৩৫ বছর পর চাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত

শান্তিপূর্ণ ভোটেও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

কে.এম. ইয়ামিনুল হাসান আলিফ প্রকাশিত: অক্টোবর ১৬, ২০২৫, ১২:০৭ এএম
শান্তিপূর্ণ ভোটেও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

বিভিন্ন অভিযোগ- নির্বাচন বর্জনের ঘটনা ঘটলেও শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ- চাকসু নির্বাচন। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদের প্রথম নির্বাচনি আয়োজন হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ জুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। 

গতকাল বুধবার সকাল ৯টা থেকে শুরু হয়ে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলে। তবে ৪টার পরেও বিভিন্ন কেন্দ্রের ভেতরে ভোটারদের সারিতে অপেক্ষমাণ ছিলেন অনেকে। 

সারিতে থাকা এসব ভোটার ভোট দেয়ার সুযোগ পেয়েছেন। ভোটগ্রহণ শেষে কেন্দ্র থেকে ব্যালটগুলো ডিন অফিসে নেয়া হয়, সেখানে ক্যামেরার সামনে ভোট গণনা করা হচ্ছে। চাকসু নির্বাচনে ভোটগ্রহণ হয়েছে ব্যালট পেপারে। 

ভোট গণনা করা হচ্ছে ওএমআর (অপটিক্যাল মার্ক রিডার) পদ্ধতিতে। গণনার প্রক্রিয়া সরাসরি দেখানো হচ্ছে ১৪টি এলইডি স্ক্রিনের মাধ্যমে।

এদিকে নির্বাচনের দিন সহিংসতার কোনো খবর পাওয়া যায়নি। ভোট প্রক্রিয়া শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হলেও নির্বাচন নিয়ে নানা অভিযোগ তোলেন প্রার্থীরা।

বহিরাগত প্রবেশ, অমোচনীয় কালি উঠে যাওয়া ও স্বাক্ষরবিহীন ব্যালট নিয়ে শিবির-ছাত্রদলের কণ্ঠে ছিল একই অভিযোগ। 

বুধবার বেলা ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল অনুষদ ভবন কেন্দ্রে নিজের ভোট দেয়া শেষে সাংবাদিকদের ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘সমপ্রীতির শিক্ষার্থী জোট’র প্যানেলের সহসভাপতি (ভিপি) প্রার্থী মো. ইব্রাহীম হোসেন বলেন, “ভোটগ্রহণের পরে অমোচনীয় কালি ব্যবহার না করায় চাকসু নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।” 

এ সময় তিনি অভিযোগ করে গণমাধ্যমে আরও বলেন, “আমরা বলেছিলাম অমোচনীয় কালি ব্যবহার করতে। কিন্তু সেটি করা হয়নি। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে একটা শঙ্কা তৈরি হলো। একটি কক্ষে পোলিং কর্মকর্তার সই ছাড়া ভোট দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। আবার ছাত্র না, এমন অনেকেই পরিচয়পত্র নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।”

একই ধরনের অভিযোগ ছিল ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলেরও। 

বিকেল ৪টায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল নোমান সাংবাদিকদের বলেন, “এই নির্বাচন কমিশনার অথর্ব নির্বাচন কমিশনার। এই মেরুদণ্ডহীন নির্বাচন কমিশনার থেকে সুষ্ঠু নির্বাচন, নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রত্যাশা; আস্থার জায়গা নষ্ট হয়ে গেছে। একটা প্যানেলের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের আটটি অভিযোগ এসেছে।” 

এ সময় ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলের ভিপি প্রার্থী সাজ্জাদ হোসেন বলেন, “নির্বাচন কমিশন আমাদের আশ্বস্ত করেছিলেন, তারা অমোচনীয় কালি দেবেন। কিন্তু তাঁরা সেখানে ব্যর্থ হয়েছেন। একজন শিক্ষার্থীকে যদি অমোচনীয় কালি দেয়া না হয়, তাহলে একজন শিক্ষার্থী চাইলে একাধিকবার ভোট দিতে পারবেন।”

এছাড়া ভোটগ্রহণ চলাকালে স্বাক্ষরবিহীন ব্যালট ও বহিরাগত প্রবেশ নিয়েও অভিযোগ তোলে ছাত্রদল।

এদিকে ভোটগ্রহণ শেষে বিকাল ৫টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকসু ভবনের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন নিয়ে ৮টি অভিযোগ তুলে ধরে ‘অহিংস শিক্ষার্থী ঐক্য’ প্যানেল। 

সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগগুলো তুলে ধরেন প্যানেলটির ভিপি পদপ্রার্থী ফরহাদুল ইসলাম। ছাত্রদল, ছাত্র শিবিরের ন্যায় অমোছনীয় কালির ব্যবহার না করা,স্বাক্ষরবিহীন ব্যালট পেপার দেওয়ার অভিযোগের পাশাপাশি অহিংস শিক্ষার্থী ঐক্য প্যানেলের জন্য অনুমোদিত কোনো পর্যবেক্ষক লিস্ট না দেয়া, আইটি ভবনের ৩০৯ নম্বর ভোটকক্ষের সামনে রাখা টেবিলে একটি নির্দিষ্ট প্যানেলের লিফলেট রাখা, প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের অশোভন আচরণ, প্রবেশের সময় ছবিযুক্ত আইডিকার্ডগুলো চেক না করা, দীর্ঘক্ষণ সায়েন্স ফ্যাকাল্টির এলইডি বন্ধ থাকা, ও বিভিন্ন প্রার্থীর বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ আনা হয় সংবাদ সম্মেলন থেকে। 

এদিকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (চাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনে ভোট বর্জনের ঘোষণা দেয় ‘বিশ্ব ইনসানিয়াত বিপ্লব স্টুডেন্ট ফ্রন্ট’ সমর্থিত ‘রেভ্যুলুশন ফর স্টেট অব হিউম্যানিটি’ প্যানেল। সোয়া ৫টার দিকে চাকসু ভবনের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ বর্জনের ঘোষণা দেন প্যানেলের ভিপি প্রার্থী কেফায়েত উল্লাহ। জাল ভোট, সইবিহীন ব্যালট পেপার প্রদানসহ ১০টি কারণ দেখিয়ে ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন তিনি।

এদিকে নির্বাচনে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলে লিখিত অভিযোগ প্রদান করেছে বিনির্মাণ শিক্ষার্থী ঐক্য প্যানেল। ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ কেন্দ্রে নির্বাচন কর্মকর্তার স্বাক্ষর ছাড়া অন্তত ৪০০ ব্যালট বাক্সে জমা পড়েছে অভিযোগ তুলে বিকেল ৪টার দিকে এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন প্যানেলটির ভিপি প্রার্থী আবির বিন জাবেদ। 

নির্বাচন নিয়ে অভিযোগ ছিল বামধারার শিক্ষার্থীদের প্যানেল ‘বৈচিত্র্যের ঐক্য’ এর পক্ষ থেকেও। বিকেল সাড়ে ৫টায় চাকসু ভবনের সামনে সংবাদ সম্মেলন করে এসব অভিযোগ করা হয় প্যানেলটির পক্ষ থেকে। 

প্যানেলের ভিপি পদপ্রার্থী ধ্রুব বড়ুয়া অভিযোগ করে বলেন, “সকালে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আমরা যে আগ্রহটা দেখেছিলাম, সে আগ্রহ আমাদের আনন্দিত করেছে। কিন্তু দুপুরের পরে বেশ কিছু ঘটনা আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, যেগুলো এই নির্বাচনকে নানাভাবে কলঙ্কিত করেছে।”

তবে বিভিন্ন প্যানেলের প্রার্থীরা অমোচনীয় কালি উঠে যাওয়ার অভিযোগ তুললেও প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব সহকারে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন।

ভোটগ্রহণ চলাকালে দুপুরে গণমাধ্যমের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মনির উদ্দীন। 

তিনি বলেন, “কালি না থাকলেও ভোটের স্বচ্ছতা নিয়ে আশঙ্কার কিছু নেই। ভোটারের পরিচয় ভেরিফিকেশনের জন্য আমরা আইডি কার্ড, ভোটার নম্বর ও তালিকায় থাকা ছবিসহ তথ্য যাচাই করছি।”

অমোচনীয় কালি ব্যবহারে ত্রুটির বিষয়ে ড. মনির উদ্দীন সাংবাদিকদের আরো বলেন, “জাতীয় নির্বাচনের মতো কালি সংগ্রহ আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। আমরা নিয়ম রক্ষার্থে একটি বিকল্প কালি ব্যবহার করেছি, যা হয়ত স্থায়ী ছিল না। তবে ভোটার যাচাইয়ে কোনো শৈথিল্য রাখা হয়নি।”

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, চাকসুতে এবার মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ২৭ হাজার ৫১৭ জন। পাঁচটি অনুষদে, ১৫টি হলের জন্য নির্ধারিত ১৫টি কেন্দ্রে মোট ৬০টি কক্ষে ৬৮৯টি বুথে এ ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

 এবারের নির্বাচনে কেন্দ্রীয় ও হল সংসদ মিলিয়ে মোট ৯০৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় সংসদে ১৩টি প্যানেল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মিলিয়ে ৪১৫ জন এবং হল ও হোস্টেল সংসদে ৪৯৩ জন।