- শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য বিপন্ন
- ৯০% শিক্ষার্থী মানসিক সমস্যায় ভুগছেন বৈষম্যের কারণে
- শ্রেণিকক্ষে বৈষম্য সর্বাধিক সহপাঠী ও শিক্ষকই প্রধান উৎস
- মানসিক স্বাস্থ্য সেবা পেয়েছেন মাত্র ২২% শিক্ষার্থী
- প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্মচারীর ভূমিকা অপর্যাপ্ত
- সমন্বিত পদক্ষেপে নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ক্যাম্পাস নিশ্চিত করা জরুরি
দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৈষম্য বিস্তার ও তার মানসিক প্রভাব উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সম্প্রতি আঁচল ফাউন্ডেশনের জরিপে দেখা গেছে, ৯০% শিক্ষার্থী বৈষম্যের কারণে মানসিক সমস্যা ভোগ করছেন। এর মধ্যে ৫৫% বিষণ্নতা, ৪৯% উদ্বিগ্নতা, ৩০% ঘুমের সমস্যা, ৪৩% একাকিত্ব এবং ৪১% হীনমন্যতায় ভুগছেন। পাশাপাশি, ২১% শিক্ষার্থী ঠিকমতো ক্লাস করতে পারছেন না এবং ৫১% পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে অসুবিধা অনুভব করছেন।
জরিপে শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বেশি বৈষম্যের শিকার হওয়ার স্থান হলো শ্রেণিকক্ষ, যেখানে ৬০% শিক্ষার্থী এই সমস্যায় আক্রান্ত। এছাড়া হল বা ডরমিটরি ১৯%, ক্যাম্পাসের বিভিন্ন অনুষ্ঠান ৩৭%, বন্ধুবান্ধব আড্ডা ৩৮% এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন ১৮% শিক্ষার্থীকে বৈষম্যের মুখোমুখি করেছে। সামাজিক মাধ্যমে বৈষম্যভোগীর হার ৩১%, যেখানে নারীর হার ৪৮% এবং পুরুষের ৫০%।
পরীক্ষার ফলাফলে শিক্ষকের পক্ষপাতিত্বের কারণে ৬০% শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। শিক্ষকের খারাপ আচরণে দুর্ব্যবহার করেছেন ৫৫% শিক্ষার্থী। জরিপে শিক্ষার্থীরা উল্লেখ করেছেন, লিঙ্গভিত্তিক, ধর্মীয়, শারীরিক ও জাতিগত বৈষম্য এখনও বিদ্যাপিঠে চলমান। সহপাঠীরাও বৈষম্যমূলক আচরণে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যা ৫৮% শিক্ষার্থী অভিজ্ঞতা হিসেবে জানিয়েছেন।
জরিপে দেখা গেছে, বৈষম্য ভোগ শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ২২% মানসিক স্বাস্থ্য সেবা গ্রহণ করেছেন। বাকি ৭৮% শিক্ষার্থী কোনো ধরনের থেরাপি বা কাউন্সেলিং পাননি। প্রধান কারণ হলো সামাজিক ট্যাবু, আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং সঠিক তথ্যের অভাব।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সায়েদুল ইসলাম সতর্ক করে বলেন, জীবনে সমস্যা এলে তা মোকাবিলা করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মানসিক সেবা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।’
শিক্ষার্থীদের ৩২% অভিযোগ, প্রশাসনের পদক্ষেপ অপর্যাপ্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর কাছ থেকে ১৫% শিক্ষার্থী বৈষম্য ভোগ করেছেন। সহপাঠীর পক্ষপাত ৫৮% শিক্ষার্থীর জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো প্রস্তাব করেছে শিক্ষার্থীদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, ছয় মাস অন্তর মানসিক স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং, বৈষম্য ও হয়রানি প্রতিরোধে মনিটরিং টিম, প্রতিটি বিভাগে অভিযোগ বাক্স, নারী শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা অভিযোগ সেল, ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং সেন্টার এবং মানসিক স্বাস্থ্য সেবা সহজলভ্য করা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. রাশেদ আলম ভূঁইয়া বলেন, শিক্ষার্থীদের মানসিক ও সামাজিক নিরাপত্তা না নিশ্চিত করলে তাদের পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ জীবনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে।’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হাসানুল বান্না যোগ করেন, ‘প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈষম্যবিরোধী সেল ও অভিযোগ নিষ্পত্তি কমিটি বাধ্যতামূলক করা উচিত। নীতিমালা ছাড়া প্রশাসন দায় এড়ানোর সুযোগ পায়।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী ও প্রশাসনের সমন্বয়ে বৈষম্য প্রতিরোধ, মানসিক স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত এবং নিরাপদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিশ্চিত করা এখন সময়ের প্রধান দাবি। যদি এই পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হয়, তবে শিক্ষার্থীদের মানসিক ও একাডেমিক ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রভাবিত করবে।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন