আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে নির্বাচনের পর জাতীয় সরকার (ন্যাশনাল গভর্নমেন্ট) গঠন। বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে তুমুল বিতর্ক, হিসাব-নিকাশ ও নানা জল্পনা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংকট, নির্বাচনকেন্দ্রিক আস্থাহীনতা এবং আন্তর্জাতিক চাপ এই তিন বাস্তবতা মিলেই জাতীয় সরকার গঠনের ভাবনাকে সামনে এনেছে।
বিএনপি শুরু থেকেই দাবি করে আসছে, একটি অংশগ্রহণমূলক, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমেই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে। দলটির শীর্ষ নেতারা প্রকাশ্যে জাতীয় সরকারের প্রস্তাব পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান না করলেও এটিকে ‘নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভরশীল’ বলে উল্লেখ করছেন।
বিএনপির অভ্যন্তরীণ একটি অংশ মনে করে, যদি নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র পরিচালনায় বৃহত্তর ঐকমত্যের প্রয়োজন দেখা দেয়, তাহলে বিএনপি সেখানে নেতৃত্বমূলক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে দলটির কঠোর অবস্থান হলো্তক্ষমতাসীনদের কৌশলগত প্রস্তাবে রাজনৈতিক ফাঁদে পা দেওয়া যাবে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জাতীয় সরকার গঠন কেবল দলগুলোর সমঝোতার বিষয় নয়; এটি নির্ভর করবে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা, ফলাফলের বৈধতা এবং পরবর্তী রাজনৈতিক চাপের ওপর। সব মিলিয়ে, আগামী নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক কাঠামো নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার একটি মোড়বদলের সূচনা হতে পারে যখানে বিএনপি ও জামায়াতের ভূমিকা থাকবে আলোচনার কেন্দ্রেই। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন-পরবর্তী সরকার গঠন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা জোরালো হয়েছে।
বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর প্রস্তাবিত ‘জাতীয় সরকার’ এবং বিএনপির ঘোষিত ‘জাতীয় ঐকমত্যের সরকার’ এই দুই ধারণা নিয়ে চলছে তুলনামূলক বিশ্লেষণ। প্রশ্ন উঠেছে, এই দুই প্রস্তাবের মধ্যে আদৌ কোনো মিল আছে কি না, নাকি এগুলো মূলত ভিন্ন রাজনৈতিক লক্ষ্য থেকে উত্থাপিত।
সমপ্রতি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের এক বৈঠকের পর বিষয়টি
নতুন করে আলোচনায় আসে। যদিও বৈঠক শেষে জামায়াতের পক্ষ থেকে সরকার কাঠামো নিয়ে কোনো স্পষ্ট প্রস্তাব দেওয়া হয়নি, তবে নির্বাচনের পর সরকার গঠনের আগে বিএনপির সঙ্গে আলোচনায় বসার আগ্রহ প্রকাশ করেন জামায়াতের আমির। তার বক্তব্যে জাতির স্থিতিশীলতা ও সমন্বিত সিদ্ধান্তের ওপর গুরুত্ব দেওয়ায় রাজনৈতিক মহলে নানা ব্যাখ্যার জন্ম দেয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত সচেতনভাবেই নির্বাচন-পরবর্তী সরকার গঠনের প্রশ্নটি আলোচনার কেন্দ্রে রাখতে চাইছে। এর ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা জল্পনা দেখা দিয়েছে শেষ পর্যন্ত বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে কোনো সমঝোতা হবে কি না, সংসদে কার্যকর বিরোধী দল থাকবে কি না, নাকি আবারও একক কর্তৃত্বের সংসদ গঠিত হবে।
উল্লেখ্য, এই বৈঠকটি হয় ভিন্ন এক আবহে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পরদিন, ১ জানুয়ারি, জামায়াতের আমির বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে গিয়ে শোকবইয়ে স্বাক্ষর করেন। সেখানেই তারেক রহমানের সঙ্গে রাজনৈতিক আলোচনা হয়।
বৈঠক শেষে শফিকুর রহমান বলেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর দেশের অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক কাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই বাস্তবতায় এককভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা কঠিন, বরং জাতীয় ঐকমত্য ও পারস্পরিক সহযোগিতাই জরুরি। তিনি জানান, নির্বাচন শেষে সরকার গঠনের আগে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসে জাতির স্বার্থে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
যদিও এই বক্তব্যে নির্দিষ্ট কোনো সরকার কাঠামোর কথা বলা হয়নি, তবুও ‘সরকার গঠনের আগে আলোচনা’র ইঙ্গিত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টি কেড়েছে। এমনকি জামায়াতের আমির নিজেও স্বীকার করেছেন, তার বক্তব্যে একটি ইঙ্গিত রয়েছে।
তবে বাস্তবতা হলো্তবর্তমানে বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্ক প্রকাশ্যেই টানাপোড়েনপূর্ণ। আওয়ামী লীগের শাসনের পতনের পর রাজনৈতিক মাঠে জামায়াত বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছে। দুই দলের নেতাদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও অভিযোগও সামনে এসেছে।
নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি ও জামায়াত এখন ভিন্ন দুটি রাজনৈতিক জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্রদের অনুপস্থিতিতে নির্বাচনী প্রতিযোগিতা জোরদার করাই সক্রিয় দলগুলোর কৌশল।
জামায়াত নির্বাচন-পরবর্তী জাতীয় সরকার গঠনের ক্ষেত্রে তিনটি শর্তের কথা বলছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং জুলাই আন্দোলনের আলোকে প্রস্তাবিত সংস্কার বাস্তবায়ন। এই শর্তে যারা একমত হবে, তাদের নিয়েই সরকার গঠনের কথা ভাবছে দলটি।
অন্যদিকে বিএনপি বলছে, তারা জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠনে আগ্রহী হলেও জামায়াতকে বাদ রেখেই সেই প্রক্রিয়া এগোবে। বিএনপির নেতাদের মতে, সব দলকে সরকারে অন্তর্ভুক্ত করলে সংসদে কার্যকর বিরোধী দল থাকবে না এবং গণতান্ত্রিক ভারসাম্য নষ্ট হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত, প্রকাশ্য অবস্থান বিবেচনায় বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সরকার গঠন নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানোর সম্ভাবনা আপাতত কম। কারণ উভয় দলই নির্বাচনে পৃথক শিবিরের নেতৃত্ব দিচ্ছে এবং একে অপরকে বাদ দিয়েই নিজেদের প্রস্তাব সামনে আনছে।
সব মিলিয়ে, নির্বাচন-পরবর্তী সরকার গঠন নিয়ে আলোচনা যতই বাড়ছে, বাস্তব রাজনৈতিক সমীকরণ ততই জটিল হয়ে উঠছে। আগামী নির্বাচনই নির্ধারণ করব্তেএই আলোচনা কেবল কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি বাস্তব রাজনীতিতে নতুন কোনো সমীকরণ তৈরি হবে।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন