নির্বাসন থেকে রাষ্ট্রক্ষমতায়

মো. নেয়ামত উল্যাহ প্রকাশিত: মার্চ ২৫, ২০২৬, ১২:১৪ এএম
নির্বাসন থেকে রাষ্ট্রক্ষমতায়

দীর্ঘ প্রায় সতেরো বছরের নির্বাসন, রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও একাধিক প্রতিকূল পরিস্থিতি পেরিয়ে তারেক রহমানের রাজনৈতিক যাত্রা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এক সময় যিনি দেশীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে সক্রিয় ছিলেন, তিনি পরবর্তীতে প্রবাসজীবনে থেকেও দলের নেতৃত্ব ধরে রাখেন এবং সাংগঠনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সময়ের ব্যবধানে প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগ, কৌশলগত দিকনির্দেশনা এবং দলীয় পুনর্গঠনের মাধ্যমে তিনি বিএনপিকে নতুন করে সংগঠিত করেন, যা ধীরে ধীরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন গতিশীলতা সৃষ্টি করে।

নির্বাসন থেকে দেশে ফিরে আসার পর তারেক রহমান দ্রুতই জাতীয় রাজনীতির মূল স্রোতে ফিরে আসেন এবং দলীয় নেতৃত্বকে আরও সুসংহত করেন। তার প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে জনসমর্থন, রাজনৈতিক সমীকরণ এবং দলীয় কর্মীদের মধ্যে উদ্দীপনা নতুন বাস্তবতা তৈরি করে। পরবর্তীতে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় তার অভিষেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই পরিবর্তন শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা, যেখানে নেতৃত্ব, প্রত্যাশা এবং ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ একসূত্রে গাঁথা।

দীর্ঘ নির্বাসন ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতা : ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির জরুরি অবস্থার সময় ‘ওয়ান-ইলেভেন’ সরকারের অধীনে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। সেই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমান ছিলেন প্রধান রাজনৈতিক লক্ষ্যবস্তুদের একজন। ওই সময়ের পরপরই তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের হয় এবং তিনি গ্রেপ্তার হন। পরবর্তীতে শারীরিক অসুস্থতার কারণে ২০০৮ সালে তিনি চিকিৎসার উদ্দেশ্যে লন্ডনে যান।

এরপর শুরু হয় তার দীর্ঘ প্রবাসজীবন। যদিও তিনি  সরাসরি দেশে উপস্থিত থাকতে পারেননি, তবুও দলীয় রাজনীতির সঙ্গে তার যোগাযোগ কখনো বিচ্ছিন্ন হয়নি। ভার্চুয়াল মাধ্যমে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, দিকনির্দেশনা প্রদান এবং সাংগঠনিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় তার সক্রিয় ভূমিকা ধীরে ধীরে বিএনপিকে নতুন করে সংগঠিত করে।

২০১৮ সালে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাবন্দি হলে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর থেকে তিনি প্রবাস থেকেই দলের নেতৃত্ব দেন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলন ও কর্মসূচি পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

সাংগঠনিক পুনর্গঠন ও আন্দোলনের বিস্তার : প্রবাসে থেকেও তারেক রহমান বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোকে শক্তিশালী করতে উদ্যোগ নেন। প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যবহার করে তিনি কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত দলীয় সংযোগ বজায় রাখেন। এর ফলে দলটি বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক চাপ, দমন-পীড়ন ও সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়। এই সময়ের মধ্যে দেশে ছাত্রআন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করে। বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সমন্বিত আন্দোলনের ফলে একটি বৃহৎ রাজনৈতিক পরিবর্তনের পটভূমি তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে ২০২৪ সালের দিকে আরও তীব্র রূপ নেয়।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তন : ২০২৪ সালে দেশব্যাপী ব্যাপক রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আন্দোলনের ফলে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হয়। বিভিন্ন পক্ষের অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা আন্দোলন এক পর্যায়ে বড় ধরনের রাজনৈতিক রূপ নেয়। এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ক্ষমতাসীন ব্যবস্থার পতন ঘটে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়। এই পরিবর্তনের ফলে দেশে একটি অন্তর্বর্তীকালীন পরিবেশ সৃষ্টি হয়, যেখানে নতুন করে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়া হয়।

