মিথ্যা মামলার বাদীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হবে। ইতিমধ্যে পুলিশের কয়েকটি ইউনিট তদন্ত করে শনাক্ত করছে মিথ্যা মামলার বাদীদের। প্রাথমিকভাবে ৬৭ জন বাদীকে তারা শনাক্ত করেছে।
পুলিশ সদর দপ্তর থেকে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
মূলত গত বছরের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ঢাকা এবং দেশের বিভিন্ন থানায় ও আদালতে এসব মিথ্যা মামলা হয়েছে। আর এসব মামলায় ব্যক্তিগত আক্রোশ, মোটা টাকার দাবিসহ নির্দোষ ও নিরীহ লোকদের আসামি করা হয়েছে।
মামলার ভয় দেখিয়ে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে মোটা অঙ্কের টাকা। এমনকি শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মোটা চাঁদা না পেয়ে তাদেরও আসামি করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ঢাকাসহ সারা দেশে গত বছরের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ১ হাজার ৭৬০টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৭৬৬টি হত্যা মামলা এবং ৯৭৪টি অন্যান্য ধারার মামলা করা হয়। ইতিমধ্যে ৫৫টি মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৮টি হত্যা মামলার অভিযোগপত্রে ১ হাজার ৯৪১ জনকে আসামি করা হয়েছে। আর ৩৭টি মামলায় ২ হাজার ১৮৫ জন আসামির বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে।
চার্জশিট দেওয়া ১৮টি হত্যা মামলা ঢাকা, চট্টগ্রাম, শেরপুর, ফেনী, চাঁদপুর, নোয়াখালী, পাবনা, কুড়িগ্রাম, বগুড়া ও আরএমপিতে হয়েছে।
আর অন্যান্য ধারার ৩৭টি মামলা বগুড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, নওগাঁ, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, নরসিংদী ও বরগুনা জেলায় হয়েছে। এসব মামলা শুধু এসআই বা ইন্সপেক্টরদের পাশাপাশি সিনিয়র কর্মকর্তারাও তদন্ত করছেন। আবার কিছু সিনিয়র কর্মকর্তা মামলাগুলোর মনিটরিং করছেন।
সূত্র জানায়, মিথ্যা মামলাগুলো পুলিশ ও বাদীর যোগসাজশে বিভিন্ন মানুষকে হয়রানি ও চাঁদাবাজির উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। আর বাদীদের সঙ্গে যোগসাজশে মাঠপর্যায়ের পুলিশ আসামিদের নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করছে ও বাণিজ্য করছে। সেক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাদের টার্গেট করেও মামলার ভয় দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। মামলা থেকে বাঁচতে দিশেহারা নির্দোষ ব্যক্তিরা টাকা দিতে বাধ্য হচ্ছেন। কারণ, এজাহারে নাম অন্তর্ভুক্ত করার আগে তাদের কাছে মোটা টাকা দাবি করা হয়। মিথ্যা মামলার বাদী প্রতারকদের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের নেতাদেরও সুসম্পর্ক রয়েছে। মিলেমিশেই তারা অপকর্ম চালাচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে যারা এসব করছে, তাদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশের সব ইউনিট প্রধান ও জেলার পুলিশ সুপারদের বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ফলে ফেঁসে যাচ্ছে মিথ্যা মামলার অনেক বাদী।
সূত্র আরও জানায়, মিথ্যা মামলা দায়েরের পেছনে কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালীদের প্ররোচনা রয়েছে। তাদের প্ররোচনাতেই কেউ কেউ মিথ্যা মামলা করেছে। তারপর মামলা থেকে নাম বাদ দেওয়ার অজুহাতে অনেকের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে।
তদন্তে এসব মামলা যে উদ্দেশ্যমূলকভাবে করা হয়েছে, তা প্রমাণিত হয়েছে। সেজন্য মিথ্যা মামলার বাদীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার সুপারিশ করা হয়েছে।
তাছাড়া জুলাইয়ের সহিংসতায় নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ বা আইনি সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়েও অসাধু চক্র মিথ্যা মামলা করেছে। সেক্ষেত্রে জীবিত ব্যক্তিকে শহীদ দেখিয়ে বেশ কয়েকটি হত্যা মামলা করা হয়েছে। সে প্রেক্ষিতে বাদী বা তাদের প্রতিনিধির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অনেক বাদীই জানেন না তারা কাকে আসামি করেছেন।
এর সঙ্গে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সুবিধাবাদী ব্যক্তিরা জড়িত। পাশাপাশি নিরীহ ব্যক্তিদের আসামি করার ভয় দেখিয়ে বা আসামির তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে পুলিশ সদস্যরাও চাঁদাবাজির অভিযোগে জড়িত।
পুলিশ সদর দপ্তর এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে এবং মিথ্যা অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা করার নির্দেশ দিয়েছে। কারণ, একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা ও কনস্টেবলের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে। পুলিশ বিভাগ এসব অভিযোগ তদন্ত করছে।
এদিকে, এ প্রসঙ্গে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম জানান, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩ ধারা অনুযায়ী সরকার ইতিমধ্যে ১৩৬ জনকে মামলার অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়েছে। আরও ২৩৬ জনের আবেদন বিবেচনা করা হচ্ছে। মিথ্যা মামলায় কাউকে হয়রানি করা হলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতিমধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে।
যারা প্রকৃত আসামি, তাদেরও চিহ্নিত করা হয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তা বা অন্য কেউ মামলাবাণিজ্য করার চেষ্টা করলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন