কলম যার পরিচয়, দল নয় তার আশ্রয়

বিশেষ প্রতিবেদক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২৬, ১২:০৪ এএম
কলম যার পরিচয়, দল নয় তার আশ্রয়

জুলাই বিপ্লব উত্তর বাংলাদেশে যখন এক নতুন গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা শুরু হয়েছে, তখন রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত সংবাদমাধ্যমের আকাশে এখনো পুরোনো সিন্ডিকেটের কালো মেঘ ঘুরে বেড়াচ্ছে। ‘নয়া বাংলাদেশ’ গড়ার কারিগর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে আজ সারা দেশের সাধারণ সংবাদকর্মী ও ক্ষুদ্র সংবাদপত্র মালিকদের পক্ষ থেকে এক ঐতিহাসিক দাবি উত্থাপিত হয়েছে। তাদের মূল সুরটি হলো- সাংবাদিকের পরিচয় তার কলম, কোনো রাজনৈতিক দল নয়; আর সংবাদপত্র কোনো গোষ্ঠীর হবে না, তা হবে এ দেশের আপামর মানুষের।

কর্পোরেট সিন্ডিকেটের ‘ভোলবদল’ ও নয়া সংকট

প্রতিবেদনে দেখা যায়, রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তনের সাথে সাথে একদল অতি-সুবিধাবাদী ‘মিডিয়া মোঘল’ ও ‘সিন্ডিকেট’ অত্যন্ত চতুরতার সাথে নিজেদের খোলস পাল্টে ফেলেছে। গত দেড় দশকেরও বেশি সময় যারা ফ্যাসিবাদী শাসনের তল্পিবাহক হিসেবে কাজ করেছে এবং ৫ আগস্টের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত বিপ্লববিরোধী প্রচারণা চালিয়েছে, আজ তারাই আবার নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় ‘শুভাকাঙ্ক্ষী’ সেজে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে প্রভাব  বিস্তারের চেষ্টা করছে। এই সিন্ডিকেটগুলো মূলত বড় বড় কর্পোরেট হাউসের ছত্রছায়ায় পরিচালিত। এরা বিগত সরকারের আমলে শত শত কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ জালিয়াতি, বিদেশে অর্থপাচার এবং সরকারি বিজ্ঞাপনের বেশিরভাগ কুক্ষিগত করে সংবাদপত্র শিল্পকে একটি ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করেছিল। আজ যখন বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে জবাবদিহিতার সময় এসেছে, তখন তারা অত্যন্ত সুকৌশলে নিজেদের অপরাধ ঢাকতে ‘বলির পাঁঠা’ বানাচ্ছে দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি সংবাদপত্রগুলোকে।

‘লেবাস’ রাজনীতির যাঁতাকলে ক্ষুদ্র সংবাদপত্র

সংবাদপত্র জগতের এক বিশাল অংশজুড়ে রয়েছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো। এরা কোনো বড় সিন্ডিকেটের অংশ নয়, বরং সীমিত জনবল ও অতি সামান্য বাজেটে জনমানুষের কথা বলার চেষ্টা করে। অথচ বর্তমান প্রেক্ষাপটে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, কোনো ধরনের সঠিক তদন্ত বা আর্কাইভ যাচাই ছাড়াই কেবল ব্যক্তিগত আক্রোশ বা স্থানীয় রাজনীতির দোহাই দিয়ে এই ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর গায়ে ‘দলীয় লেবাস’ লাগিয়ে দেয়া হচ্ছে।

কোনো পত্রিকা ‘অমুক দলের’ বা ‘তমুক পন্থী’- এই তকমা দিয়ে সেগুলোকে প্রশাসনিকভাবে কোণঠাসা করা হচ্ছে। এর ফলে হাজার হাজার সংবাদকর্মী আজ কর্মহীন হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। প্রশ্ন উঠেছে, বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কি কেবল বড় হাউসের জন্য সংরক্ষিত? ক্ষুদ্র সংবাদপত্রগুলো কি তবে কেবল রাজনৈতিকপ্রতিহিংসার শিকার হয়ে হারিয়ে যাবে?

আর্থিক অপরাধ ও আর্কাইভ তদন্তের দাবি

সাধারণ সংবাদকর্মীদের পক্ষ থেকে প্রশাসনের প্রতি একটি বিনীত কিন্তু জোরালো আরজি জানানো হয়েছে, চাটুকারদের কথায় কান না দিয়ে গভীর তদন্ত পরিচালনা করা হোক। এক্ষেত্রে তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেয়ার দাবি উঠেছে—

শ্বেতপত্র প্রকাশ : বিগত সব সরকারের আমলে কোন পত্রিকা কখন কার পক্ষে দালালি করেছে এবং নীতি বিসর্জন দিয়ে কুরুচিপূর্ণ সংবাদ পরিবেশন করেছে, তার একটি পূর্ণাঙ্গ আর্কাইভাল শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হোক। তথাকথিত বড় হাউসগুলোর পুরোনো পাতা উল্টালেই তাদের নীতিহীনতার প্রমাণ পাওয়া যাবে।

আর্থিক অপরাধের বিচার : সংবাদপত্রের আড়ালে যারা ব্যাংক লোপাট করেছে এবং বিদেশে অর্থপাচার করেছে, তাদের কঠিন বিচারের আওতায় আনতে হবে। তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে সংবাদপত্র শিল্পের উন্নয়নে ব্যয় করা হোক।

লেবাসমুক্ত সাংবাদিকতা : যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক সিল মেরে দেয়া, বন্ধ করতে হবে; দলীয় ট্যাগ লাগিয়ে একটি সৃজনশীল ও মহান পেশাকে কলঙ্কিত করা থেকে প্রশাসনকে বিরত থাকতে হবে।

প্রেস অ্যাক্ট ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ

বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, দেশের বিদ্যমান প্রেস অ্যাক্ট কখনোই কোনো সংবাদপত্রকে ধ্বংস বা কণ্ঠরোধ করার কথা বলে না। সংবাদপত্র হলো রাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠান, কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির সম্পত্তি নয়। কয়েকজন মালিক বা সম্পাদকের ব্যক্তিগত অপরাধের দায় কেন পুরো প্রতিষ্ঠান এবং সেখানে কর্মরত শত শত সাধারণ কর্মচারী নেবে? একটি পত্রিকা বন্ধ হওয়া মানে কেবল একটি কণ্ঠস্বর বন্ধ হওয়া নয়, বরং বহু মানুষের রুটি-রুজির পথ বন্ধ হওয়া এবং জাতীয় অর্থনীতিতে আঘাত হানা।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি প্রত্যাশা ও সুপারিশমালা

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে দীর্ঘ সময় রাজনৈতিক জুলুম ও মিথ্যে মামলার শিকার হয়েছেন। তাই তিনি জানেন, মিথ্যে অপবাদ বা লেবাস লাগিয়ে দেয়া কতটা যন্ত্রণাদায়ক। নয়া বাংলাদেশের রূপকার হিসেবে তার কাছে সংবাদকর্মীদের বিশেষ সুপারিশমালা হলো—

১. নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন : গত দুই দশকের সংবাদপত্রের ভূমিকা তদন্তে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিশন গঠন করা। যারা প্রকৃত অপরাধী তাদের বিচার হোক, কিন্তু সাধারণ সংবাদকর্মীদের সুরক্ষা দেয়া হোক।

২. বিজ্ঞাপন ও ডিএফপি বৈষম্য দূরীকরণ : প্রভাবশালী সিন্ডিকেটগুলো যেন সরকারি বিজ্ঞাপন কুক্ষিগত করতে না পারে। সার্কুলেশন ও কন্টেন্টের মান অনুযায়ী ডিএফপি সুবিধা সমবণ্টন নিশ্চিত করা।

৩. কল্যাণ তহবিল গঠন : পাচারকৃত অর্থ উদ্ধার করে বেকার সংবাদকর্মীদের জন্য একটি টেকসই কল্যাণ তহবিল গঠন করা।

৪. বেকারত্ব রোধ : রাজনৈতিক কারণে কোনো পত্রিকা বন্ধ না করে বরং প্রশাসনিক শৃঙ্খলার মধ্যে এনে সেগুলোকে সচল রাখার ব্যবস্থা করা।

সত্যের আয়না হোক সংবাদপত্র

সংবাদপত্রের কোনো নির্দিষ্ট দল থাকতে পারে না; এর একমাত্র পক্ষ হবে সত্য এবং এ দেশের মানুষ। সাংবাদিকের পরিচয় তার দলীয় পরিচয় নয়, বরং তার ক্ষুরধার লেখনী। নয়া বাংলাদেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষায় লেবাসধারী সিন্ডিকেট দমন করা এখন সময়ের দাবি।

সারা দেশের সংবাদকর্মীদের বিশ্বাস, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত ধরেই বাংলাদেশে ‘মিডিয়া মোঘলদের’ অনৈতিক সিন্ডিকেট ভেঙে চুরমার হবে। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই যেখানে সংবাদপত্র হবে সত্যের প্রকৃত আয়না, আর সাংবাদিকরা পাবেন তাদের কাঙ্ক্ষিত মর্যাদা।

সত্যান্বেষী সাংবাদিকতা বেঁচে থাকুক, সুরক্ষিত থাকুক বাংলাদেশের মানচিত্র ও মানুষের কণ্ঠস্বর।

জেএইচআর