ইতিহাস, সংগ্রাম ও প্রতিরোধের এক আপসহীন অধ্যায়

একজন বেগম খালেদা জিয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ডিসেম্বর ১, ২০২৫, ০৩:১৯ পিএম
একজন বেগম খালেদা জিয়া

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়া এমন একটি নাম, যা একদিকে নেতৃত্বের দৃঢ়তা, অন্যদিকে গণতন্ত্র রক্ষার নিরন্তর সংগ্রামের প্রতীক। তার জীবনের প্রতিটি পর্বই যেন এক একটি রাজনৈতিক ইতিহাসের দলিল। মুক্তিযুদ্ধ থেকে সামরিক শাসনের পতন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার থেকে তিনবারের প্রধানমন্ত্রিত্ব, দীর্ঘ কারাবাস থেকে বর্তমান শারীরিক দুরবস্থার মধ্যেও রাজনৈতিক প্রতীক হয়ে থাকা।

এখন তিনি এভার কেয়ার হাসপাতালে সংকটাপন্ন অবস্থায় চিকিৎসাধীন। তার শারীরিক দুরবস্থার খবর শুনে শুধু বিএনপি নয়, রাজনৈতিক বিভাজন পেরিয়ে সাধারণ মানুষও উদ্বিগ্ন। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, ‘পরিস্থিতি খুবই সংকটময়।’ প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনুসও তার সুস্থতা কামনা করেছেন, যা প্রমাণ করে, রাষ্ট্রের ভূরাজনীতিতে তিনি এখনো এক অপরিবর্তনীয় চরিত্র। এই সংকটময় সময়ে তার দীর্ঘ পথচলার মূল্যায়ন শুধু প্রয়োজন নয়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বোঝার জন্য অপরিহার্য।

শৈশব ও কৈশোর : যে বীজপর্বে গড়ে ওঠে আত্মবিশ্বাস

১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট জলপাইগুড়িতে জন্ম নেয়া খালেদা খানম পুতুলের শৈশব আর দশটি মেয়ের মতোই সাধারণ ছিল, কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য ভিত তৈরি করেছিল শৃঙ্খলা, শিক্ষার পরিবেশ এবং পারিবারিক মর্যাদাবোধ।

তার বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ছিলেন ব্যবসায়ী, আর মা তৈয়বা মজুমদার ছিলেন গৃহিণী। পাঁচ ভাইবোনের পরিবারে দায়িত্ববোধ, পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা এবং মানুষের প্রতি সহমর্মিতা— এই সব গুণই পরে তার রাজনৈতিক চরিত্রকে শক্ত ভিত দেয়।

দিনাজপুরের মুদিপাড়া গ্রামের পরিবেশ তাকে পরিচিত করে প্রকৃতি, মানুষের জীবনসংগ্রাম এবং সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে। এখানেই তিনি প্রথম উপলব্ধি করেন নেতৃত্বের গুরুত্ব, একটি গুণ, যা পরে জাতীয় নেতৃত্বে পরিণত হয়।

বিয়ে, পারিবারিক জীবন ও রাজনৈতিক নিয়তির সূচনা

১৯৬০-এর দশকের শুরুতে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে পড়াকালীন পরিচয় হয় তরুণ সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে। মেধাবী, আত্মবিশ্বাসী এবং নেতৃত্বগুণসম্পন্ন জিয়া পরবর্তীতে শুধু তার জীবনসঙ্গীই নন, রাজনৈতিক ভবিষ্যতের দিকনির্দেশক হিসেবেও আবির্ভূত হন।
বিয়ের পর তাদের সংসার ছিল সরল, শান্ত এবং স্বপ্নে ভরপুর। দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো ছিল জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ তাদের জীবনে নিয়ে আসে ভয়াবহ বাস্তবতা।

মুক্তিযুদ্ধ : বন্দিজীবনে সংগ্রামের প্রথম পাঠ

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। এদিকে বাড়িতে থাকা তরুণী খালেদা জিয়া দুই ছোট শিশু নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েন।

১৯৭১ সালের ২ জুলাই পাকবাহিনী তাদের ঢাকার বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে। মাত্র ২৬ বছর বয়সে তিনি দুই সন্তানসহ বন্দিশিবিরে কঠিন সময় কাটান, যেখানে ভয়, ক্ষুধা, অস্থিরতা, আর মৃত্যুভয় ছিল প্রতিদিনের সঙ্গী। ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত তার বন্দিজীবন তাকে শুধু মানসিকভাবে শক্তই করেনি, বরং ভবিষ্যতের রাজনৈতিক চরিত্রের মূলে ঢেলে দিয়েছে সংগ্রাম, ধৈর্য আর দৃঢ়তার পাঠ।

রাষ্ট্রপতির সহধর্মিণী থেকে রাজনৈতিক দায়িত্ব, এক পরিবর্তনের সূচনা

স্বাধীনতার পরপরই জিয়াউর রহমান ধীরে ধীরে জাতীয় নেতৃত্বে উঠে আসেন। ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও কূটনৈতিক অঙ্গনের অভিজ্ঞতা খালেদা জিয়ার দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত করে। কিন্তু ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে জিয়ার হত্যার মধ্য দিয়ে তার জীবন এক চরম মোড়ে দাঁড়ায়। মাত্র ৩৬ বছর বয়সে তিনি হন বিধবা- দুই সন্তানের একমাত্র আশ্রয়। জিয়ার মৃত্যুশোকের মধ্যেও তাকে সামলাতে হয় রাষ্ট্রীয় উত্তাপ, দলীয় অস্থিরতা এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা।

দলীয় নেতারা তাকে নেতৃত্ব গ্রহণে আহ্বান জানান। তিনি রাজনীতি না করলেও, সময়ের দাবি তাকে রাজনীতিতে প্রবেশে বাধ্য করে। ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি বিএনপিতে যোগ দিয়ে মাত্র দুই বছরের মধ্যে দলীয় শীর্ষনেতৃত্বে উঠে আসেন, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিস্ময়কর ঘটনা।

সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, এক আপসহীন নেত্রীর উত্থান

১৯৮২ সালে এরশাদ সামরিক শাসন জারি করলে খালেদা জিয়ার সামনে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। তার নেতৃত্বেই গড়ে ওঠে সাতদলীয় ঐক্যজোট। ১৯৮৩, ১৯৮৪ ও ১৯৮৭ সালে তিনি তিনবার গণআন্দোলনে অংশ নিয়ে গ্রেপ্তার হন।

রাজপথের সংগ্রাম ও ধারাবাহিক চাপের মুখে ১৯৯০ সালের শেষ দিকে পতন ঘটে এরশাদ শাসনের, যা বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের অন্যতম বড় মাইলফলক। এই পুরো আন্দোলনে খালেদা জিয়া হয়ে ওঠেন ‘আপসহীন নেত্রী’ এক উপাধি যা তাকে এখনো অনুসরণ করে।

তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার পুনর্গঠন

১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে তিনি বাংলাদেশের প্রথম গণভোটে নির্বাচিত নারী প্রধানমন্ত্রী হন। তার নেতৃত্বে ১৯৯১ সালের ১২তম সংশোধনী পাস হয়, যার মাধ্যমে বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০১ সালের নির্বাচনেও বিএনপি জোট বিপুল বিজয় লাভ করে এবং তিনি আবার প্রধানমন্ত্রী হন।

অর্থনীতি, অবকাঠামো উন্নয়ন, নারীশিক্ষা সমপ্রসারণ, টেলিকম খাতে মুক্তবাজার উন্মোচনসহ বিভিন্ন খাতে তার সরকারের উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। যদিও রাজনৈতিক বিরোধ, সংঘাত, জোট রাজনীতি ও দুর্নীতির অভিযোগ তার সরকারকে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছিল, তবুও তার রাজনৈতিক উপস্থিতি কখনো কমেনি।

ওয়ান-ইলেভেন, কারাবাস ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতা

২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তিনি দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার হন। দীর্ঘ কারাবাস, মামলা-হামলা, পরিবারের ওপর চাপ- সবকিছুই তার রাজনৈতিক অধ্যবসায়কে আরও শক্ত করে। ২০১৮ সালে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় দণ্ডিত হয়ে তিনি কারাগারে যান। সেই  মামলায় তিনি সবসময় দাবি করেছিলেন- এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তৎকালীন সরকার  মানবিক কারণে তাকে বাসায় চিকিৎসার সুযোগ দেয়, কিন্তু বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি  দেয়নি, যা রাজনৈতিক বিতর্কের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিল।

