২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন

জনগণের প্রত্যাশা, সরকারের প্রস্তুতি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চ্যালেঞ্জ 

তানজিদ সরওয়ার  প্রকাশিত: ডিসেম্বর ১২, ২০২৫, ০৭:১৯ পিএম
জনগণের প্রত্যাশা, সরকারের প্রস্তুতি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চ্যালেঞ্জ 
  • দীর্ঘদিন পরে মনে হচ্ছে ভোট সত্যিই গণনার মেশিনে গোনা হবে 
  • দলে নয় ভয় নয় আস্থা রাখুন, আপনার ভোট আপনি দিবেন 

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ইতোমধ্যে ‘গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের নির্বাচন’ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন জাতির উদ্দেশে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি দেশের ভোটাররা ৩০০টি আসনে ভোট দেবেন। 

ইতোমধ্যে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন, সাধারণ জনগণ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহলে এই নির্বাচনকে ঘিরে আলোচনার ঝড় বইছে, কারণ এই নির্বাচনকে বলা হচ্ছে গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠার নির্বাচন, ভোটারের অধিকার পুনরুদ্ধারের নির্বাচন।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বারবার ঘোষণা করছেন, ২০২৬ সালের নির্বাচন হবে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন।

তফসিল ঘোষণার পর দেশের মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। নাগরিকদের আশাবাদ, সংশয় ও প্রত্যাশা, সবকিছুই সমান গতিতে প্রকাশ পাচ্ছে।

ভোটারদের আশা‘এবার ভোট দিতে পারবো’: রাজধানী, বিভাগীয় শহর, জেলা ও উপজেলার সাধারণ মানুষের বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি উঠে আসছে একটাই শব্দ, 'আশা'। 

অনেকেই বলছেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে পরিবেশ কিছুটা শান্ত, আশা করছি এবার ভোট দিতে পারব। দীর্ঘদিন পর মনে হচ্ছে ভোট সত্যিই গণনার মেশিনে গোনা হবে, দলে নয়। বিশেষ করে তরুণ ভোটাররা প্রথমবারের মতো একটি উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশ অনুভব করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দেখা যাচ্ছে, ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট দেবো, এমন ক্যাম্পেইন, উদ্বুদ্ধকরণ পোস্ট, ভোটারদের প্রস্তুতি।

কিছু মানুষের উদ্বেগ‘অতীত অভিজ্ঞতায় ভয় আছে’: অন্যদিকে, একটি বড় অংশ এখনো সম্পূর্ণ আশ্বস্ত হতে পারছে না। তাদের মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতার অতীত, নির্বাচনী হিংসার স্মৃতি, ভোটকেন্দ্র দখলের আশঙ্কা, গ্রামীণ অঞ্চলে দলীয় প্রভাব, এই বিষয়গুলো এবারও মাথায় ঘুরছে। তবে তারা এটিও বলছেন, সরকার যদি কঠোর হয়, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী যদি নিরপেক্ষ থাকে, তাহলে এবার অবশ্যই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব।

প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করেছেন, নির্বাচন সম্পূর্ণ অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে হবে, কোনো রাজনৈতিক দলের প্রভাব থাকবে না, নিরপেক্ষ প্রশাসন, বদলি-বদলিতে স্বচ্ছ নীতি, ভোটারদের নিরাপত্তা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার, প্রতিটি কেন্দ্রে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর শক্তিশালী উপস্থিতি, ইভিএম নয়, ব্যালট পেপার, স্বচ্ছ গণনার জন্য, বিদেশি পর্যবেক্ষকদের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত দরজা। 

তিনি পরিষ্কারভাবে বলেছেন, এ নির্বাচন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, জনগণ ভোট দিতে চাইলে, তাদের সেই অধিকার সুরক্ষিত করা হবে।

নির্বাচনকে ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবার সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলো জানিয়েছে, তিন স্তরের নিরাপত্তা বেষ্টনী থাকবে, প্রথম স্তর, স্থানীয় পুলিশ, দ্বিতীয় স্তর, সশস্ত্র পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) এবং র্যাব, তৃতীয় স্তর, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী। প্রয়োজনে সীমান্ত এলাকায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), আর বিশেষ পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীকে সহায়ক শক্তি হিসেবে মোতায়েন করার পরিকল্পনা রয়েছে।

সহিংসতা শূন্যে নামাতে পরিকল্পনা: ভোটকেন্দ্রের আশেপাশে ১৪৪ ধারা, সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণ, অস্ত্রবাজ, সন্ত্রাসী ও নির্বাচনী হুমকির বিরুদ্ধে অভিযান, অপরাধী তালিকা হালনাগাদ, ভোটের আগের রাত ও ভোটের দিন বিশেষ টহল। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, জনগণের ভোটাধিকার রক্ষাই আমাদের প্রধান দায়িত্ব, কোনো পক্ষপাত থাকবে না।

বড় রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে। তাদের দাবি, অবাধ প্রচারণার পরিবেশ, কেন্দ্রে পর্যাপ্ত পর্যবেক্ষক, দলীয় প্রভাবমুক্ত প্রশাসন, বিরোধীদের জন্য সমান সুযোগ। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের অংশগ্রহণ সর্বাধিক হওয়ায় নির্বাচনের প্রতিযোগিতা স্বাভাবিক ও ভারসাম্যপূর্ণ হবে।

তফসিল ঘোষণার পর সারা দেশে, পোস্টার, পথসভা, গণসংযোগ, সামাজিকমাধ্যমে প্রচারণা, সব কিছু মিলিয়ে নির্বাচনী উচ্ছ্বাস তৈরি হচ্ছে। গ্রামাঞ্চলের ভোটাররা বলছেন, আমরা শান্তিতে ভোট দিতে চাই, কেন্দ্রের নিরাপত্তাই বড় বিষয়। এবার আর দলে দলে লোক এনে কেন্দ্র দখল করা যাবে না, এটাই চাই। 

শহুরে ভোটারদের মতামত, স্বচ্ছ ভোট হলে দেশের ভবিষ্যৎ বদলে যাবে। ইউনূস সরকারের ওপর আস্থা রাখছি, তারা চাপের কাছে মাথা নত করবে না।

জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কমনওয়েলথসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা নির্বাচন পর্যবেক্ষণে আগ্রহ দেখিয়েছে। বিশ্ব সম্প্রদায়ের বক্তব্য, অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষ অবস্থানকে স্বাগত, স্বাধীন নির্বাচন বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে, মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের অংশ হবে নির্বাচন, এতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনও নির্বাচনের প্রতি আশাবাদী।

বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি নির্ণায়ক কারণ তুলে ধরছেন, ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার নির্বাচন, গত এক দশকে ভোটাধিকার প্রশ্নে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, এবার তা ঘুচবে কি না, এটাই বড় প্রশ্ন, গণতন্ত্রের স্থায়িত্বের পরীক্ষা, সুষ্ঠু ভোট দেশের সাংবিধানিক গণতন্ত্রকে নতুন শক্তি দেবে, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রপরিচালনার ভবিষ্যৎ, একটি গ্রহণযোগ্য সরকার আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবে, শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা ও বিনিয়োগের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস দেশবাসীর প্রতি স্পষ্ট আহ্বান জানিয়েছেন, প্রত্যেক ভোটার কেন্দ্রে যাবে, ভয় নয়, আস্থা রাখুন, আপনার ভোট আপনি দেবেন, নির্বাচন যেন উৎসব হয়, সংঘাত নয়। সরকার একাধিক প্রচারণা চালাচ্ছে, আপনার ভোট আপনার অধিকার, 'ভোট দিন নির্ভয়ে', সুষ্ঠু নির্বাচন গড়ুক শক্তিশালী বাংলাদেশ, এই বার্তাগুলো মানুষকে উৎসাহিত করছে।

ভোটারদের প্রত্যাশা, একটি শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ। জনগণের কথা একটাই, দল নয়, দেশ এগোক। নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হোক। ভোটের ফল যেন তাদের প্রকৃত ইচ্ছাকে প্রতিফলিত করে। অনেকেই বলছে, যারা ক্ষমতায় যাবে, তারা যেন দেশের জন্য কাজ করে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন শুধু একটি রাজনৈতিক আয়োজন নয়, এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ, জনগণের ভোটাধিকার এবং রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার চূড়ান্ত পরীক্ষা। সরকারের প্রস্তুতি, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষ অবস্থান, ভোটারদের অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ, সব মিলিয়ে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন হয়ে উঠতে পারে, স্বচ্ছতা, অংশগ্রহণ, শান্তি ও জনগণের প্রকৃত মতামত প্রতিফলনের এক ইতিহাস গড়ার সুযোগ। বাংলাদেশের মানুষ এখন অপেক্ষায়, একটি সত্যিকারের অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও উৎসবমুখর নির্বাচনের।

ইএইচ