- জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যালট হবে সাদা আর গণভোটের ব্যালট হবে গোলাপী
- মনোনয়ন জমার শেষদিন ২৯ ডিসেম্বর
- মনোনয়ন বাছাই ৪ জানুয়ারি
- প্রার্থীর আপিলের সময় ১১ জানুয়ারি
- প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষদিন ২০ জানুয়ারি
আসছে নতুন বছর ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি (বৃহস্পতিবার) ভোটগ্রহণের দিন রেখে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন। একই দিন অনুষ্ঠিত হবে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে গণভোট।
গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারে জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে এই তফসিল ঘোষণা করেন সিইসি। সন্ধ্যা ছয়টা ১০ মিনিটে তিনি নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণা শুরু করেন।
সিইসি নাসির উদ্দিন জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে বলেন, ‘ভোট আপনার শুধু নাগরিক অধিকারই নয় বরং পবিত্র আমানত ও দায়িত্ব। এই দায়িত্ব সচেতনভাবে আপনারা পালন করবেন এ আমার বিশ্বাস। যে কোনো ভয়ভীতি, প্রলোভন, প্রবঞ্চনা এবং সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে উঠে নিঃসংকোচে আপনাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করুন। আপনাদের নিরাপদ ও উৎসবমুখর অংশগ্রহণকল্পে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠান ও বাহিনী কাজ করবে। ধর্ম, গোত্র, গোষ্ঠী, লিঙ্গ নির্বিশেষে সবাই এই আনন্দ আয়োজনে অংশগ্রহণ করুন। পরিবারের প্রতিবন্ধী, বয়স্ক ও সন্তান সম্ভবা মা’সহ সবাইকে নিয়ে ভোট দিতে আসুন।
আমি আশা করি, আপনাদের স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে ভোটের অনুষ্ঠান উৎসবে রূপ নেবে।’ আচরণবিধিসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোকপাত করেন সিইসি।
তিনি বলেন, ‘প্রথমত, প্রকৃত গণতান্ত্রিক ধারা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পাশাপাশি কাঙ্ক্ষিত সংস্কার প্রশ্নে সিদ্ধান্তের নির্বাচন এটি। এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে, যা একটি নতুন অভিজ্ঞতা। দ্বিতীয়ত, সংশ্লিষ্ট সব রাষ্ট্রীয় ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের জন্য এই নির্বাচন হচ্ছে সক্ষমতা প্রমাণ করে ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের অনন্য সুযোগ। তৃতীয়ত, দীর্ঘ গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামের পর দেশের স্বার্থে রাজনৈতিক দলসমূহের মাঝে সৌহার্দ্যপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার ধারা প্রবর্তনের দাবি রাখে এই নির্বাচন। চতুর্থত, প্রায় অকার্যকর পোস্টাল ভোট ব্যবস্থাকে পরিমার্জন করে এই নির্বাচনে একটি কার্যকরী রূপ দেয়া হচ্ছে।
বিশেষ করে বাংলাদেশের অন্যতম চালিকাশক্তি আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধা তথা প্রবাসী বাংলাদেশি ভোটারদের প্রথমবারের মতো ভোটের আওতায় আনা হচ্ছে। একইভাবে প্রথমবারের মতো ভোটের আওতায় আসছেন আইনি হেফাজতে থাকা ভোটাররা। এছাড়াও নিজ নির্বাচনি এলাকার বাইরে কর্মরত সরকারি কর্মচারী এবং নির্বাচন অনুষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরা পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে এবার ভোট দেবেন।’
ভোটের মৌসুমে অপতথ্যের বিস্তার নিয়ে সতর্ক করে সিইসি বলেন, ‘বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ছড়ানো হয়ে থাকে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে অসত্য তথ্য ও অপতত্ত্বের বিস্তার দিনকে দিন বেড়ে চলেছে। প্রতিপক্ষ দল ও প্রার্থীকে হেয় করার পাশাপাশি নারীদের প্রতি বিদ্বেষমূলক প্রচারণা আমাদের ঐতিহ্যকে ক্ষুণ্ন করে এবং নির্বাচনকে কলুষিত করে। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আপনাদের প্রতি আমার বিশেষ অনুরোধ অসত্য এবং অসৎ উদ্দেশ্যে প্রচারিত কোনো তথ্যে কান দিবেন না, গ্রহণ করবেন না। মনে রাখবেন অসত্য তথ্য শেয়ার করাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।’