দেশে প্রত্যাবর্তন ও জনসমর্থন : দীর্ঘ ৬ হাজারেরও বেশি দিনের প্রবাসজীবন শেষে গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমান দেশে ফিরে আসেন। তার আগমনকে কেন্দ্র করে রাজধানীর কুড়িল এলাকায় ব্যাপক জনসমাগম ঘটে। লাখো মানুষের উপস্থিতি তার প্রতি জনসমর্থনের একটি দৃশ্যমান প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে দেশে ফেরার পরপরই একটি ব্যক্তিগত শোক তাকে ও তার পরিবারকে আঘাত করে। তার মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ৩০ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে তার জীবনে এক আবেগঘন অধ্যায় শুরু হয়। ব্যক্তিগত শোক সত্ত্বেও তিনি দলীয় নেতৃত্ব সুসংহত করার কাজে মনোযোগ দেন। পরবর্তীতে দলের স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, যা তার রাজনৈতিক নেতৃত্বকে আরও দৃঢ় করে।

নির্বাচনে বিএনপির বিজয় : অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করে ৩১ দফা নির্বাচনি ইশতেহার সামনে রেখে। নির্বাচনের ফলাফলে দলটি ২৯৭টি আসনের মধ্যে ২১২টি আসনে জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। তারেক রহমান নিজেও ঢাকা ও বগুড়া- দুটি আসন থেকে বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এই ফলাফল রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, সংগঠনের পুনর্গঠন এবং জনসমর্থনের সম্মিলিত প্রতিফলন।

সরকার গঠন ও নতুন নেতৃত্ব : নির্বাচনের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন তারেক রহমান। এর মধ্য দিয়ে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা ঘটে। ক্ষমতায় আসার পর তিনি দলীয় কাঠামো থেকে বেরিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় মনোনিবেশ করেন। তার নেতৃত্বে সরকার দ্রুত কিছু নীতিগত ও প্রশাসনিক উদ্যোগ গ্রহণ করে, যা জনমনে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত : নতুন সরকারের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তনের প্রচেষ্টা। নির্বাচনে জয়লাভের পর তিনি বিজয় মিছিল বা বড় ধরনের উদযাপন থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন এবং ধর্মীয় ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে শুকরিয়া আদায়ের ওপর গুরুত্ব দেন। এছাড়া রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত এবং সংলাপের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করা হয়, যা রাজনৈতিক সহনশীলতার একটি নতুন দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

জনবান্ধব কর্মসূচি ও প্রশাসনিক উদ্যোগ : সরকার গঠনের পরপরই বেশ কিছু জনবান্ধব কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে ফ্যামিলি কার্ড চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়। পাশাপাশি প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতিশীলতা আনার জন্য সরকারি দপ্তরে শৃঙ্খলা ও কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও দাপ্তরিক কার্যক্রম সচল রাখার উদ্যোগ প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। কৃষি খাতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে ঋণ সুবিধা চালুর পরিকল্পনাও সামনে আনা হয়।

অর্থনীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনা : নতুন সরকারের সামনে অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার। ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, বিনিয়োগে আস্থার সংকট এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের ভারসাম্য রক্ষা- এসব বিষয়কে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। সরকার প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়ন পরিকল্পনার ওপর জোর দিচ্ছে, যেখানে তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধি, ডিজিটাল অর্থনীতি সমপ্রসারণ এবং কৃষি খাতের আধুনিকায়ন অন্তর্ভুক্ত।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কৌশলগত ভারসাম্য : আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা বর্তমান সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।

সামনে চ্যালেঞ্জ : যদিও নতুন সরকার উল্লেখযোগ্য সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে, তবুও সামনে রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলা করা- এসব বিষয় সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা। বিশেষজ্ঞদের মতে, সফলতা নির্ভর করবে নীতিগত ধারাবাহিকতা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং রাজনৈতিক সহনশীলতার ওপর।

বিশ্লেষকদের মতামত : রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তারেক রহমানের দীর্ঘ নির্বাসন থেকে ফিরে এসে নেতৃত্ব গ্রহণ এবং নির্বাচনি বিজয় দেশের রাজনীতিতে একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। তার নেতৃত্বে বিএনপির পুনর্গঠন এবং ক্ষমতায় আসা রাজনৈতিক ভারসাম্যে পরিবর্তন এনেছে। তবে এই অবস্থান ধরে রাখতে হলে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং কার্যকর শাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি বলে তারা মত দেন।

সর্বোপরি, তারেক রহমানের রাজনৈতিক যাত্রা এক দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প, যেখানে নির্বাসন, প্রতিকূলতা, দলীয় পুনর্গঠন এবং অবশেষে ক্ষমতার শিখরে পৌঁছানো- সবই একসূত্রে গাঁথা। তার বর্তমান অবস্থান শুধু একটি রাজনৈতিক অর্জন নয়, বরং দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আগামী দিনগুলোতে তার নেতৃত্ব কতটা স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক সহাবস্থান নিশ্চিত করতে পারে সেই দিকেই এখন নজর দেশের জনগণ ও আন্তর্জাতিক মহলের।