বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে সরাসরি সম্মানি পেতে যাচ্ছেন দেশের ধর্মীয় উপাসনালয়ের সেবকরা।
গতকাল শনিবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই যুগান্তকারী কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এই উদ্যোগের মাধ্যমে কেবল ইসলাম ধর্মের ইমাম-মুয়াজ্জিন নন, বরং মন্দির, গির্জা ও বৌদ্ধবিহারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাও অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন এক অনন্য সমপ্রীতির বন্ধনে।
এক ক্লিকেই ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ডিজিটাল সম্মানি : গতকাল শনিবার বেলা সোয়া ১১টায় অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী বগুড়ার বায়তুল রহমান সেন্ট্রাল মসজিদের ইমাম হোসাইন আহমেদ আবদুল্লাহর হাতে সম্মানীর প্রথম চেকটি তুলে দেন। এরপর তিনি ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার করে আইবাস সিস্টেমে একটি ‘সেন্ট বাটন’ প্রেস করেন। এর মাধ্যমে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে সংশ্লিষ্টদের পূর্বনির্ধারিত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সম্মানীর টাকা পৌঁছে যায়। প্রযুক্তিনির্ভর এই স্বচ্ছ বিতরণ পদ্ধতি নিশ্চিত করে যে, সরকারি ভাতার টাকা সরাসরি প্রকৃত সুবিধাভোগীদের হাতে পৌঁছাবে।
উপাসনালয় ও সুবিধাভোগীদের পরিসংখ্যান : এই কার্যক্রমটি একটি সুপরিকল্পিত প্রকল্পের অংশ হিসেবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্পের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী- মসজিদ: সারা দেশে চার হাজার ৯০৮টি মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমরা এই সুবিধার আওতায় আসছেন। মন্দির: ৯৯০টি মন্দিরের পুরোহিত ও সেবাইতদের জন্য সম্মানি বরাদ্দ করা হয়েছে। বৌদ্ধবিহার: ১৪৪টি বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষরা এই ভাতা পাবেন। গির্জা: ৩৯৬টি গির্জার যাজক ও পালকরা রাষ্ট্রীয় এই স্বীকৃতির অংশীদার হচ্ছেন।
ভাতা ও সম্মানীর আর্থিক কাঠামো : সরকার এই পাইলট প্রকল্পের জন্য একটি নির্দিষ্ট আর্থিক কাঠামো নির্ধারণ করেছে। এটি মূলত তৃণমূল পর্যায়ের ধর্মীয় নেতাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির লক্ষ্যে তৈরি করা হয়েছে।
মসজিদের জন্য বরাদ্দ (মাসিক ১০,০০০ টাকা) : ইমাম ৫,০০০ টাকা, মুয়াজ্জিন ৩,০০০ টাকা, খাদেম ২,০০০ টাকা।
অন্যান্য উপাসনালয়ের জন্য বরাদ্দ (মাসিক ৮,০০০ টাকা) : প্রধান দায়িত্বশীল (পুরোহিত/ অধ্যক্ষ/ যাজক): ৫,০০০ টাকা, সহকারী দায়িত্বশীল (সেবাইত/ উপাধ্যক্ষ/পালক): ৩,০০০ টাকা।
বোনাস ও বিশেষ সুবিধা : জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ অনুষ্ঠানে এক বিশেষ ঘোষণা প্রদান করেন। তিনি জানান, মাসিক সম্মানীর পাশাপাশি ধর্মীয় নেতাদের জন্য উৎসব বোনাসও নিশ্চিত করা হয়েছে।
মুসলিম ধর্মীয় নেতা: পবিত্র ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহায় ১,০০০ টাকা করে বছরে মোট ২,০০০ টাকা বোনাস পাবেন।অন্যান্য ধর্মীয় নেতা: দুর্গাপূজা, বৌদ্ধপূর্ণিমা বা বড়দিনের মতো প্রধান উৎসবগুলোতে এককালীন ২,০০০ টাকা বোনাস প্রদান করা হবে।
তবে উপদেষ্টা স্পষ্ট করেন যে, যেসব প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে বিদেশি অনুদান বা সরকারের অন্যান্য নিয়মিত বড় তহবিল থেকে সরাসরি সাহায্য পায়, তারা আপাতত এই পাইলট প্রকল্পের আওতাভুক্ত হবে না।
সামাজিক প্রেক্ষাপট ও প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিভঙ্গি
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বক্তব্যে ধর্মীয় নেতাদের সমাজের প্রকৃত পথপ্রদর্শক হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, উপাসনালয়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা কেবল ধর্মীয় আচার পালন করেন না, বরং নৈতিক সমাজ গঠনেও বড় ভূমিকা রাখেন। তাদের এই নিঃস্বার্থ সেবার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়ার মাধ্যমেই গড়ে উঠবে প্রকৃত ‘ইনক্লুসিভ’ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই উদ্যোগটি বাংলাদেশে ধর্মীয় সমপ্রীতি ও সহাবস্থানের নতুন এক উদাহরণ তৈরি করবে। ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের দীর্ঘদিনের যে সম্মানীর দাবি ছিল, তার পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মের নেতাদেরও এই তালিকায় যুক্ত করে সরকার সব ধর্মের মানুষের প্রতি সমতা প্রদর্শন করেছে।
একটি মাইলফলক অধ্যায় : মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক অস্থিরতার মাঝে বাংলাদেশের এই অভ্যন্তরীণ পদক্ষেপটি এক ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। ধর্মের নামে ভেদাভেদ নয়, বরং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সকল ধর্মীয় সেবককে সামাজিক সুরক্ষা বলয়ের আওতায় আনা একটি আধুনিক ও প্রগতিশীল রাষ্ট্রের পরিচায়ক। আজ থেকে শুরু হওয়া এই ডিজিটাল সম্মানি প্রদান কার্যক্রমটি আগামীর সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের ভিত মজবুত করবে বলেই বিশেষজ্ঞ মহলের প্রত্যাশা।
‘ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে নৈতিক শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে চাই’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, দেশের প্রতিটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে কেবল উপাসনার স্থান নয়, বরং ধর্মীয়, সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে চায় সরকার।
গতকাল শনিবার রমজানের ২৪তম দিনে ইমাম, খতিব, মুয়াজ্জিন এবং অন্য ধর্মের ধর্মীয় গুরুদের সম্মানি ভাতা প্রদান অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
তারেক রহমান বলেন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি হয়তো আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য দেয়, কিন্তু ধৈর্য, সততা, কৃতজ্ঞতা ও সহনশীলতা ছাড়া একজন ব্যক্তি প্রকৃত মানবিক গুণাবলি সম্পন্ন হয়ে উঠতে পারে না।
তিনি পবিত্র হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, যার আমানতদারি নেই, সে প্রকৃত ইমানদার নয়। যার ওয়াদা ঠিক নেই, তার কোনো ধর্মই নেই।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে সামপ্রদায়িক সমপ্রীতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বলেন, আমরা আজ সব ধর্মের মানুষ এক কাতারে বসেছি। এটিই আমাদের আবহমানকালের ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশ। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ কিংবা খ্রিষ্টান; বিশ্বাসী, অবিশ্বাসী কিংবা সংশয়বাদী আমরা সবাই মিলে ভালো থাকবো।
জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটিতে থাকবেন ইমাম পুরোহিত ও যাজকরা
জেলা পরিষদের আইনশৃঙ্খলা কমিটিতে ইমাম, খতিব বা ধর্মগুরুদের সদস্য হিসেবে রাখার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
গতকাল শনিবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম, পুরোহিত, সেবায়েত, বিহার অধ্যক্ষদের সম্মানি প্রদান কার্যক্রমের উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি এ ঘোষণা দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমাজে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাদের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সম্মান করে এবং জীবনের কঠিন সময়ে যাদের কাছ থেকে ভালো উপদেশের প্রত্যাশা করে। আজকের অনুষ্ঠানে ইসলামের ইমাম-খতিব ও মুয়াজ্জিনের পাশাপাশি হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ধর্মের পুরোহিত, সেবায়েত ও বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দিয়ে বলেন, প্রতিটি জেলার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মিটিংয়ে একজন ইমাম, খতিব বা ধর্মীয় প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এছাড়া ধর্মীয় নেতারা যদি উপাসনার পাশাপাশি অন্য কোনো সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকা্লে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে চান, তবে সরকার তাতে পূর্ণ সহযোগিতা করবে।
ধর্মীয় নেতাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নাগরিকদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করে এমন একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দেশকে দাঁড় করাতে চায় সরকার, যেন ভবিষ্যতে কোনো ফ্যাসিবাদী শক্তি মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নিতে না পারে।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন