ক্যাম্পাস থেকে মন্ত্রিসভায়

রাজনৈতিক প্রতিবেদক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২৬, ১২:০৬ এএম
ক্যাম্পাস থেকে মন্ত্রিসভায়

বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলকে বলা হয় নেতৃত্বের অন্যতম ‘নার্সারি’। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) যখন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হলো, তখন সেই নেতৃত্বের নার্সারি থেকে উঠে আসা পাঁচজন সাবেক ছাত্রনেতার কাঁধে পড়ল রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুদায়িত্ব।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত নতুন মন্ত্রিসভায় একসময়ের রাজপথ কাঁপানো পাঁচজন ছাত্রনেতার অন্তর্ভুক্তিকে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা দেখছেন ‘তারুণ্যের জয়যাত্রা’ এবং ‘প্রজন্মগত ভারসাম্য’ হিসেবে।

ছাত্রদল থেকে মন্ত্রিসভায় যারা

নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় স্থান পাওয়া এই পাঁচ নেতা একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশের ক্যাম্পাস রাজনীতিতে অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। তারা হলেন- শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি: ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি এবং বর্তমানে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব। তিনি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন।

সুলতান সালাউদ্দিন টুকু: ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি এবং যুবদলের সাবেক শীর্ষ নেতা। তিনি কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন।

হাবিবুর রশিদ: ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। তিনি পেয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব।

রাজীব আহসান: ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি। তিনিও হাবিবুর রশিদের সঙ্গে একই মন্ত্রণালয়ে (সড়ক, রেল ও নৌ) প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

ফরহাদ হোসেন আজাদ: ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি। তিনি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানির সঙ্গে কাজ করবেন।

তারেক রহমানের কৌশলী সিদ্ধান্ত: তারুণ্যে আস্থা

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার ৫০ সদস্যের মন্ত্রিসভায় (২৫ জন মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী) ৪১ জনকেই নতুন মুখ হিসেবে এনে চমক দিয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একসঙ্গে পাঁচজন সাবেক ছাত্রনেতাকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা কেবল পুরস্কার নয়, বরং এটি একটি সুদূরপ্রসারী কৌশল।

আন্দোলনের মূল্যায়ন: এই পাঁচ নেতাই গত ১৫ বছরে বিএনপির প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে সক্রিয় ছিলেন। তাদের কারাবরণ এবং ত্যাগকে দল মূল্যায়ন করেছে।

তৃণমূলের সাথে সংযোগ: ছাত্ররাজনীতি থেকে উঠে আসা এই নেতাদের সাথে দলের তৃণমূল কর্মীদের নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে। এটি সরকারকে সাধারণ মানুষের পালস বুঝতে সাহায্য করবে।

প্রশাসনিক গতিশীলতা: ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে যে সাংগঠনিক দক্ষতা তৈরি হয়, তা সচিবালয়ের দাপ্তরিক কাজে গতিশীলতা আনবে বলে মনে করা হচ্ছে।

কে কোন চ্যালেঞ্জের মুখে?

শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, নদী খনন ও জলাবদ্ধতা নিরসন। সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, কৃষি, খাদ্য ও মৎস্য, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও সার-বীজ সরবরাহ নিশ্চিত করা।

হাবিবুর রশিদ ও রাজীব আহসান, সড়ক, রেল ও নৌ-পরিবহন, সড়কে চাঁদাবাজি বন্ধ ও লক্কড়-ঝক্কড় পরিবহন সংস্কার।

ফরহাদ হোসেন আজাদ, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় (প্রতিমন্ত্রী), দখলমুক্ত জলাশয় ও খাল খনন কর্মসূচি বাস্তবায়ন।

ছাত্রদলের সাবেক এই নেতাদের নিয়ে কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা থাকলেও সাধারণ নাগরিকদের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী। বিশেষ করে সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় হাবিবুর রশিদ ও রাজীব আহসানের মতো নতুন প্রজন্মের নেতাদের পারফরম্যান্সের ওপর নজর থাকবে পুরো দেশের। অন্যদিকে, সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর দায়িত্বের সঙ্গে সাধারণ মানুষের খাবারের প্লেট এবং পকেটের সম্পর্ক রয়েছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষকদের মতে, ছাত্ররাজনীতিতে স্লোগান দেয়া আর সচিবালয়ে বসে নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নেওয়া এক নয়। এই নেতাদের জন্য এখন আসল পরীক্ষা হলো আমলাতন্ত্রকে দক্ষভাবে পরিচালনা করা এবং নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিফলন ঘটানো।

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নাকি নতুন সূচনা?

অতীতের বিএনপি সরকারগুলোতেও ছাত্রদলের অনেক নেতা মন্ত্রী হয়েছেন। তবে এবার প্রেক্ষাপট ভিন্ন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক শুন্যতার পর একটি বড় বিজয় নিয়ে আসা এই ‘ইয়াং ব্রিগেড’ যদি সফল হয়, তবে বাংলাদেশে ছাত্ররাজনীতির হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার হবে। তারেক রহমানের এই ‘টিম ৫’ আগামী দিনগুলোতে কতখানি কার্যকরভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করছে বিএনপির আগামী দিনের ভবিষ্যৎ।

জেএইচআর