- সরকারি ভবন, স্কুল-কলেজ ও হাসপাতালে রুফটপে বসানো হবে সোলার
- ডিসেম্বরের মধ্যেই উৎপাদনের লক্ষ্য ২-৩ হাজার মেগাওয়াট
- প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে ৭-১০ হাজার কোটি টাকা
- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল পাবে ছাদ ব্যবহারের ভাড়া
- ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্য ২০ শতাংশ
বাংলাদেশ সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে অগ্রগতি আনতে এবার বড় পরিসরে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে দেশের সরকারি ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং হাসপাতালের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপনের কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৭ হাজার থেকে সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা, যা থেকে দুই-তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, আগামী ছয় থেকে আট মাসের মধ্যে কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু হবে।
পরিকল্পনাটি দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। এক. সরকারি অফিসের ছাদ : ডিসেম্বরের মধ্যে এক থেকে দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে কাজ চলছে।
দুই. শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান : একই সময়ে সমপরিমাণ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। এরই মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মন্ত্রিপরিষদ সচিবসহ শতাধিক সচিবকে ডিও লেটার পাঠানো হয়েছে।
জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপারদের (এসপি) সঙ্গে সমন্বয় সভার প্রস্তুতিও চলছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থ মন্ত্রণালয় অর্থায়নের আশ্বাস দিয়েছে। তবে ক্যাপএক্স মডেল (Capital Expenditure) ও ওপেক্স মডেল (Operating Expenditure)— দুই কাঠামো অনুসরণ করা হবে।
এক. সরকারি অফিস : প্রতিটি অফিস তাদের নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বরাদ্দ চাইবে। এরপর প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে সোলার প্যানেল বসানো হবে।
দুই. শিক্ষা ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান : ওপেক্স মডেলে প্যানেল বসানো হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে কোনো বিনিয়োগ বা রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বহন করতে হবে না। বরং ছাদ ব্যবহারের জন্য একটি ভাড়া পাওয়া যাবে, যা তাদের নিজস্ব তহবিলে যুক্ত হবে। সব রুফটপ সোলার নেট মিটারিংয়ের আওতায় আসবে। ফলে গ্রাহকের প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। আবার বিদ্যুতের ঘাটতি হলে গ্রাহক গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ নিতে পারবে। প্রতি তিন মাস পর বিদ্যুৎ গ্রহণ ও সরবরাহ সমন্বয় করে বিল নির্ধারণ করা হবে।
বাংলাদেশ এখনও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে আছে। ভারত : মোট বিদ্যুতের ২৪% সৌরবিদ্যুৎ, পাকিস্তান : ১৭.১৬%, শ্রীলঙ্কা : ৩৯.৭%, বাংলাদেশ : মাত্র ৫.৬% (১,৫৮০ মেগাওয়াট)। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে নিম্নমানের যন্ত্রপাতি ব্যবহারের কারণে অনেক প্যানেল অকেজো হয়ে গেছে। ফলে সম্ভাবনা থাকলেও উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছে দেশ।
বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা ২০২৫ অনুযায়ী: ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ (৪,৪৪৪ মেগাওয়াট) নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য। ২০৪০ সালের মধ্যে এই হার হবে ৩০ শতাংশ (৮,৮৮৮ মেগাওয়াট)।
এরই মধ্যে স্থলভিত্তিক ৫৫টি সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্রের টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যা বাস্তবায়ন হতে ২০২৮ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় ২০৪০ সালের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান দাঁড়াবে ৪০ শতাংশ।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদবিষয়ক উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান বলেন, ‘কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনতে সরকার বদ্ধপরিকর। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়াতে টেকসই উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। রুফটপ সোলার বাস্তবায়ন করা গেলে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা কমে আসবে।’
বিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে: জাতীয় গ্রিডে সৌরবিদ্যুতের অবদান দ্রুত বাড়বে। সরকারি অফিস, স্কুল ও হাসপাতালগুলোর বিদ্যুৎ খরচ কমে যাবে। প্রতিষ্ঠানগুলো অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ পাবে। আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাস পাবে।
তবে সময়মতো গুণগত মানসম্পন্ন প্যানেল বসানো, দক্ষ রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বয় জোরদার করা না গেলে প্রকল্পটি দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর নাও হতে পারে।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন