বেগম খালেদা জিয়া আবেগ, স্মৃতি আর ইতিহাসে গাঁথা

অধ্যাপক ড. সোহেল হাসান প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৩১, ২০২৫, ০৫:৫৯ পিএম
বেগম খালেদা জিয়া আবেগ, স্মৃতি আর ইতিহাসে গাঁথা

বেগম খালেদা জিয়া, এই নামটি বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে শুধু একটি ব্যক্তির পরিচয় নয়, এটি একটি সময়, একটি সংগ্রাম, একটি প্রতিরোধের প্রতীক। বহু দশক ধরে তিনি ছিলেন ঝড়-বৃষ্টির মুখে দাঁড়িয়ে থাকা এক দৃঢ় নারীর নাম, যার কণ্ঠে ছিল সাহস আর চোখে ছিল অদম্য প্রত্যয়। তার জীবন যেন এক দীর্ঘ উপন্যাস যেখানে আছে ভালোবাসা, বেদনা, হারানোর ক্ষত আর ফিরে দাঁড়ানোর অদ্ভুত শক্তি।

স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একজন নারী নেতার উত্থান সহজ ছিল না। তবুও বেগম খালেদা জিয়া নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন নিজের দৃঢ়তায়, নিজের অবস্থানে অবিচল থেকে। স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর তিনি যে শূন্যতা, যে ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিলেন, তা তাকে ভেঙে ফেলতে পারত। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী তিনি ভাঙেননি। বরং সেই শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে দাঁড়িয়ে গেছেন।

তার রাজনীতিতে আবেগ ছিল, ছিল মানুষের প্রতি এক ধরনের মায়া। গ্রামের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শহরের মধ্যবিত্ত অনেকেই তার মধ্যে খুঁজে পেয়েছেন নিজেদের কণ্ঠ। হয়তো তার সিদ্ধান্ত সব সময় বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিল না, কিন্তু তার উপস্থিতি কখনোই গুরুত্বহীন ছিল না। রাজনীতির কঠিন মঞ্চে দাঁড়িয়ে একজন নারী হিসেবে তিনি যে দৃঢ়তা দেখিয়েছেন, তা বাংলাদেশের নারীদের জন্য একটি নীরব অনুপ্রেরণা।

শিক্ষাক্ষেত্রেও অনন্য ভূমিকা রেখেছেন বেগম খালেদা জিয়া। নব্বইয়ের দশকের পর বাংলাদেশের নারীশিক্ষায় যে ব্যাপক জাগরণ লক্ষ্য করা যায়, তার একটি বড় স্বীকৃতি বেগম খালেদা জিয়ার প্রাপ্য। তার সময়েই মেয়েদের শিক্ষা বিস্তারে রাষ্ট্রীয়ভাবে সুস্পষ্ট উদ্যোগ নেয়া হয়। বিশেষ করে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে ছাত্রীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে বৃত্তি ও স্কলারশিপ চালুর সিদ্ধান্ত ছিল যুগান্তকারী।

গ্রামীণ ও আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা মেয়েদের কথা মাথায় রেখে যে অর্থনৈতিক সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়, তা অসংখ্য শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষার দরজা খুলে দেয়। পরিবার ও সমাজের নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও এই সহায়তা মেয়েদের স্কুলে ধরে রাখতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। এর ফলে ঝরে পড়ার হার কমে আসে এবং শিক্ষায় নারীদের উপস্থিতি দৃশ্যমানভাবে বৃদ্ধি পায়। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের নারীশিক্ষায় যে অগ্রগতি ও ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে, তার ভিত্তি গড়ে ওঠে এই উদ্যোগগুলোর মাধ্যমেই। তাই নারীশিক্ষার ইতিহাস আলোচনা করতে গেলে নব্বইয়ের দশকের সেই গণজাগরণ এবং এতে বেগম খালেদা জিয়ার ভূমিকা আলাদা করে স্মরণ না করলে চিত্রটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

কারাবাস, অসুস্থতা, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা সব মিলিয়ে তার জীবনের শেষ অধ্যায়গুলো সহজ ছিল না। দীর্ঘ সময়ের নিঃসঙ্গতা, শারীরিক কষ্ট আর অনিশ্চয়তার মধ্যেও তিনি হয়ে উঠেছেন ধৈর্যের প্রতিমূর্তি। একসময় যিনি রাজপথ কাঁপিয়েছেন, সেই নেত্রী আজ নীরবতার ভার বয়ে চলেছেন এই দৃশ্য অনেকের চোখ ভিজিয়ে দেয়। কারণ এটি শুধু একজন রাজনীতিকের কষ্ট নয়; এটি একটি সময়ের কষ্ট, একটি প্রজন্মের হতাশা।

বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে মতভেদ থাকবে, থাকবে রাজনৈতিক বিতর্ক। কিন্তু তার জীবনকে অস্বীকার করা যাবে না। তিনি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তার সংগ্রাম আমাদের মনে করিয়ে দেয় ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু দৃঢ়তা ও সাহস দীর্ঘদিন স্মরণে থাকে। আজ যখন তার নাম উচ্চারিত হয়, তখন কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে নয়, আমরা দেখি এক সংগ্রামী নারীকে যিনি ঝড়ের মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে শিখিয়েছেন। সময়ের ধুলোয় অনেক কিছু ঢাকা পড়ে যায়, কিন্তু কিছু নাম থেকে যায় হূদয়ের গভীরে। বেগম খালেদা জিয়া তেমনই একটি নাম- আবেগ, স্মৃতি আর ইতিহাসে গাঁথা।

লেখক: উপ-উপাচার্য, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ইএইচ