স্বাস্থ্য খাতের দৃশ্যমান কারিগর স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর

তানজিদ সরওয়ার প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৪, ২০২৬, ০৪:০৯ পিএম
স্বাস্থ্য খাতের দৃশ্যমান কারিগর স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর

একটি দেশের শক্তিশালী স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মেরুদণ্ড হলো তার অবকাঠামো। সুসজ্জিত হাসপাতাল, আধুনিক ক্লিনিক এবং প্রান্তিক পর্যায়ের স্বাস্থ্য কেন্দ্র ছাড়া মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা প্রদান প্রায় অসম্ভব। বাংলাদেশে এই বিশাল অবকাঠামোগত উন্নয়নের নেপথ্য কারিগর হিসেবে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (হেলথ ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট)। 

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে এই সংস্থাটি দেশের প্রতিটি কোণায় বিশেষ করে গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবার ভৌত কাঠামো নির্মাণ, উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে নিয়োজিত। দক্ষ প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে আধুনিক ও স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে বিশেষ ভূমিকা পালন করছে।

স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান কাজ হলো স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সংক্রান্ত অবকাঠামোগুলোর নির্মাণ, উন্নয়ন, সম্প্রসারণ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা। জেলা পর্যায়ের বড় হাসপাতাল থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পর্যায়ের কমিউনিটি ক্লিনিক পর্যন্ত প্রতিটি স্থাপনার স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতা নির্ভর করে এই অধিদপ্তরের ওপর।

যেকোনো বড় স্থাপনার ভিত্তি হলো তার সঠিক পরিকল্পনা ও নকশা। এই অধিদপ্তরের প্রকৌশলীরা বিভিন্ন স্বাস্থ্য স্থাপনার জন্য বিস্তারিত প্রকৌশল নকশা তৈরি করেন। একটি আধুনিক হাসপাতালের জন্য সাধারণ ভবনের চেয়ে ভিন্নতর ও জটিল নকশার প্রয়োজন হয়। অপারেশন থিয়েটার, আইসিইউ, সেন্ট্রাল অক্সিজেন লাইন এবং জরুরি বিভাগের অবস্থান নির্ধারণে উচ্চতর কারিগরি জ্ঞান ব্যবহার করা হয়।

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে নতুন নতুন স্বাস্থ্য অবকাঠামো নির্মাণ করা স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রাথমিক দায়িত্ব। এর পাশাপাশি পুরনো ও জরাজীর্ণ কাঠামোর সম্প্রসারণ, আধুনিকায়ন এবং সংস্কার কাজও তারা করে থাকে। বিশেষ করে ক্যানসার, কিডনি বা হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের মতো বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা হয়। প্রকল্প গ্রহণ করাই শেষ কথা নয়, এর গুণগত মান নিশ্চিত করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। 

ওয়ার্ড পর্যায় থেকে জেলা পর্যায় পর্যন্ত চলমান সকল প্রকল্পের কাজ সঠিক মানদণ্ড এবং নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে শেষ হচ্ছে কিনা, তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত মাঠ পর্যায়ে তদারকি করা হয়। 

একটি হাসপাতাল কেবল দেয়াল আর ছাদ নয়, এতে প্রয়োজন হয় জটিল চিকিৎসা যন্ত্রপাতি এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থা। 

স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, সরঞ্জাম এবং নির্মাণ সামগ্রী সংগ্রহ, সরবরাহ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করে। প্রকল্পের বাজেট প্রণয়ন থেকে শুরু করে দরপত্র বা টেন্ডার আহ্বান, চুক্তি ব্যবস্থাপনা এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণ সবকিছুই এই অধিদপ্তরের প্রশাসনিক ও আর্থিক কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ই-টেন্ডারিংয়ের মতো আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।

স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর একটি সুশৃঙ্খল সাংগঠনিক কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। এর প্রতিটি স্তরের কর্মকর্তাদের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব রয়েছে। অধিদপ্তরের প্রধান হিসেবে সামগ্রিক কার্যক্রম পরিচালনা ও নেতৃত্ব দেন প্রধান প্রকৌশলী। বর্তমানে এই গুরুদায়িত্ব পালন করছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মীর সারোয়ার হোসাইন চৌধুরী। তার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে অধিদপ্তরটি দেশের স্বাস্থ্য অবকাঠামোকে গবেষণার মাধ্যমে আরও উন্নত ও পরিবেশবান্ধব করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।

