বন্ধ ঢাবি, জবি; হল ছাড়ার নির্দেশনা
একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ দুই মেডিকেল কলেজে, অনলাইনে ক্লাস নর্থ সাউথে
অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে বন্ধ হবে না প্রাথমিক স্কুল
সংঘর্ষ ও ভূমিকম্পের জেরে বন্ধ ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা
ভূমিকম্প আতঙ্কে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। হঠাৎ ভূমিকম্পের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে স্ব স্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ। উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে দেয়া হয়েছে হল ছাড়ার নির্দেশনাও।
নিরাপত্তা বিবেচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি), শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ সব ধরনের একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করে।
প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুল-কলেজেও ছিল একাডেমিক কার্যক্রমের সাময়িক পরিবর্তন। ভূমিকম্পের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) হলগুলো পর্যবেক্ষণ ও মেরামত করতে ১৫ দিন বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
এ ছাড়া ঢাবি শিক্ষার্থীদের হলগুলো খালি করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ঢাবির সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরাম সিন্ডিকেটে এ সিদ্ধান্ত নেয়ার পর ঢাবির জনসংযোগ দপ্তর থেকে একটি বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সভায় সাম্প্রতিক ভূমিকম্প ও তৎপরবর্তী ঝাঁকুনির কারণে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক আঘাতের বিষয়টি বিবেচনা করা হয় এবং তাদের সার্বিক নিরাপত্তার দিক সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়। সভায় বুয়েটের বিশেষজ্ঞ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অফিসের পরিচালক এবং প্রধান প্রকৌশলীর মতামত বিশ্লেষণ করা হয়।
এতে বলা হয়, প্রকৌশলীদের মতামত হলো ভূমিকম্প পরবর্তী আবাসিক হলগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সামগ্রিক ঝুঁকি মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় সংস্কার দরকার। এই ঝুঁকি নিরূপণ ও সম্ভাব্য সংস্কারের স্বার্থে আবাসিক হলগুলো খালি করা প্রয়োজন। এ কারণে সভায় আগামী ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ রাখা এবং আবাসিক হলগুলো খালি করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে গতকাল রোববার বিকেল ৫টার মধ্যে আবাসিক হলগুলো খালি করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সভায় প্রাধ্যক্ষদের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়।
তবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসগুলো খোলা থাকবে বলে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে ঢাবি কর্তৃপক্ষ। ভূমিকম্পের আতঙ্কে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) আগামী ২৭ নভেম্বর পর্যন্ত সব ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ ঘোষণা করেছে । তবে আগামী ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে অনলাইন ক্লাস।
এর আগে, ভূমিকম্পের আতঙ্কে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য গতকাল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক্লাস পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করে প্রশাসন। দেশব্যাপী স্মরণকালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর আতঙ্কে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ আগামী ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করেছে প্রশাসন। শিক্ষার্থীদের হল ত্যাগের নির্দেশও দেয়া হয়েছে। এদিকে ভূমিকম্প পরবর্তী উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আগামী ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেল কলেজের সব ধরনের একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। গতকাল এক জরুরি একাডেমিক কাউন্সিলে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক পেশাগত এমবিবিএস পরীক্ষাগুলো ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ কমানো এবং প্রয়োজনে অভিভাবকদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ করে দেয়ার লক্ষ্যেই এ সময় পর্যন্ত একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ থাকছে।
এ সম্পর্কিত নোটিশে জানানো হয়, আগামী ৩০ নভেম্বর থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজের একাডেমিক কার্যক্রম যথারীতি চালু হবে। এদিকে ঢাকার বকশিবাজার এলাকায় অবস্থিত সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়ার শিক্ষার্থীদের দুপক্ষের তুমুল সংঘর্ষের জেরে একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধের পর আবাসিক হলও সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। একইসঙ্গে সব আবাসিক শিক্ষার্থীকে হল ত্যাগের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। নতুন এ সিদ্ধান্তের পেছনে কারণ হিসেবে শনিবার (২২ নভেম্বর) ছাত্র সংঘর্ষের জেরে উদ্ভূত পরিস্থিতির পাশাপাশি ভূমিকম্প আতঙ্কের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
