জ্বালানি সংকটে লোডশেডিং ভীতি

মো. নেয়ামত উল্যাহ প্রকাশিত: এপ্রিল ৮, ২০২৬, ১২:০৩ এএম
জ্বালানি সংকটে লোডশেডিং ভীতি

দেশের বিদ্যুৎ খাত এখন এক বৈদ্যুতিক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। জ্বালানি ঘাটতি এবং সরকারি ও বেসরকারি পাওনার বকেয়ার চাপের কারণে গরমের মৌসুমে লোডশেডিংয়ের সম্ভাবনা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, জুলাই-আগস্টে তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দৈনিক চাহিদা বৃদ্ধি পাবে, যা বিদ্যুৎ উৎপাদনে চাপ সৃষ্টি করবে। বর্তমান সময়ে দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পর্যাপ্ত জ্বালানি না পাওয়ায় কয়েক হাজার মেগাওয়াট ঘাটতি তৈরি হতে পারে, যা শহর ও গ্রামে ইলেকট্রিক সাপ্লাইকে ব্যাহত করতে পারে।

বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ বলেছে, বকেয়া পাওনা এবং জ্বালানি সংকট সমাধান না হলে লোডশেডিং একেবারে অবশ্যম্ভাবী। গ্রাহকদের সচেতন করতে শুরু হয়েছে সতর্কবার্তা, বিশেষ করে শিল্প ও উৎপাদন ক্ষেত্রে যাতে উৎপাদন ও কার্যক্রম ব্যাহত না হয়। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দেশের বিদ্যুৎ খাতের স্থিতিশীলতা ও পরিকল্পিত লোডশেডিং ব্যবস্থা ছাড়া গরমের তাপে মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও শিল্প উৎপাদন দু-ই বিপর্যস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধি, বকেয়া সমাধান এবং অনির্দিষ্ট লোডশেডিং এড়াতে পরিকল্পিত পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে, যাতে গরমের প্রভাব সর্বাধিক কমানো যায়। সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্থাপিত সক্ষমতা ২৮ হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি। কিন্তু বাস্তবে এই সক্ষমতার বড় অংশই জ্বালানির অভাবে পুরোপুরি ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যেব্যবধান দিন দিন বাড়ছে।

চাহিদা বাড়ছে, জ্বালানির অভাবে উৎপাদন হচ্ছে না : বাংলাদেশে বিদ্যুতের চাহিদা এখন অনেকটাই আবহাওয়া নির্ভর হয়ে পড়েছে। শীত বা মৃদু আবহাওয়ায় বিদ্যুতের চাহিদা তুলনামূলক কম থাকলেও গ্রীষ্মে তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চাহিদা দ্রুত বেড়ে যায়।

সরকারি পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি গরমে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যেতে পারে। অথচ দেশে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১৬ হাজার ৭৯৪ মেগাওয়াট। এই ঘাটতি পূরণ করতে হলে সব বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো প্রয়োজন, যা জ্বালানির অভাবে সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে গ্যাস সংকট, আমদানিকৃত কয়লার সরবরাহে অনিশ্চয়তা ও তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উচ্চ ব্যয়। এই তিনটি বড় কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদনে বাধা সৃষ্টি করছে।

জ্বালানি সংকট, সমস্যার মূল কেন্দ্র : বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছে না। অন্যদিকে, কয়লা ও তেল আমদানির ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রা সংকট এবং বকেয়া বিল বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ালেই হবে না, সেই সক্ষমতা কাজে লাগানোর জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

বৈশ্বিক প্রভাব, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা নতুন ঝুঁকি : বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিও বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে নতুন করে চাপ সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে ইরান-কেন্দ্রিক উত্তেজনা এবং সম্ভাব্য সংঘাতের প্রভাব আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে- তেলের দাম বৃদ্ধি পেতে পারে, জ্বালানি আমদানি ব্যয় বেড়ে যেতে পারে, সরবরাহ চেইন ব্যাহত হতে পারে। ফলে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এটি বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইতোমধ্যে শুরু লোডশেডিং : চলতি মৌসুমে লোডশেডিংয়ের প্রাথমিক লক্ষণ ইতোমধ্যেই দেখা গেছে। গত ৪ এপ্রিল রাতে প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতি তৈরি হয়, যা মৌসুমের প্রথম বড় লোডশেডিং হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, গরম পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই বিদ্যুৎ খাত চাপের মুখে পড়েছে।

কতটা হতে পারে লোডশেডিং

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলেছেন, লোডশেডিংয়ের মাত্রা অনেকটাই নির্ভর করবে আবহাওয়ার ওপর। তার মতে- তাপমাত্রা তুলনামূলক কম থাকলে ২-৩ হাজার মেগাওয়াট ঘাটতি ও

তীব্র গরম হলে ৪ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হতে পারে। তিনি আরও বলেন, বিদ্যুৎ গ্রিড স্থিতিশীল রাখতে অনেকগুলো বিষয় একসঙ্গে কাজ করে। তাই শুধু উৎপাদন নয়, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।

বকেয়া বিল, বিদ্যুৎ খাতের নীরব সংকট : বিদ্যুৎ খাতের আরেকটি বড় সমস্যা হলো বিপুল পরিমাণ বকেয়া বিল। বর্তমানে এই খাতে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকার বকেয়া জমে আছে।এর মধ্যে- কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাওনা প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা, বেসরকারি তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর পাওনা প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। এই বকেয়া পরিশোধে দেরি হওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীরা নতুন করে জ্বালানি আমদানিতে আগ্রহ হারাচ্ছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদকদের সতর্কবার্তা : বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিপ্পা) পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংগঠনটির সভাপতি কে এম রেজাউল হাসনাত বলেন, গত সাত মাসে যে তেল আমদানি করা হয়েছে, তার বিল এখনো পরিশোধ করা হয়নি। এই অবস্থায় নতুন করে এলসি (ঋণপত্র) খোলা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি সতর্ক করে বলেন, দ্রুত বকেয়া পরিশোধ না করা হলে এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে বড় ধরনের বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিতে পারে।

সরকারের অবস্থান- দাম না বাড়িয়ে সমাধানের চেষ্টা : পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়ার কথা জানিয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, এত বড় আর্থিক চাপ থাকা সত্ত্বেও সরকার বিদ্যুতের দাম বাড়াতে চায় না। তার মতে, এমন একটি সমাধান খোঁজা হচ্ছে যাতে- সাধারণ জনগণের ওপর বাড়তি চাপ না পড়ে, বিদ্যুৎ উৎপাদকরাও তাদের পাওনা পায়। এটি একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতিগত চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ের আহ্বান : বর্তমান পরিস্থিতিতে নীতিনির্ধারকরা সাধারণ মানুষকেও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানো গেলে সামগ্রিক চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব। ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ ব্যবহারে সরকার একটি বিধিনিষেধও জারি করেছে। বিশেষ করে- অপ্রয়োজনীয় আলো ও বৈদ্যুতিক যন্ত্র বন্ধ রাখা, এসি ব্যবহারে সংযম, শিল্প খাতে দক্ষ বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা। এসব পদক্ষেপ পরিস্থিতি সামাল দিতে সহায়ক হতে পারে।

বাস্তবতা বনাম প্রত্যাশা : বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হলেও বাস্তবতায় তা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। একদিকে জনগণের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের প্রত্যাশা, অন্যদিকে জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা এই দ্বন্দ্বই বর্তমান সংকটের মূল।

সর্বোপরি, বিদ্যুৎ ঘাটতি এবং বকেয়ার চাপ দেশের বিদ্যুৎ খাতকে গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। গরমের মৌসুমে চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় লোডশেডিংয়ের সম্ভাবনা প্রবল, যা নাগরিক জীবনের পাশাপাশি শিল্প ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমেও প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও সরকার ও বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ সংকট মোকাবিলায় পরিকল্পিত পদক্ষেপ নিচ্ছে তবুও জনসচেতনতা, বিদ্যুৎ সাশ্রয় এবং স্থিতিশীল ব্যবস্থাপনা ছাড়া পুরোপুরি অপ্রত্যাশিত লোডশেডিং এড়ানো সম্ভব নয়। তাই নাগরিক ও শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে, যাতে গরমে বিদ্যুৎ ঘাটতির প্রভাব সর্বনিম্ন রাখা যায়।