শীর্ষ নেতৃত্বে আরও রয়েছেন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম সরকার, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পিএন্ডএ) শাহরিয়ার হাসান মহিউদ্দিন, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (তড়িৎ) মোহাম্মদ আব্দুল হামিদ, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (তড়িৎ) আবুল কাইয়ুম খান এবং উপপ্রধান স্থপতি আসমা জাহান। 

নির্বাহী প্রকৌশলীরা পাম্পিং স্টেশন, পানির লাইন এবং প্রধান অবকাঠামোর জটিল ডিজাইন প্রণয়ন করেন। অন্যদিকে নির্বাহী প্রকৌশলী নির্মাণ সামগ্রী ও সরঞ্জামের সঠিক ক্রয় ও সরবরাহ নিশ্চিত করেন যাতে প্রকল্পের কাজ মাঝপথে থেমে না যায়। মাঠ পর্যায়ের মূল শক্তি হলেন উপবিভাগীয় ও সহকারী প্রকৌশলীরা। তারা নিজ নিজ এলাকায় প্রকল্প বাস্তবায়ন, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং কাজের অগ্রগতি ঊর্ধ্বর্তন কর্তৃপক্ষকে জানান।

গ্রামীণ জনপদের কমিউনিটি ক্লিনিক বা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের যেকোনো ছোটখাটো ত্রুটি নিরসনে তারাই অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

একটি প্রকল্প সফল করতে বাজেট অনুমোদন, ভ্যাট ও আয়কর সংক্রান্ত আইনি জটিলতা নিরসন এবং জনবল ব্যবস্থাপনার জন্য একঝাঁক প্রশাসনিক ও কারিগরি কর্মকর্তা কাজ করেন। তারা ঊর্ধ্বর্তন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী জবাবদিহিতা নিশ্চিত করেন। 

স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কাজ কেবল ইট পাথরের দেয়াল নির্মাণেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরাসরি প্রভাব ফেলে। কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রের মাধ্যমে এই অধিদপ্তর স্বাস্থ্যসেবাকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছে। 

দেশের প্রতিটি বিভাগে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বিশেষায়িত ইনস্টিটিউট নির্মাণের ফলে এখন জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য মানুষকে কেবল ঢাকা বা বিদেশমুখী হতে হচ্ছে না। দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় সাইক্লোন শেল্টার কাম স্বাস্থ্য কেন্দ্র নির্মাণ এবং করোনাকালীন জরুরি ভিত্তিতে আইসোলেশন সেন্টার ও অক্সিজেন প্ল্যান্ট স্থাপনে তাদের অবদান অবিস্মরণীয়।

সীমিত সম্পদ এবং জায়গার স্বল্পতা সত্ত্বেও প্রকৌশলীরা নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে যাচ্ছেন। বর্তমানে পরিবেশবান্ধব এবং জ্বালানি সাশ্রয়ী গ্রিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার বা সবুজ অবকাঠামো হাসপাতাল ভবন নির্মাণের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। ডিজিটাল অ্যাপ এবং স্যাটেলাইট ইমেজের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের নির্মাণাধীন কাজের স্মার্ট মনিটরিং করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আধুনিক স্থাপত্যশৈলী এবং দীর্ঘস্থায়ী নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহারের লক্ষ্যে অধিদপ্তরের নিজস্ব গবেষণাগার কাজ করে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর হলো দেশের স্বাস্থ্য খাতের নেপথ্যের শক্তি। 

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মীর সরোয়ার হোসাইন চৌধুরীর সুযোগ্য নেতৃত্বে এবং একদল নিবেদিতপ্রাণ প্রকৌশলীর পরিশ্রমে আজ বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অবকাঠামো এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। দুর্গম পাহাড় থেকে শুরু করে চরাঞ্চল সবখানেই আজ সুদৃশ্য স্বাস্থ্য কেন্দ্র দৃশ্যমান। পেশাদারিত্ব, সততা এবং কঠোর তদারকির মাধ্যমে এই অধিদপ্তরটি দেশের মানুষের জীবনের মান উন্নয়নে এবং সুস্থ সবল জাতি গঠনে অবিরাম কাজ করে যাচ্ছে। 

সরকারি সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে তারা প্রমাণ করছে যে সুপরিকল্পিত প্রকৌশল কীভাবে একটি জাতির ভাগ্য পরিবর্তন করে দিতে পারে।

ইএইচ