নিরাপদ পণ্যের অতন্দ্র প্রহরী বিএসটিআই

রুহেল হাশেমী প্রকাশিত: জানুয়ারি ৪, ২০২৬, ০২:২৯ পিএম
নিরাপদ পণ্যের অতন্দ্র প্রহরী বিএসটিআই
  • মানহীনতার বিরুদ্ধে ‍‍‘শূন্য সহিষ্ণুতা‍‍ ও এক নতুন দিগন্ত’

একটি জাতির স্বাস্থ্য ও সমৃদ্ধি নির্ভর করে সেই দেশের মানুষের ব্যবহৃত পণ্য এবং বিশেষ করে খাদ্যের গুণগত মানের ওপর। বাংলাদেশে এই গুরুদায়িত্ব পালনে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ জাতীয় মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা 'বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন'  (বিএসটিআই)।  বর্তমানে  সংস্থাটি এখন কেবল একটি দাপ্তরিক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং ভেজাল ও মানহীন পণ্যের বিরুদ্ধে এক অপরাজেয় দুর্গে পরিণত হয়েছে।

বিএসটিআই-এর মূল দর্শন হলো- পণ্য হবে মানসম্মত, ওজন হবে সঠিক। দেশীয় শিল্পোৎপাদন এবং আমদানিকৃত পণ্যের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করাই এর প্রধান লক্ষ্য। একটি পণ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোক্তার হাত পর্যন্ত পৌঁছাতে প্রতিটি ধাপে বিএসটিআই-এর নজরদারি থাকে।

বিএসটিআইয়ের বাধ্যতামূলক মান সনদের তালিকাভুক্ত পণ্য ৩১৫ টি। তালিকাভুক্ত এ সকল পণ্যের লাইসেন্স গ্রহণ ব্যতীত উৎপাদন, বিক্রয়-বিতরণ এবং বাণিজ্যিক প্রচারণার আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এছাড়া প্রায় ৪৫০০ পণ্যের মান প্রণয়ন করেছে বিএসটিআই। এ সকল পণ্যের পরীক্ষণপূর্বক স্বেচ্ছামূলক সনদ গ্রহণ করা যায়।

যেকোনো খাদ্য বা শিল্পপণ্যের আদর্শ মান কেমন হবে, তার বৈজ্ঞানিক কাঠামো তৈরি করে বিএসটিআই। পুষ্টিগুণ, রাসায়নিক মিশ্রণ এবং স্থায়িত্বের বিচার বিশ্লেষণ করে এই মান নির্ধারণ করা হয়।

কোনো কোম্পানি বাজারে পণ্য ছাড়ার আগে বিএসটিআই-এর 'সিএম' লাইসেন্স নিতে বাধ্য। এই লাইসেন্স দেওয়ার আগে কারখানার পরিবেশ, কাঁচামালের গুণগত মান এবং ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মাধ্যমে শতভাগ নিশ্চিত হওয়ার পরই কেবল সিল প্রদান করা হয়।

'ওজনে কম দেওয়া' ইসলামের দৃষ্টিতে যেমন অপরাধ, আইনের দৃষ্টিতেও তাই। বিএসটিআই নিশ্চিত করে যে, দেশের প্রতিটি বাজারে ব্যবহৃত বাটখারা, ডিজিটাল স্কেল কিংবা জ্বালানি তেলের পাম্পের পরিমাপ যেন সঠিক থাকে। এজন্য নিয়মিত ভেরিফিকেশন ও ক্যালিব্রেশন কার্যক্রম চালানো হয়।

বিএসটিআই-এর অফিসাররা এখন ড্রইংরুমের ফাইলবন্দি কাজ ছেড়ে সরাসরি মাঠে কাজ করছেন। তাদের কাজের ধরণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এক আপসহীন চিত্র:

  • কারখানা পরিদর্শন: লাইসেন্স প্রদান বা নবায়নের আগে অফিসাররা আকস্মিক কারখানা পরিদর্শন করেন। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কোনো অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ বা নিম্নমানের কাঁচামাল পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে লাইসেন্স বাতিল করা হয়।
  • নমুনা সংগ্রহ ও ল্যাব টেস্ট: কেবল কারখানার নমুনা নয়, বাজার থেকে সাধারণ ভোক্তার ছদ্মবেশে পণ্য কিনে তা ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা বিএসটিআই অফিসারদের নিয়মিত রুটিন। এতে ফাঁকি দেওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না।