গতকাল বিকেলে প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ ওবায়দুল হকের সই করা বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সম্প্রতি ভূমিকম্পজনিত কারণে হলের কিছু পিলার ও কক্ষে ফাটল দেখা দেয়ার পাশাপাশি ২২ নভেম্বর রাতে সংঘটিত ছাত্র সংঘর্ষের পরিস্থিতি বিবেচনা করে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী, আল্লামা কাশগরী (রহ.) হল ও মুফতি আমিমুল ইহসান হলে অবস্থানরত সব আবাসিক শিক্ষার্থীকে বিকেল ৪টার মধ্যে হল ছাড়তে হবে।
তবে, চলমান ফাজিল স্নাতক (পাস) ১ম, ২য় ও ৩য় বর্ষের পরীক্ষা-২০২৪ এর কার্ডধারী আবাসিক পরীক্ষার্থীদের হল সুপার বরাবর আবেদন করার জন্যও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এদিকে, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি ভবনে ভূমিকম্পের ফলে ফাটল দেখা গিয়েছে এরকম বেশ কিছু ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ কার্যালয়ের পরিচালক সৈয়দ মানসুর হাশিমের পাঠানো একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে তেমন কোনো ত্রুটির প্রমাণ মেলেনি। তবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণি কক্ষে ক্লাস-পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি বলে জানা গেছে। গতকাল তাদের ক্লাস হয়েছে অনলাইনে। ভূমিকম্পের আতঙ্কে রাজধানীর বেশ কয়েকটি স্কুল-কলেজে ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত করেছে। কিছু স্কুল আবার শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের শান্ত থাকতে পরামর্শ দিয়েছে এবং নিয়মিত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
রাজধানীর বহু সরকারি ও বেসরকারি স্কুল-কলেজে যথারীতি বার্ষিক পরীক্ষা চললেও কিছু প্রতিষ্ঠানে পরিস্থিতি বিবেচনায় সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে হয়েছে। অনিবার্য পরিস্থিতির কারণে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ গতকাল প্রথম থেকে নবম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষা এবং একাদশ শ্রেণির কুইজ পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করে।
প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাজেদা বেগম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিষয়টি জানানো হয়। তবে প্রতিষ্ঠানটি কলেজ শাখার একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির নিয়মিত পাঠদান কার্যক্রম চালু রেখেছে।
এদিকে, ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, আব্দুর রাজ্জাক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, কডরোভা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলসহ বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই রোববার স্কুল বন্ধ রেখেছে। তবে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কারণ হিসেবে অনিবার্য কারণে ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিতের কথা জানানো হয়েছে অভিভাবকদের।
এদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ ৪৪ ভবন ভেঙে ফেলার নির্দেশ ছিল। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে অবস্থিত বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৪৪টি ভবন অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব ভবন দ্রুত ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। তবে মাউশির সেই নির্দেশনায় কান দিচ্ছে না শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো।
মাউশি সূত্র জানায়, চলতি বছরের এপ্রিলে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সুপারিশের ভিত্তিতে এ নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানই এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়নি। ফলে অতি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোতে শিক্ষার্থীদের ক্লাস-পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে। তবে অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে বিদ্যালয় বন্ধ করে দেয়া যাবে না বলে মন্তব্য করেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অধ্যাপক বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার। তিনি বলেন, ভূমিকম্প যে কোনো সময় হতে পারে; তাই আতঙ্ক নয়, বরং সতর্কতা ও প্রস্তুতিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যালয়গুলোকে প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক নির্দেশনা ইতোমধ্যে পাঠানো হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ৩৬ ঘণ্টার কম সময়ে বাংলাদেশে তিনবার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। প্রথম দফার ভূমিকম্পে ১০ জন প্রাণ হারান, আহত হন অর্ধ সহস্রাধিক। এরপরই ভূমিকম্প আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন