মাধ্যমিক স্তরে বই ঘাটতি

উৎসবহীন বই বিতরণ

ইয়ামিনুল হাসান আলিফ প্রকাশিত: জানুয়ারি ১, ২০২৬, ১১:৩৬ পিএম
উৎসবহীন বই বিতরণ
  • আগে থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বই উৎসব’ না করার সিদ্ধান্ত, শোক পালনে নির্দেশনা
  • ব্যতিক্রম ছাড়া প্রাথমিকে শতভাগ বই
  • আনন্দ বেদনার মিশেলে স্মরণীয় শিক্ষাবর্ষের সূচনা

নতুন বছর ও নতুন শিক্ষাবর্ষের সূচনার সঙ্গে সঙ্গে দেশের শিক্ষাঙ্গনে শুরু হয়েছে নতুন অধ্যায়। বছরের প্রথম দিনে দেশের সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষগুলোতে ফিরেছে শিক্ষার্থীরা। পুরানো পাঠ্যবইয়ের পরিবর্তে তাদের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে নতুন পাঠ্যবই।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের কয়েক কোটি শিক্ষার্থীর কাছে বিনামূল্যে নতুন বই পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে জাতীয় পর্যায়ে বই বিতরণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এ বছর আগে থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বই উৎসব’ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

উৎসবমুখর আয়োজনের পরিবর্তে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছে দেয়াকেই গুরুত্ব দেয়া হয়।

শিক্ষা কর্মকর্তারা জানান, পাঠ্যবই ছাপা ও সরবরাহে কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও ধাপে ধাপে সব শিক্ষার্থীর কাছে বই পৌঁছে দেয়া হবে। তবে নতুন শিক্ষাবর্ষের এই আনন্দঘন মুহূর্তে জাতি এক গভীর শোকের মধ্য দিয়ে দিনটি অতিবাহিত করছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি স্থগিত বা সীমিত করা হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় শোকের প্রেক্ষাপটে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সংক্ষিপ্ত আকারে পাঠদান কার্যক্রম শুরু হয়। কোথাও কোথাও শোকের প্রতি সম্মান জানিয়ে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। শিক্ষকরা জানান, শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ধীরগতিতে পাঠদান শুরু করা হয়েছে।

বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী নাম। তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় ছিলেন। তার মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।

অন্যদিকে শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, জাতীয় শোকের মধ্যেও শিক্ষাবর্ষের কার্যক্রম চালু রাখা শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন বজায় রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তারা আশা প্রকাশ করেন, নতুন পাঠ্যক্রম ও হালনাগাদ পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের জ্ঞান ও দক্ষতা উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

নতুন বইয়ের ঘ্রাণ, নতুন খাতা আর নতুন শ্রেণিকক্ষের উচ্ছ্বাসের মধ্যেও এদিন শিক্ষার্থীরা প্রত্যক্ষ করেছে একটি শোকাবহ জাতীয় বাস্তবতা। আনন্দ ও বেদনার মিশ্র অনুভূতিতে শুরু হলো আরেকটি শিক্ষাবর্ষ, যা স্মরণীয় হয়ে থাকবে দেশের রাজনৈতিক ও শিক্ষাজীবনের প্রেক্ষাপটে। তাই শোক দিবসে উৎসব না করার নির্দেশনা ছিল।

এদিকে নতুন বছরের প্রথম দিনে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছিল নতুন বই পাওয়ার উচ্ছ্বাস। সকাল থেকেই তারা স্কুলে এসে রঙিন মলাটের বই হাতে নিয়ে আনন্দে পাতা উল্টেপাল্টে দেখেছে। দুই সপ্তাহ আগেই প্রাথমিক স্তরের শতভাগ পাঠ্যবই মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দেয়ায় ব্যতিক্রম ছাড়া প্রায় সব শিক্ষার্থীই বছরের প্রথম দিন নতুন বই হাতে পেয়েছে। নতুন বছরের শুরুতেই সারা দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে সম্পূর্ণ পাঠ্যবই বিতরণ করা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার।

গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকার আবুল বাশার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি জানান, এবারের বইয়ের মান আগের তুলনায় অনেক উন্নত, যা বর্তমান সরকারের শিক্ষাব্যবস্থার একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য। একই সঙ্গে তিনি অভিভাবকদের উদ্দেশে বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার মান বাড়াতে একটি অভিভাবক নির্দেশিকা বই প্রস্তুত করা হচ্ছে। সেখানে শিশুদের সুস্থ ও সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় করণীয় বিষয়গুলো সহজ ভাষা ও চিত্রের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছে।

এর মধ্যেও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সঙ্গে প্রাথমিক স্তর থাকা কোনো কোনো বিদ্যালয়ে বৃস্পতিবার প্রাথমিকের বই দেয়া হয়নি বলেও জানা গেছে। তবে ব্যতিক্রম ছাড়া প্রাথমিকের সবাই বই পেলেও একই দিনে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের চিত্র ছিল ভিন্ন। অনেক বিদ্যালয়ে তারা আংশিক বই পেয়েছে, আবার কোথাও কোনো বইই মেলেনি। ফলে নতুন বইয়ের অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে তাদের।

এনসিটিবির সূত্রমতে, এবার মাধ্যমিক স্তরে (ইবতেদায়িসহ) মোট পাঠ্যবইয়ের সংখ্যা ২১ কোটি ৪৩ লাখ ২৪ হাজার ২৭৪। এর মধ্যে গত ৩১ ডিসেম্বর রাত আটটা পর্যন্ত মাধ্যমিকের ৭২ দশমিক ৮৫ শতাংশ পাঠ্যবই মাঠপর্যায়ে সরবরাহ করা হয়েছে। ইবতেদায়ি স্তর ছাড়া কেবল ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম ও নবম শ্রেণির বই সরবরাহ করা হয়েছে ৬৯ শতাংশ। ষষ্ঠ শ্রেণিতে গেছে ৮০ শতাংশের বেশি, সপ্তম শ্রেণিতে ৫৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ, অষ্টম শ্রেণিতে প্রায় ৪৫ শতাংশ ও নবম শ্রেণিতে সরবরাহ করা হয়েছে প্রায় ৮৪ শতাংশ। মাধ্যমিক, দাখিল, ভোকেশনাল ও কারিগরি স্তরের পাঠ্যপুস্তকের মুদ্রণ ও সরবরাহ কার্যক্রম এখনো চলমান।

এনসিটিবির সদস্য অধ্যাপক রিয়াদ চৌধুরী জানান, শতভাগ শিক্ষার্থীর হাতে পাঠ্যবই পৌঁছে দেয়াই মূল লক্ষ্য। এখন পর্যন্ত মোট বইয়ের প্রায় ৬৬ শতাংশ বিতরণ সম্পন্ন হয়েছে এবং অবশিষ্ট ৪৪ শতাংশ খুব শিগগিরই সরবরাহ করা হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। রাজধানীর বিভিন্ন মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখা গেছে কেউ চারটি, কেউ পাচটি বইও পেয়েছেন।

এদিকে এ বছর বই বিতরণ উপলক্ষে কোনো উৎসব বা আনুষ্ঠানিক আয়োজন রাখা হয়নি। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় আগেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণার কারণে ৩১ ডিসেম্বর থেকে ২ জানুয়ারি পর্যন্ত বই বিতরণ কার্যক্রমে কোনো অনুষ্ঠান আয়োজন করা হচ্ছে না।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা খালিদ মাহমুদ বলেন, এবার কোনো বই উৎসব হবে না। শিক্ষকরা নিজ নিজ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে পাঠ্যবই বিতরণ করবেন। ১ জানুয়ারি সারাদেশে বই বিতরণের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে নতুন বছরের শুরুতে প্রাথমিক স্তরে পাঠ্যবই বিতরণে সফলতা দেখা গেলেও মাধ্যমিক পর্যায়ে এখনও ঘাটতি রয়ে গেছে। দ্রুত বাকি বই সরবরাহ সম্পন্ন করে সব শিক্ষার্থীর হাতে পাঠ্যবই পৌঁছে দেয়াই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।

সময়মতো বই বিতরণ নিশ্চিত হলে শিক্ষার্থীদের পাঠদানে স্বাভাবিক গতি ফিরবে বলে মনে করছে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। পাশাপাশি জাতীয় এ শোক শিক্ষার্থীদের মাঝে শক্তি হয়ে ফিরে আসবে বলেও মনে করছেন শিক্ষাবিদরা।