বিএসটিআই-এর অন্যতম শক্তিশালী অস্ত্র হলো ভ্রাম্যমাণ আদালত বা মোবাইল কোর্ট। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে অফিসাররা যখন অভিযানে নামেন, তখন মানহীন পণ্য উৎপাদনকারী বা ওজনে কারচুপি করা সিন্ডিকেটগুলোর কোনো রেহাই থাকে না। জরিমানা, জেল এবং কারখানা সিলগালা করার মাধ্যমে ভোক্তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনছে সংস্থাটি।

বর্তমানে বিএসটিআইয়ের এক নতুন প্রশাসনিক গতি পেয়েছে। তাঁর স্পষ্ট বার্তা খাদ্যের গুণগত মান নিয়ে কোনো আপস বা 'স্যার' সম্বোধনের জায়গা নেই। তিনি বিএসটিআই-কে একটি জনবান্ধব ও স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে সক্ষম হয়েছেন।

তাঁর নেতৃত্বে বিএসটিআই এখন আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়েছে। ল্যাবরেটরিগুলোকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা হয়েছে, যাতে পরীক্ষার রিপোর্ট নিয়ে কোনো প্রশ্ন না থাকে। তিনি সবসময় অফিসারদের নির্দেশ দেন, বাজার মনিটরিং যেন কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা না হয়, বরং তা যেন সাধারণ মানুষের নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তির গ্যারান্টি দেয়।

সাধারণ ভোক্তারা প্রায়শই চটকদার বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ হয়ে মানহীন পণ্য কেনেন। বিএসটিআই এখানে পাহারাদারের ভূমিকা পালন করে। বিএসটিআই-এর লোগো বা মার্ক দেখে পণ্য কেনা এখন সচেতন নাগরিকের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সংস্থাটি নিশ্চিত করছে যে- গুঁড়ো দুধ বা ভোজ্য তেলে কোনো ক্ষতিকর কেমিক্যাল নেই, প্রসাধনী সামগ্রীতে ক্ষতিকর সীসা বা পারদ নেই, ওজনে ১ গ্রামও কম দেওয়ার সুযোগ নেই।

বর্তমান সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ ও স্মার্ট বাংলাদেশ রূপকল্পের সাথে তাল মিলিয়ে বিএসটিআই তাদের সেবাগুলোকে অনলাইনমুখী করেছে। লাইসেন্স আবেদন থেকে শুরু করে সার্টিফিকেশন সবই এখন ঘরে বসে সম্ভব। এতে দুর্নীতি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমেছে। ভবিষ্যতে প্রতিটি জেলায় বিএসটিআই-এর নিজস্ব ল্যাবরেটরি স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে, যা মান নিয়ন্ত্রণের কাজকে আরও দ্রুততর করবে।

শিল্পায়ন ও উন্নয়নের এই যুগে বিএসটিআই-এর দায়িত্ব আরও বেড়েছে। কেবল আইন দিয়ে নয়, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমেও সংস্থাটি কাজ করে যাচ্ছে। বিএসটিআই-এর দক্ষ অফিসারদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ এখন মানসম্মত পণ্য উৎপাদনের পথে অনেকদূর এগিয়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, বিএসটিআই কেবল একটি সরকারি দপ্তর নয়, এটি কোটি মানুষের নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তা। বিএসটিআই যেভাবে বাজার তদারকি এবং গুণগত মান নিশ্চিত করছে, তা অব্যাহত থাকলে অচিরেই বাংলাদেশ থেকে ভেজাল ও ওজনে কারচুপির কলঙ্ক মুছে যাবে। একটি সুস্থ সবল জাতি গঠনে বিএসটিআই-এর এই আপসহীন ভূমিকা চিরকাল মাইলফলক হয়ে থাকবে।

ভোক্তা হিসেবে আমাদেরও দায়িত্ব বিএসটিআই অনুমোদিত পণ্য কেনা এবং কোনো অনিয়ম দেখলে অভিযোগ করা। কারণ, মান নিশ্চিত করার এই লড়াই বিএসটিআই একা লড়ছে না, এটি আমাদের সবার লড়াই।

বিএসটিআই-এর মূলমন্ত্র: পণ্যের মান বজায় রাখুন, সঠিক ওজনে পণ্য কিনুন। উন্নত জাতি গঠনে অংশীদার হোন।

জেএইচআর