নির্বাচনে অংশগ্রহণে ইচ্ছুক প্রার্থী এবং দলগুলোকে আচরণবিধি মেনে চলার আহ্বান জানিয়ে সিইসি বলেন, ‘আসুন আমরা আচরণবিধি মেনে একটি শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর নির্বাচন নিশ্চিত করি। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা নিশ্চিত করে ভোটারদের বিশ্বাস ও আস্থা অর্জনই হোক আপনাদের লক্ষ্য।’
নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করতে যাওয়া কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং দৃঢ়তার সাথে দায়িত্ব পালনে বদ্ধপরিকর কমিশনের অংশ হিসেবে আপনারা নির্ভয়ে সততা ও নিরপেক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করবেন।
মনে রাখবেন, এ ব্যাপারে কোনো শিথিলতা বা গাফিলতি সহ্য করা হবে না।’ এবার একই দিন গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ায় ভোটের সময় এক ঘণ্টা বাড়ানো হয়েছে।
সিইসি তার ভাষণে জানিয়েছেন, ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে সাতটা থেকে বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত একটানা ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যালট হবে সাদা আর গণভোটের ব্যালট হবে গোলাপী। সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনে ভোট হবে স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সে, ব্যালট পেপারে। সংসদের ব্যালটে বরাবরের মতোই প্রার্থীদের নাম আর নির্বাচনি প্রতীক থাকবে। নির্ধারিত চৌকো সিল দিয়ে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে হবে।
গণভোটের ব্যালটে প্রশ্ন থাকবে- জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে ভোটার সম্মতি দিচ্ছেন কি না। উত্তর দেয়ার জন্য ব্যালটে ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ দুটো ঘর থাকবে। যারা সম্মতি জানাচ্ছেন তারা ‘হ্যাঁ’ লেখা বাক্সে সিল দেবেন এবং যারা এর পক্ষে নন তারা ‘না’ ভোট দেবেন। ভোট দেয়ার পর সংসদ এবং গণভোটের ব্যালট আলাদা দুটো বাক্সে ফেলতে হবে।
ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার শেষ সময় ২৯ ডিসেম্বর। মনোনয়নপত্র বাছাই ৩০ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি। রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের ১১ জানুয়ারি এবং আপিল নিষ্পত্তি হবে ১২ থেকে ১৮ জানুয়ারি। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ২০ জানুয়ারি। প্রতীক বরাদ্দ করা হবে ২১ জানুয়ারি। নির্বাচনি প্রচার শুরু হবে ২২ জানুয়ারি, প্রচার শেষ হবে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে সাতটা পর্যন্ত। ১২ ফেব্রুয়ারি সারা দেশে ৩০০ সংসদীয় আসনে ভোট গ্রহণ করা হবে।
এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৬ লাখের বেশি। প্রবাসী বাংলাদেশি ভোটাররাও পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। এখন পর্যন্ত ৩ লাখের বেশি প্রবাসী ভোটার ভোট দেয়ার জন্য নিবন্ধন করেছেন। প্রায় দুই যুগ পর দেশে একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচন দেখতে যাচ্ছে জনগণ। একই দিনে একই সঙ্গে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য জনগণের ম্যান্ডেট নিতে গণভোট নেয়া হবে।
গত বছরের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে পতন হয় প্রায় ১৬ বছরের স্বৈরতান্ত্রিক আওয়ামী লীগ সরকারের। দুই দিন পর ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এর মধ্য দিয়ে তৈরি হয় গণতান্ত্রিক ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথ।
গত ১৩ নভেম্বর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জুলাই সনদ নিয়ে গণভোটের বিষয়ে জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে সংসদ নির্বাচনের চূড়ান্ত সময় ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন