আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সারা দেশে নির্বাচনি সহিংসতায় দুজন নিহত হয়েছেন। পাশাপাশি মনোনয়ন কেন্দ্রীক সম্ভাব্য প্রার্থী এবং বঞ্চিত প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকের মধ্যে সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ২৬২ জন আহত হয়েছে। এছাড়া রাজনৈতিক সহিংসতা ও দলীয় অন্তর্কোন্দলে ১২ জন নিহত ও ৮৭৪ জন আহত হয়েছে।
এদিকে দেশের সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেন।
গতকাল বুধবার হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি কর্তৃক বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রেরিত মাসিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনের তথ্যমতে, নির্বাচনি সহিংসতা ছাড়াও গত মাসে ৯৬টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এতে ১২ জন নিহত ও ৮৭৪ জন আহত হয়েছে। এর মধ্যে বিএনপির অন্তর্কোন্দলের ৪২টি ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ৫১২ জন এবং নিহত হয়েছেন ১০ জন। ২৪টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে বিভিন্ন দলের মধ্যে। এতে আহত হয়েছেন ১১৪ জন এবং নিহত হয়েছেন দুজন।
এছাড়া ৯টি বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৫২ জন, ছয়টি বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৪১ জন, ১৫টি বিএনপি-অন্যান্য দলের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১৫৫ জন এবং ২০টি ঘটনা ঘটেছে বিভিন্ন দলের মধ্যে। এতে আহত হয়েছেন ৯১ জন এবং নিহত হয়েছেন একজন। নিহত ১২ জনের মধ্যে বিএনপির ১১ জন ও জেএসএস গ্রুপের একজন।
এইচআরএসএস আরও জানায়, সারা দেশে ২৩টি ঘটনায় ৩৬ জন সাংবাদিককে নির্যাতন ও হয়রানি করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ২২ জন আহত, ১১ জন সাংবাদিককে হুমকি ও একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া দুটি হয়রানিমূলক মামলায় দুই সাংবাদিককে অভিযুক্ত করে মামলা করা হয়েছে। এছাড়া সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫- এর অধীনে এ মাসে দায়েরকৃত সাতটি মামলায় ৯ জনকে গ্রেপ্তার ও ২৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।
এদিকে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও অবনতির দিকে ছিল বলে এইচআরএসএসের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। তথ্যমতে, দেশে ২০টি গণপিটুনি ও মব সহিংসতায় ১৬ জনকে হত্যা ও ১১ জনকে পিটিয়ে আহত করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে দুজনের মৃত্যু, কারাগারে তিনজন সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি ও ৯ জন হাজতির মৃত্যু হয়েছে।
অপরদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী এবং বিভিন্ন সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ধারায় কমপক্ষে ৩৮টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ১১৬৬ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ২৩০১ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। এ মাসে রাজনৈতিক মামলায় কমপক্ষে ১৯৯৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যেখানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী অন্তত ১৭১৪ জন এবং বিএনপির নেতাকর্মী ৩৬ জন। এছাড়া সারা দেশে যৌথবাহিনীর বিশেষ অভিযানে ছয় হাজারের অধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের নেতাকর্মী।
নভেম্বর মাসে শিশু ও নারী সহিংসতার প্রতিবেদনে এইচআরএসএস জানায়, ১৭৭ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৪৮ জন (২৫ জন শিশু ও কিশোরী) এবং ১৩ জন নারী ও কন্যাশিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এমনকি দুজনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। ৩৬ জন নারী ও কন্যাশিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, এর মধ্যে ১১ জন শিশু।
এছাড়া যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনায় নিহত হয়েছেন তিনজন এবং আহত হয়েছেন পাঁচ নারী। পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ২৯ জন, আহত হয়েছেন ৩২ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ২৪ জন নারী।
অন্যদিকে সারা দেশে বিভিন্ন ঘটনায় ১০৩ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে যাদের মধ্যে ২০ জন প্রাণ হারিয়েছে এবং ৮৩ শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
নভেম্বর মাসে ২৫টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় চারজন নিহত ও ৭৬ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং শ্রমিকদের সুরক্ষামূলক সরঞ্জামের অভাবে দুর্ঘটনায় ১৪ জন শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে মারা গেছেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।
তাছাড়া নভেম্বর মাসে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে তিনটি হামলার ঘটনায় বিএসএফ কর্তৃক একজন বাংলাদেশি নিহত ও চারজন আহত হয়েছেন।
এছাড়া বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের কক্সবাজারের টেকনাফে বঙ্গোপসাগরের জলসীমা থেকে আরাকান আর্মি কর্তৃক চারটি ট্রলারসহ ২৬ জন জেলেকে আটক করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নির্বাচন আসার আগেই রাজনৈতিক সহিংসতা ও দলীয় অন্তর্কোন্দলে নির্বাচনি সহিংসতায় হতাহতের ঘটনাসহ সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছেন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম।
তিনি বলেন, সম্প্রতি হেফাজতে মৃত্যু, রাজনৈতিক উত্তেজনা, নির্বাচনি সহিংসতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ- এসব বিষয় সমাধান করা না হলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন