সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধি সঙ্গী হলেন তার সহধর্মিণী তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপাসন খালেদা জিয়া। ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সময় জিয়াউর রহমানের এই সমাধি সরাতে নেয়া হয়েছিল বিতর্কিত উদ্যোগ। সে উদ্যোগের আড়ালে ছিল ২২০৯ কোটি টাকার ‘জাতীয় সচিবালয়’ প্রকল্পের কু-পরিকল্পনা।
সরকারি নথি ও বক্তব্যে উঠে আসে নানা অসংগতি ও প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্তের কথা। লুই আই কানের নকশা, নিরাপত্তা ও পরিবেশ সব মিলিয়ে আপত্তির শেষ ছিল না। তবু রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগে প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলেছিল।
এ নিয়ে সংসদ, রাজপথ ও গণমাধ্যমে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে থেমে যায় সেই উদ্যোগ। অদৃশ্য হয়ে যায় প্রকল্প, রয়ে যায় ইতিহাসের বিতর্কিত অধ্যায়।
জাতীয় সংসদ ভবনের পাশের বিস্তীর্ণ সবুজ প্রাঙ্গণে টানা ৪৪ বছর ধরে সমাহিত আছেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। সমপ্রতি একই স্থানে তাকে চিরসঙ্গী হিসেবে পাশে পেয়েছেন তার সহধর্মিণী, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।
অথচ অতীতে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগে এই ঐতিহাসিক সমাধি সরানোর জন্য একাধিকবার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এমনকি জিয়াউর রহমানের কবরে তার মরদেহ নেই- এমন দাবি তুলে তিনি ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেন।
এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে শেখ হাসিনা ‘ঢাকার শেরেবাংলা নগরে জাতীয় সচিবালয় নির্মাণ’ শীর্ষক একটি প্রকল্প গ্রহণ করেন, যা ২০১৫ সালে একনেক সভায় উপস্থাপন করা হয়। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল মোট ২ হাজার ২০৯ কোটি টাকা। তবে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে গেলে এ প্রকল্পের বিষয়টি আড়ালে চলে যায়। একই সঙ্গে প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশন ও গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে কার্যত উধাও হয়ে যায়।
এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের প্রধান (অতিরিক্ত সচিব) কবির আহামদ জানান, শেরেবাংলা নগরে জাতীয় সচিবালয় নির্মাণ প্রকল্প সম্পর্কে তিনি কোনো তথ্যই জানেন না। অন্যদিকে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব খলিল আহমেদও বলেন, প্রকল্পটির কোনো অগ্রগতি বা অস্তিত্ব এখন আর নেই।
লেফটেন্যান্ট জেনারেল জিয়াউর রহমান বীর উত্তম (১৯৩৬-১৯৮১) ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক, নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি, বীর মুক্তিযোদ্ধা, সেনাপ্রধান এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক। তিনি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রবক্তা ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা। রাষ্ট্রপতি থাকাকালে ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে একদল সেনা সদস্যের হাতে তিনি নিহত হন। প্রথমে তাকে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার পাহাড়ি এলাকায় দাফন করা হলেও পরে ১ জুন তার মরদেহ ঢাকায় আনা হয়।
২ জুন শেরেবাংলা নগরে লাখো মানুষের অংশগ্রহণে জানাজা শেষে সংসদ ভবনের উত্তর পাশের উদ্যানে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়। এই উদ্যানটি একসময় ‘ক্রিসেন্ট লেক পার্ক’ নামে পরিচিত ছিল। ১৯৮৮ সালে এর নামফলকে ‘চন্দ্রিমা’ যুক্ত হয়। বিএনপি সরকার ১৯৯২ সালে এর নাম পরিবর্তন করে ‘জিয়া উদ্যান’ রাখলেও ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার আবার ‘চন্দ্রিমা উদ্যান’ নামটি ফিরিয়ে আনে। পরবর্তীতে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নাম ও অবকাঠামোতেও একাধিকবার পরিবর্তন আসে।
২০০৯ সালে পুনরায় ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সরকার ২০১০ সালের ৩ মার্চ জিয়া উদ্যানের নাম আবার চন্দ্রিমা উদ্যান করে। এরপর সচিবালয় স্থানান্তরের যুক্তি দেখিয়ে জিয়াউর রহমানের সমাধি সরানোর পরিকল্পনা সামনে আনা হয়। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই ২০১৪ সালে ২ হাজার ২০৯ কোটি টাকার জাতীয় সচিবালয় প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। তবে উচ্চতা সীমা, নিরাপত্তা ঝুঁকি, পরিবেশগত প্রভাব এবং লুই আই কানের মূল নকশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় বারবার আপত্তি ওঠে বিভিন্ন মহলে।
সবশেষে লুই আই কানের মূল নকশা যুক্তরাষ্ট্র থেকে সংগ্রহ করা হলেও দেশের ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় শেখ হাসিনা শেষ পর্যন্ত সমাধি সরানোর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। পরে ২০২২ সালে সেখানে নতুন পার্ক নির্মাণের আরেকটি প্রকল্প নেয়া হলেও সেটিও বাস্তবায়নের আগেই হারিয়ে যায়।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন