ইতিহাসে সর্বনিম্ন পর্যায়ে ঋণ প্রবৃদ্ধি

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: মার্চ ২, ২০২৬, ১২:১৫ এএম
ইতিহাসে সর্বনিম্ন পর্যায়ে ঋণ প্রবৃদ্ধি

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহে নজিরবিহীন ধস নেমেছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, আকাশচুম্বী সুদহার এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার চরম সংকটে চলতি বছরের জানুয়ারিতে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে মাত্র ৬.০৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা দেশের ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে এযাবৎকালের সর্বনিম্ন। গতকাল রোববার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এই আশঙ্কাজনক তথ্য জানা গেছে। অর্থনীতিবিদরা এই পরিস্থিতিকে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের জন্য একটি ‘অশনি সংকেত’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাদের মতে, ঋণপ্রবাহের এই মন্থর গতি দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

পতনের পরিসংখ্যান : জুলাই থেকে জানুয়ারির চিত্র

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময় থেকেই বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির গ্রাফটি নিচের দিকে নামতে শুরু করে। জুলাই ২০২৪: সে সময় ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১০.১৩ শতাংশ। আগস্ট ২০২৪: রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে এই হার দ্রুত কমতে থাকে। সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর ২০২৫: এই সময়ে প্রবৃদ্ধি যথাক্রমে ৬.২৯%, ৬.৩৫%, ৬.৫৮% এবং ৬.১ শতাংশে উঠানামা করলেও শেষ পর্যন্ত নিম্নমুখী ধারা বজায় থাকে। জানুয়ারি ২০২৬: সব রেকর্ড ভেঙে প্রবৃদ্ধি নেমেছে ৬.০৩ শতাংশে।

বিশ্লেষকদের মতে, নভেম্বরের সাময়িক বৃদ্ধিটি মূলত প্রকৃত বিনিয়োগ ছিল না; বরং জাতীয় নির্বাচনের আগে বড় বড় ঋণ পুনঃতফসিলের প্রভাবেই কাগজে-কলমে কিছুটা বেশি দেখা গিয়েছিল। প্রকৃত অর্থে বাজারে নতুন ঋণের চাহিদা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।

কেন বিনিয়োগ বিমুখ ব্যবসায়ীরা

ব্যবসায়ী এবং ব্যাংকিং খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের মতে, একাধিক নেতিবাচক কারণ একত্রে মিলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।

নীতি সুদহার ও ঋণের ব্যয় বৃদ্ধি

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির অংশ হিসেবে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে উন্নীত করেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাণিজ্যিক ঋণের ওপর, যার সুদহার বর্তমানে ১৫ শতাংশের কাছাকাছি। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের পক্ষে এত চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসায় টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

অবকাঠামো ও জ্বালানি সংকট

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান মনে করেন, শুধু সুদহার নয়, অবকাঠামো সংকটও বিনিয়োগের বড় বাধা। তিনি বলেন, ‘একজন বিনিয়োগকারী ঋণ নেয়ার আগে গ্যাস-বিদ্যুৎ ও বন্দরের সুবিধা দেখেন। বর্তমানে এসব সংকটের কারণে বিদ্যমান ব্যবসায়ীরাই তাদের পরিকল্পনা সমপ্রসারণ করতে পারছেন না।’

সরকারের বাড়তি ব্যাংক ঋণ

বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই (জুলাই-ডিসেম্বর) সরকার নিট ৫০ হাজার ৭৮২ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। ব্যাংকগুলোর সীমিত তারল্যের একটি বড় অংশ সরকার নিয়ে নেয়ায় বেসরকারি খাতের জন্য অর্থের জোগান কমে গেছে।

খেলাপি ঋণের পাহাড় ও ব্যাংকের সতর্কতা

ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে রেকর্ড পরিমাণ খেলাপি ঋণের চাপ রয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বিতরিত ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এই পাহাড়সমান খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলোর মূলধন পরিস্থিতি নাজুক হয়ে পড়েছে। ফলে করে ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো এখন অতি-সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।

অর্থনীতির বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব

বেসরকারি খাতের এই স্থবিরতা কেবল শিল্প খাতেই সীমাবদ্ধ নেই, এর প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ছে।

মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি হ্রাস: শিল্প-কারখানার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে, যা ভবিষ্যৎ শিল্পায়নের গতি কমিয়ে দিচ্ছে। উৎপাদন ও কর্মসংস্থান: অনেক কারখানা সক্ষমতার নিচে উৎপাদন করছে। নতুন বিনিয়োগ না হওয়ায় শিক্ষিত ও দক্ষ যুবকদের কর্মসংস্থান তৈরির পথ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ভোক্তা চাহিদা হ্রাস: বাজারে অর্থের সঞ্চালন কম থাকায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও চাহিদাও নিম্নমুখী।

নতুন গভর্নরের ঘোষণা : কতটুকু মিলবে স্বস্তি

এই মহাসংকটের মধ্যেই দায়িত্ব নিয়েছেন নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই তিনি বিনিয়োগ বাড়াতে এবং বন্ধ শিল্প-কারখানাগুলো পুনরায় চালু করতে নীতিগত সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। তার বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, বাংলাদেশ ব্যাংক হয়তো অচিরেই দীর্ঘদিনের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি থেকে সরে আসতে পারে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল সুদহার কমানো এই পরিস্থিতির দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে আনাই এখন প্রধান কাজ।

বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশে নেমে আসা মূলত একটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক মন্থরতার প্রতিচ্ছবি। যদি দ্রুত এই ঋণের প্রবাহ ৯ শতাংশের ওপরে ফেরানো না যায়, তবে শিল্প উৎপাদন আরও দুর্বল হবে এবং কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধার দীর্ঘ সময়ের জন্য পিছিয়ে যাবে। ২০২৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধ বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এক বড় অগ্নিপরীক্ষা হতে যাচ্ছে।