দলীয় নেতৃত্বে ৩২ বছরের অধ্যায়

বিএনপির চেয়ারপারসন হিসেবে দীর্ঘ ৩২ বছর নেতৃত্বদান দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে একটি বিরল ঘটনা। পাঁচটি ভিন্ন নির্বাচনে ২৩টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবগুলোতে জয় তার জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক শক্তির সাক্ষ্য বহন করে।

পরিবারের বেদনাময় অধ্যায়, রাজনৈতিক সংগ্রামে ব্যক্তিগত আঘাত

২০১৫ সালে আরাফাত রহমান কোকোর আকস্মিক মৃত্যু তার ব্যক্তিজীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কাগুলোর একটি। এই বেদনা তার মনোবল নষ্ট করেনি, বরং রাজনৈতিক সংগ্রামের শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছিল। বর্তমানে প্রবাসে থাকা বড় ছেলে তারেক রহমানই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান।

বর্তমান শারীরিক অবস্থা- জীবন-সংগ্রামের সবচেয়ে কঠিন সময়

এভার কেয়ার হাসপাতালের বিছানায় থাকা বেগম জিয়ার বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তার লিভার, কিডনি ও হূদযন্ত্রসহ একাধিক অঙ্গে জটিলতা দেখা দিয়েছে। বিএনপি বলছে, তাকে বিদেশে উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন হলে নেয়া হবে। রাজনীতির বাইরে গিয়ে আজ তাকে মানবিকভাবে দেখছে মানুষ। রাজনৈতিক বিরোধিতার দেয়াল পেরিয়ে তার প্রতি সহমর্মিতা ও শ্রদ্ধা তৈরি হয়েছে সর্বস্তরের মানুষের মাঝে।

উত্তরাধিকার, যা তাকে বাংলা রাজনীতির অপরিহার্য অংশ করে তুলেছে

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন কয়েকটি শব্দে সংক্ষেপ করা যায়। সংগ্রাম, দৃঢ়তা, ত্যাগ ও নেতৃত্ব। তার উত্তরাধিকারের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হলো

১. গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের মুখ্য নেতৃত্ব : এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তার ভূমিকা বাংলাদেশের ইতিহাসে স্থায়ীভাবে লিপিবদ্ধ।

২. নারী নেতৃত্বের শক্তিশালী উদাহরণ : তিনি দক্ষিণ এশিয়ায় নারীর নেতৃত্বকে মূলধারায় প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন।

৩. জাতীয় রাজনীতির ভারসাম্য রক্ষার শক্তি : বিএনপি-আওয়ামী লীগ দ্বি-মেরুর রাজনীতিতে তিনি ছিলেন অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু।

৪. আপসহীন রাজনৈতিক মনোভাব : চাপ, নির্যাতন, কারাবাস- কোনো কিছুই তাকে নতি স্বীকার করাতে পারেনি।

আজ বেগম খালেদা জিয়া শারীরিকভাবে দুর্বল, কিন্তু তার রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক শক্তি এখনো অটুট। তিনি শুধু একটি দলের নেতা নন, তিনি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক বিরল অধ্যায়ের নির্মাতা। তার বর্তমান নিবিড় চিকিৎসা ও সংকটাপন্ন সময় আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একজন নেতার মূল্যায়ন শুধু রাজনীতির ভাষায় নয়, মানবিকতার আলোতেও করতে হয়। আজ তার সুস্থতা কামনা করছে জাতি। কারণ তার জীবন বাংলাদেশের রাজনৈতিক পথচলার অবিচ্ছেদ্য অংশ। 

তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জন্য বা মায়ের জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। মির্জা ফখরুলসহ দলের সিনিয়র নেতারাও বেগম খালেদা জিয়ার জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা তাকে যেন সুস্থতা দান করেন।