নৈতিক স্খলনে তিন শিক্ষক বরখাস্ত

মো. মাসুম বিল্লাহ প্রকাশিত: জানুয়ারি ১, ২০২৪, ১১:৪৮ পিএম
নৈতিক স্খলনে তিন শিক্ষক বরখাস্ত

তারা কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে উল্টো সবাইকে অমান্য করেছে

 - বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. বজলুর রশিদ মৃধা, সভাপতি স্কুল কমিটি

পিতৃ সমতুল্য শিক্ষকের দ্বারা ছাত্রী হেনস্তা হওয়ার ঘটনা খুবই বেদনাদায়ক

-ভুক্তভোগী ছাত্রীর বাবা

ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগে পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়ায় রাজপাশা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ইব্রাহীম কবিরকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এর আগে শিক্ষক কবির কর্তৃক ছাত্রী উত্ত্যক্ত করা হলে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করে উল্টো তাকে প্রশ্রয় দান করায় স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. হারুন আল রশিদ হাওলাদার ও সহকারী শিক্ষিকা সরস্বতী রাণীকেও স্কুল থেকে সাময়িক বরখাস্ত করেছেন ম্যানেজিং কমিটি ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। 

জানা যায়, সহকারী শিক্ষক ইব্রাহীম কবির বিভিন্ন সময় ছাত্রীদের বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে প্রেম পরে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে আসছে। বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা স্বরস্বতী রাণীর জোগসাজশে ইব্রাহীম নানা অপকর্ম করে। সম্প্রতি ওই বিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে প্রেমপত্র দিলে ছাত্রী তার অভিভাবকে জানায়। পরে ছাত্রীর অভিভাবক প্রেমপত্রের বিষয়টি প্রধান শিক্ষককে অবহিত করেন। কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যান প্রধান শিক্ষক। পরে বিদ্যালয় কমিটির সভাপতির নিকট ওই শিক্ষার্থীর অভিভাবক অভিযোগ করেন। অভিযোগের ভিত্তিতে স্কুল সভাপতি প্রধান শিক্ষক হারুন আল রশিদ, দুই সহকারী শিক্ষক ইব্রাহীম কবির ও স্বরস্বতীকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেন। তারা তাতে কর্ণপাত না করায় এবং ঘটনার তদন্ত করে সত্যতা পাওয়ায় তাদের সাময়িক বরখাস্ত করেছে স্কুল কমিটি। 

স্কুল সূত্রে জানা যায়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ধাওয়া ইউনিয়ন চেয়ারম্যান সরেজমিন স্কুল পরিদর্শনে গিয়ে ওই বিষয় সম্পর্কে অবগত হন। ভুক্তভোগী ছাত্রীর বক্তব্য শুনেন তারা। তদন্তের ভিত্তিতে ঘটনার সত্যতা পেলে ব্যবস্থা গ্রহণ করার নির্দেশনাও দিয়েছেন তারা। এলাকাবাসী ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এই ন্যক্কারজনক ঘটনার তীব্র নিন্দা ও উপযুক্ত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন বলে জানা যায়। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভুক্তভোগী ছাত্রীর বাবা আমার সংবাদকে বলেন, আমার একমাত্র মেয়ে নবম শ্রেণিতে পড়ে। অভিযুক্ত ইব্রাহীম কবির মাস্টারের কাছে প্রাইভেট পড়তে গেলে তার কু-নজরে পড়ে আমার অপ্রাপ্ত মেয়ের ওপর। আমি বাবা হিসেবে অসহায়। পিতৃ সমতুল্য শিক্ষকের দ্বারা ছাত্রী হেনস্তা হওয়ার ঘটনা খুবই বেদনাদায়ক। আমি বাবা হিসেবে মর্মাহত। আমিও একই স্কুলের শিক্ষক। আমার মেয়ের সাথে এহেন আচরণ অগ্রহণযোগ্য। আমি অসহায় হয়ে কমিটির কাছে বিচার দিলে তারা সাময়িক ব্যবস্থা নিয়েছেন। অভিযুক্ত ইব্রাহীম কবির প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় থেকে এমন অপকর্ম করার সাহস পাচ্ছে। প্রধান শিক্ষক হারুন আল রশিদ হাওলাদার তাকে সরাসরি সাপোর্ট দেয়ায় সে বেপরোয়া আচরণ করছে।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত ইব্রাহীম কবির আমার সংবাদকে বলেন, আমার নামে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হয়েছে। আমি কাউকে কোনো চিঠি-পত্র দেই নাই। বর্তমানে নিয়মিত স্কুলে ক্লাস নিচ্ছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি জানান, এখন স্কুল বন্ধ। এছাড়া এ বিষয়টা নিয়ে ঝামেলা হওয়ায় আমি স্কুলে যাচ্ছি না। বরখাস্তের বিষয়ে তিনি জানান, আমি এই বরখাস্ত মানি না। ওই ছাত্রীর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ হয় কিনা জানতে চাইলে তিনি এই প্রতিবেদককে জানান, ওই ছাত্রীর ফোন না থাকায় মাঝে মধ্যে তার বাবার ফোন ব্যবহার করে।

রাজপাশা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. মিজানুর রহমান হায়দার আমার সংবাদকে বলেন, অভিযুক্ত শিক্ষক ইব্রাহীম কবির আগে বিয়ে করেছিলেন এখন তার বৌ নেই। তিনি স্কুলের এক ছাত্রীকে কু-প্রস্তাব দেয়ায় তাকে প্রথমে সতর্ক করা হয়। সে তাতে কর্ণপাত না করে রীতিমতো ছাত্রীকে প্রেমপত্র পাঠায় এবং যৌন হয়রানি করে। পরবর্তীতে কমিটির সদস্যদের সিদ্ধান্তে সাময়িক বরখস্ত করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, অবৈধ কাজে সহযোগিতা করায় প্রধান শিক্ষক মো. হারুন আল রশিদ হাওলাদার ও সহকারী শিক্ষিকা সরস্বতী রাণীকেও স্কুল থেকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে ম্যানেজিং কমিটি।

সার্বিক বিষয়ে স্কুল কমিটির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. বজলুর রশিদ মৃধা আমার সংবাদকে বলেন, আমি তাদের একাধিকবার সাবধান করেছি এবং শোকজ নোটিসও দিয়েছি। কিন্তু তারা কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে উল্টো সবাইকে অমান্য করেছে। 

শিক্ষক ইব্রাহীম কবিরের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, শিক্ষক বাবার মতো কিন্তু ছাত্রীর সঙ্গে যে ধরনের অশোভন আচরণ করেছে এটা মোটেও ঠিক করেনি। আমরা স্কুল কমিটি তার এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিচ্ছি। জানা যায়, ২০২৩ সালের ৭ নভেম্বর স্কুল কমিটির সভাপতির স্বাক্ষরিত এক নোটিসের মাধ্যমে প্রধান শিক্ষক মো. হারুন আল রশিদ হাওলাদারকে বরখাস্তের নির্দেশ দেন। 

বিদ্যালয়ের অর্থ আত্মসাৎ, অডিট কমিটি গঠন, অর্থ উপকমিটি গঠন, ডেইলি মুভমেন্ট রেজিস্টার না করা, দৈনিক হিসাব বই না লিখাসহ প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ আনেন সভাপতি। এছাড়া গত বছরের ১ অক্টোবর একই স্কুলের শিক্ষকের মেয়েকে ইব্রাহীম কবির নামের অন্য এক সহকারী শিক্ষক যৌন উত্ত্যক্ত করলে কোনো ধরনের পদক্ষেপ নেয়নি। বিদ্যালয়ের দায়িত্ব পালনে অবহেলা ও ব্যর্থতায় তাকে বরখস্ত করা হয়। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ধাওয়া ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমান (টুলু) আমার সংবাদকে বলেন, শিক্ষক ইব্রাহীম কবির ছাত্রীকে কু-প্রস্তাব এবং প্রেমপত্র দেয়ার বিষটা সত্য এবং সহকারী শিক্ষিকা সরস্বতী রাণী ওই শিক্ষককে অবৈধ কাজে সহযোগিতা করছেন এবং প্রেমপত্র গ্রহণ করতে ছাত্রীকে বাধ্য করেছেন বলে জেনেছি।