রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর বর্তমান বিএনপি সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে জনপ্রশাসনের আমূল সংস্কার। অভিযোগ উঠেছে, বিগত ১৫ বছরের আওয়ামী লীগ শাসনামল এবং পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় নিয়োগপ্রাপ্ত ও সুবিধাভোগী এক বিরাট অংশ এখনো প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ নীতি-নির্ধারণী পদে বহাল রয়ে গেছেন। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর গোপন প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে সংশ্লিষ্ট মহল সতর্ক করছে যে, এই ‘পুরানো বলয়’ থেকে প্রশাসনকে মুক্ত করতে না পারলে বর্তমান সরকারের স্বচ্ছতা ও সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
এই সংকটময় পরিস্থিতিতে গতকাল অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, পরিবর্তন একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং সরকার অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে পরিবর্তন আনবে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদন : প্রশাসনের রন্র্লে রন্র্লে ‘বিগত সরকার’
সরকারের উচ্চপর্যায়ে জমা দেয়া সামপ্রতিক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে এক উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ এখনো পূর্ববর্তী শাসনের মতাদর্শ ও স্বার্থ রক্ষা করে চলেছেন।
ক্যাডার বৈষম্য: বিগত ১৫ বছরে নিয়োগপ্রাপ্ত বিসিএস কর্মকর্তাদের একটি বিশাল অংশকে মেধার পরিবর্তে রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে পদায়ন করা হয়েছিল।
নীতিমালায় বাধা: অনেক দপ্তরেই বর্তমান সরকারের সংস্কারমূলক ফাইলগুলো রহস্যজনকভাবে মন্থরহয়ে পড়ছে। একে প্রশাসনিক ‘অন্তর্ঘাত’ বা ‘স্যাবোটাজ’ হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
তথ্য পাচার: সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ও গোপনীয় তথ্য এখনো বাইরে পাচার হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে গোয়েন্দারা ইঙ্গিত দিয়েছেন।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর আশ্বাস : ‘আস্তে আস্তে সব পরিবর্তন হবে’
প্রশাসনের এই স্থবিরতা এবং জনমনে তৈরি হওয়া অসন্তোষ নিয়ে গতকাল মুখ খোলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘একটি দীর্ঘ সময় ধরে যারা প্রশাসনকে দলীয়করণ করেছে, তাদের রাতারাতি সরিয়ে দেয়া কারিগরিভাবে জটিল। তবে আমরা থেমে নেই। নতুন সরকারের একটি সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি ও ভিশন আছে। সেই ভিশন বাস্তবায়নের জন্য যাদের যেখানে প্রয়োজন, তাদের সেখানে আনা হবে। তিনি আরও যোগ করেন, ‘পরিবর্তন তো শুধু এক জায়গায় হচ্ছে না, পরিবর্তন সবখানেই হচ্ছে। এবং এটা নতুন সরকারের দায়িত্ব। আমরা চাই একটি নিরপেক্ষ এবং পেশাদার প্রশাসন। তাই ধীরে ধীরে কিন্তু সুনিশ্চিতভাবে আমরা প্রতিটি দপ্তরে সংস্কার করব। যোগ্য ও বঞ্চিত কর্মকর্তাদের প্রাধান্য দেয়া হবে।
রাজনৈতিক চাপ ও স্বচ্ছতার সংকট
বিএনপি সরকারের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, বিগত সরকারের লোকজন প্রশাসনে থেকে গেলে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বিশেষ করে আর্থিক খাত, স্বরাষ্ট্র এবং আইন মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে যদি ‘পুরানো প্রেতাত্মারা’ সক্রিয় থাকে, তবে দুর্নীতির বিচার এবং অর্থপাচার রোধের মতো কাজগুলো বাধাগ্রস্ত হবে। তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের পক্ষ থেকেও প্রচণ্ড চাপ রয়েছে যাতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের ওএসডি করা হয় অথবা বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। তাদের দাবি, যারা বিগত আন্দোলন দমনে ভূমিকা রেখেছিল বা দুর্নীতির মাধ্যমে পাহাড় গড়েছে, তাদের প্রশাসনে থাকা মানেই হলো বিপ্লবের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা।
সংস্কারের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ
প্রশাসনিক শুদ্ধি অভিযান চালাতে গিয়ে বিএনপি সরকার কিছু বাস্তবসম্মত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে—
শূন্যতা তৈরি হওয়া: একযোগে বড় সংখ্যক কর্মকর্তাকে সরিয়ে দিলে প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা বা ‘ভ্যাকুয়াম’ তৈরি হতে পারে।
যোগ্যতার বিচার: কেবল রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে সরানো বা নিয়োগ দেয়া হলে আবারও সেই ‘দলীয়করণের’ পুরনো চক্রে দেশ পড়ে যাবে। তাই মেধাবী ও পেশাদার কর্মকর্তাদের খুঁজে বের করা একটি বড় কাজ। আদালতি জটিলতা: নিয়মবহির্ভূতভাবে পদোন্নতি বাতিল বা পদচ্যুতি করলে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে, যা সরকারের সময় নষ্ট করবে।
পরবর্তী পদক্ষেপ : গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে স্ক্রিনিং
সরকার এখন গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে একটি ‘মাস্টার লিস্ট’ তৈরি করছে। এই তালিকার ভিত্তিতেই পরবর্তী বড় রদবদলগুলো আসবে।
যাচাই-বাছাই: কর্মকর্তাদের বিগত কয়েক বছরের কর্মকাণ্ড, সম্পদের বিবরণ এবং রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা কঠোরভাবে যাচাই করা হচ্ছে।
বঞ্চিতদের মূল্যায়ন: যারা বিগত ১৫ বছর যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক কারণে পদোন্নতি পাননি বা ডাম্পিং স্টেশনে ছিলেন, তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
একটি কার্যকর প্রশাসনের অপেক্ষায়
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকার হার্ডলাইনে না গিয়ে সুশৃঙ্খলভাবে পরিবর্তনের পথে হাঁটছে। তবে সময় খুব দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। জনগণের প্রত্যাশা হলো, একটি স্বচ্ছ এবং গতিশীল প্রশাসন যা কোনো নির্দিষ্ট দলের নয়, বরং রাষ্ট্রের সেবা করবে। গোয়েন্দা রিপোর্টের ভিত্তিতে প্রশাসনের আগাছা দ্রুত পরিষ্কার করা না গেলে বিএনপি সরকারের ‘সুশাসন’ ও ‘স্বচ্ছতা’র যে প্রতিশ্রুতি, তা কেবল কাগুজে দলিলে সীমাবদ্ধ থেকে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন