সরকারি মেডিকেল কলেজ

শিক্ষক সংকট রেখেই আসন সংখ্যা বৃদ্ধি

সাহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া প্রকাশিত: অক্টোবর ২৫, ২০২৩, ১১:৩৪ পিএম
শিক্ষক সংকট রেখেই আসন সংখ্যা বৃদ্ধি
  • শিক্ষকদের প্রায় ৪০ শতাংশ পদ খালি
  •  অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপক পদ ফাঁকা বেশি

আসন বৃদ্ধি করা শিক্ষার্থীরা আগামী শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হবে। এ সময়ে শিক্ষকদের ফাঁকা থাকা পদ পূরণ হয়ে যাবে

 —অধ্যাপক ডা. মো. টিটো মিঞা

মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর

শিক্ষক সংকট রেখে মেডিকেল কলেজে আসন বৃদ্ধি একটি অপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত

 —ডা. ফয়জুল হাকিম

আহ্বায়ক, জনস্বাস্থ্য সংগ্রাম পরিষদ

মেডিকেল চিকিৎসা শিক্ষা দেয়ার লক্ষ্যে দেশে সরকারি ৩৭টি মেডিকেল কলেজের কার্যক্রম চালু রয়েছে। এর মধ্যে ২০টি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা হয়েছে গত দেড় দশকে। এসব মেডিকেল কলেজে প্রতি বছর চার হাজার ৩৫০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে সরকারি খরচে পড়ার সুযোগ পান। এসব মেডিকেল কলেজে শিক্ষকদের পদের বড় একটি অংশই ফাঁকা। এর মধ্যে সামপ্রতিক সময়ে প্রতিটি মেডিকেল কলেজ ২০ থেকে ৬০টি আসন বাড়িয়ে এক হাজার ৩০টি আসন বৃদ্ধি করার অনুমোদন দিয়েছে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর। স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৩৭টি সরকারি মেডিকেল কলেজে বর্তমানে শিক্ষকের পদ রয়েছে পাঁচ হাজার ৬৬৮টি। যার মধ্যে ফাঁকা রয়েছে দুই হাজার ৫৪৪টি পদ। সে অনুযায়ী সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোয় মোট পদের বিপরীতে শিক্ষকের ঘাটতি রয়েছে ৪৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ।

স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) বলছে, মেডিকেল কলেজের একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ন্যূনতম ১১টি বিষয় থাকা বাধ্যতামূলক। বিষয়গুলো হলো— অ্যানাটমি, ফিজিওলজি, বায়োকেমিস্ট্রি, কমিউনিটি মেডিসিন, ফরেনসিক মেডিসিন, ফার্মাকোলজি, প্যাথলজি, মাইক্রোবায়োলজি, সার্জারি, মেডিসিন এবং গাইনি ও অবস। যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এমবিবিএস (ব্যাচেলর অব মেডিসিন, ব্যাচেলর অব সার্জারি) ও বিডিএস (ব্যাচেলর অব ডেন্টাল সার্জারি) ডিগ্রি দেয়া হয়, সেগুলোর একটি সাধারণ নীতিমালা হলো প্রতি ১০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক থাকতে হবে। আর প্রতি ২৫ শিক্ষার্থীর জন্য ন্যূনতম একজন পোস্টগ্র্যাজুয়েট ডিগ্রিধারী শিক্ষক থাকতে হবে। যদিও সরকারি চিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এ শর্ত পূরণ করতে পারছে না। শিক্ষক সংকটের মধ্যে মেডিকেল কলেজগুলোতে আসন বৃদ্ধি চিকিৎসা শিক্ষার মান কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এসব প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপক পদেই শিক্ষকের ঘাটতি সবচেয়ে বেশি বলে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে। তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানগুলোয় অধ্যাপকদের জন্য পদ রয়েছে ৮০১টির মধ্যে ৫২৫টি ফাঁকা। এক হাজার ৩৭১টি সহযোগী অধ্যাপক পদের ৮৩৬টি ফাঁকা রয়েছে। এ ছাড়া সহকারী অধ্যাপক পদে দুই হাজার ১০০ পদের বিপরীতে ৮৩৩টি এবং এক হাজার ৩৯৬ প্রভাষক পদের বিপরীতে ৩৫০টি ফাঁকা রয়েছে।

মেডিকেল কলেজসমূহে আসন বৃদ্ধি ও শিক্ষক সংকট নিয়ে আমার সংবাদের এ প্রতিবেদক কথা বলেন স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. টিটো মিঞার সাথে। তিনি বলেন, আমাদের শিক্ষক সংকটের বড় একটি অংশ সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক পদে। এ সংকট মূলত পদোন্নতি জনিত কারণে। করোনা মহামারির কারণে পদোন্নতি পক্রিয়া কিছুটা জটিলতায় পড়ে। পদোন্নতির বিষয়টি দেখে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। খুব শিগগিরই বিভিন্ন পদে পদোন্নতিতে অপেক্ষমাণ থাকা শিক্ষকরা পদোন্নতি পাবেন। এতে করে শিক্ষক সংকট আর থাকবে না। আর বেসিক কিছু বিষয়ে শিক্ষক সংকট রয়েছে সেসব বিষয়ে আমরা সমন্বয় করে পাঠদান করছি। আসন সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়ে তিনি বলেন, সরকারি মেডিকেল কলেজে পড়া অনেক শিক্ষার্থীর কাছে লালিত স্বপ্ন। তা ছাড়া আমাদের দেশে জনসংখ্যা অনুপাতে চিকিৎসক বাড়াতে হবে। আসন বৃদ্ধির ফলে একজন শিক্ষার্থী মেডিকেল শিক্ষা লাভ করতে পারবে। এতে করে আমাদের চিকিৎসক সংকট কাটবে। আসন বৃদ্ধি করা শিক্ষার্থীরা ভর্তি হবেন আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে। এ সময়ে আমাদের মেডিকেল শিক্ষকদের যে ফাঁকা পদগুলো রয়েছে তা পূরণ হয়ে যাবে। তা ছাড়া আমাদের নতুন মেডিকেল কলেজগুলোতে অবকাঠামোগত কাজ চলছে। আমরা বিশ্ব মানের চিকিৎসা শিক্ষা দিতে পারব। আমরা ২০৩০ সালের মধ্যে সর্বজনীন চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করছি।

দীর্ঘ দিন সর্বজনীন চিকিৎসাসেবা ও মানসম্মত মেডিকেল শিক্ষা নিশ্চিতে আন্দোলন করছেন জনস্বাস্থ্য সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ডা. ফয়জুল হাকিম। শিক্ষক সংকট রেখে মেডিকেল কলেজসমূহে আসন সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়ে তার সাথে কথা বলেন আমার সংবাদের এ প্রতিবেদক। 

তিনি বলেন, শিক্ষক সংকট রেখে মেডিকেল কলেজে আসন বৃদ্ধি একটি অপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত। এ সিদ্ধান্তের ফলে মেডিকেল পাঠদান আরও জটিল হবে। মেডিকেল কলেজগুলোতে শিক্ষক সংকট একদমই নতুন কিছু নয়। গত এক দশক ধরে আমরা দেখছি শিক্ষক সংকট থেকেই যাচ্ছে। শিক্ষক সংকট নিরসনে আমরা এখনো কোন কার্যকরী পদক্ষেপ দেখছি না। এভাবে চলতে থাকলে দেশের মেডিকেল শিক্ষার মান আরও কমবে। তাই দ্রুত শিক্ষক সংকট নিরসন করে মেডিকেল কলেজের শিক্ষার মান উন্নয়ন করার পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। আর তা না হলে আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।