রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের আত্মপরিচয়ের সূচনা ১৯৭৫ এর পরেই শুরু হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।
শুক্রবার বিকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা জানান তিনি।
উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, স্বাধীনতার পর যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন, তারা দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার এমন পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন যার পরিণতিতে সিপাহি-জনতার বিপ্লব ঘটেছিল। সেই বিপ্লব কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্রীয় আত্মপরিচয়েরও পুনর্জন্ম।
আসিফ মাহমুদ বলেন, ১৯৭৫ সালের পর দেশের জনগণ প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রক্ষমতা ও জাতীয় কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন করতে শুরু করে। রাষ্ট্র কে, জনগণ কোথায়, স্বাধীনতা আসলে কার? এসব প্রশ্ন থেকেই শুরু হয় বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার নতুন অধ্যায়।
উপদেষ্টা আসিফ বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে জনগণের অংশগ্রহণের ধারণা তখনই স্পষ্ট হয়। ১৯৭৫ এর পর মানুষ বুঝতে শুরু করে রাষ্ট্র মানেই জনগণের ইচ্ছা, আর রাজনীতি মানে শুধু ক্ষমতা নয় জবাবদিহি ও ন্যায়বিচারও।
তিনি উল্লেখ করেন, স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছিল। সেই সময়ের দুর্নীতি ও দমননীতি সিপাহি–জনতার আন্দোলনের পটভূমি তৈরি করে দেয়।
উপদেষ্টা সমসাময়িক রাজনীতির প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ২০২৪ সালের আন্দোলনেও আমরা একই ধরণের প্রেক্ষাপট দেখেছি ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, দুর্নীতি ও ন্যায়বিচারের সংকট।
তবে তিনি হতাশা প্রকাশ করে বলেন, নতুন বন্দোবস্তের রাজনীতি এখনও স্পষ্ট নয়। জনগণ এখনো জানে না, পরিবর্তনের এই ঢেউ আসলে কোন দিকে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পরে রাজনৈতিক দলগুলো আবারও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কোলে বসেছে। যারা সংস্কারের কথা বলতো, তারাই এখন রক্ষণশীল রাজনীতিতে ফিরে গেছে। কেউ কেউ রিয়েকশনারি পলিটিক্সে ঢুকে পড়েছে। এর ফলে মুজিববাদী রাজনীতির পুনরুত্থান ঘটছে যা সময়ের বাস্তবতায় আবারও আলোচনায় এসেছে।
আসিফ মাহমুদ মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের কাছে নতুন কোনো দিকনির্দেশনা দিতে পারছে না। রাষ্ট্র সংস্কারের দাবি এখনো দলীয় প্রতীক আর ক্ষমতার হিসাবের আড়ালে ঢাকা পড়ে আছে।
দেশের পররাষ্ট্রনীতি প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে উপদেষ্টা বলেন, সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ এই নীতির অর্থ আজ যেন দাঁড়িয়েছে, কারও সঙ্গে প্রকৃত বন্ধুত্বও নেই। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থান এখনো নরম কূটনীতির ছায়ায় ঝুলে আছে।
তিনি আরও যোগ করেন, রাষ্ট্রকে যদি আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন সত্তা হিসেবে গড়ে তুলতে হয়, তবে বন্ধুত্ব বা বৈরিতা নয় প্রয়োজন নীতিনিষ্ঠ অবস্থান ও স্বার্থনির্ভর কূটনীতি।
আসিফ মাহমুদ বলেন, রাষ্ট্রের অস্তিত্ব কোনো ব্যক্তির ওপর নির্ভর করতে পারে না। জনগণের অংশগ্রহণই তার মেরুদণ্ড।
তিনি দাবি করেন, ১৯৭৫–এর পর থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো বারবার জনগণনির্ভর গণতন্ত্র থেকে ব্যক্তিনির্ভর শাসনে ফিরে গেছে। এই চক্র ভাঙতে হবে।
বৈঠকের শেষে উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ আহ্বান জানান, যে প্রজন্ম ৭ নভেম্বরকে শুধুই একটি তারিখ হিসেবে দেখে, তারা ভুল করছে। এটা আসলে আমাদের আত্মপরিচয়ের প্রতীক। রাষ্ট্র গঠনের এই যাত্রায় নতুন প্রজন্মকে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, আমরা যদি আবারও দুর্নীতি, অদক্ষতা ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতিতে ফিরে যাই, তবে ১৯৭৫ এর পর শুরু হওয়া আত্মপরিচয়ের লড়াই অর্থহীন হয়ে যাবে।
শেষে তিনি বলেন, রাষ্ট্রের শক্তি প্রাসাদে নয়, মানুষের অন্তরে। সেই অন্তরের শক্তিকে জাগাতে না পারলে কোনো বিপ্লবই টিকবে না, কোনো বন্দোবস্তই স্থায়ী হবে না।
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন