যান্ড কন্ট্রোল রুম থেকে পাঠানো সর্বশেষ তথ্য বলছে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৫৬৬ জন আর মৃত্যু ছয় জনের। ফেব্রুয়ারি মাসে আক্রান্ত ১৬৬ জন মৃত্যু তিন জনের। মার্চ মাসে আক্রান্ত ১১১ জন মৃত্যু শূন্য। এপ্রিল মাসে আক্রান্ত ১৪৩ জন মৃত্যু দুজন। মে মাসে আক্রান্ত এক হাজার ৩৬ জন মৃত্যু দুজন। জুন মাসে আক্রান্ত পাঁচ হাজার ৯৫৬ জন মৃত্যু ৩৪ জন। জুলাই মাসে আক্রান্ত ৪৩ হাজার ৮৫৪ জন মৃত্যু ২০৪ জনের। আগস্ট মাসে ৭১ হাজার ৯৭৬ জন মৃত্যু ৩৪২ জনের। সেপ্টেম্বর মাসে ৭৯ হাজার ৫৯৮ জন মৃত্যু ৩৯৬ জনের। এ তথ্য শুধু ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেয়া রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা। আক্রান্ত হয়ে বাসায় চিকিৎসা নেয়া রোগী রয়ে যাচ্ছেন হিসাবের বাইরে। ঢাকা বাইরে রোগী বাড়ালেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। এতে রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চলতি বছর আক্রান্ত রোগীর মধ্যে ঢাকায় আক্রান্ত হয়েছেন ৯১ হাজার আটজন জন এবং ঢাকা বাইরে আক্রান্ত হয়েছেন এক লাখ ৪৪ হাজার ১৯৬ জন। ঢাকায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ৭১৭ জন এবং ঢাকার বাইরে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়ে ৪৩১ জনের। ডেঙ্গুতে মোট আক্রান্তের হার পুরুষ ৬০ দশমিক ৪ শতাংশ আর নারী ৩৯ দশমিক ৬ শতাংশ। ডেঙ্গুতে পুরুষ বেশি আক্রান্ত হলেও মৃত্যু বেশি নারীর। মোট মৃত্যুর ৬৫১ জন নারী এবং ৪৯৭ জন পুরুষ। ঢাকার শীর্ষ ১০টি এলাকায় আক্রান্তের তথ্য জানায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সেখানে দেখা যায়, ঢাকায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেশি যাত্রাবাড়ী এলাকায়। ঢাকার বাইরে ডেঙ্গু আক্রান্তের ১০টি জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ও মৃত্যু হয়েছে চট্টগ্রাম জেলায়। সারা দেশের বিভাগীয় পর্যায়ে ঢাকা ব্যতীত চট্টগ্রাম বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বেশি। আক্রান্ত সংখ্যা কম সিলেট বিভাগ।
ডেঙ্গুর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আমার সংবাদের এ প্রতিবেদক কথা বলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদের সাথে। তিনি বলেন, ‘আমাদের এখন দুটো বিষয় জানতে হবে। প্রথমটি হলো— ডেঙ্গু ভাইরাস মানুষের মধ্যে কতটুকু আছে, অন্যটি হলো মশার মধ্যে কতটুকু ভাইরাস আছে। ডেঙ্গু ভাইরাস মানুষের শরীরে ১৫ থেকে ২০ দিন স্থায়ী হয়। এ সময়ে ডেঙ্গু ভাইরাস বহনকারী কাউকে যদি এডিস মশা কামড়ায় সে মশা যদি আবার অন্য কাউকে কামড়ায় তাহলে কামড়ানো ব্যক্তি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হবে। বাহক যদি না থাকত তাহলে ডেঙ্গু আক্রান্ত বাড়ত না। বাহক আছে বলেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত বাড়ছে। আমাদের ডেঙ্গু ভাইরাস নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি খুব বেশি একটা কাজে আসছে না। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আমাদের প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। শীত আসতে যেহেতু এখনো এক মাস বাকি, তাই এখনই বলা যাচ্ছে না শীতে ডেঙ্গু পরিস্থিতি কেমন হবে। তবে আমাদের নভেম্বর মাস একটু বেশি সতর্ক থাকতেই হবে।’
কীটতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার। তার সাথে কথা বলেন আমার সংবাদের এ প্রতিবেদক। তিনি বলেন, ‘ডেঙ্গু আমাদের দেশে এখন সারা বছরই থাকবে, হয়তো কখনো বাড়বে কখনো কমবে। বর্ষাকালে বেশি থাকবে, শীতকালে কম থাকবে— এমনই হবে। স্থানীয় পর্যায়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।’
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন