গডফাদারের হাতে জিম্মি জনজীবন

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: এপ্রিল ২০, ২০২৬, ১২:৫২ এএম
গডফাদারের হাতে জিম্মি জনজীবন

দেশের সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের কাছে এখন মূর্তিমান আতঙ্কের নাম ‘বেপরোয়া চাঁদাবাজি’। রাজধানীর ফুটপাত থেকে শুরু করে বড় শিল্পকারখানা, গণপরিবহন, লঞ্চঘাট এমনকি সাধারণ মানুষের নির্মাণাধীন ব্যক্তিগত ভবন- সবখানেই থাবা বসিয়েছে চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট। সমপ্রতি র্যাবের তৈরি করা এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সারাদেশে অন্তত ৬৬০ জন প্রভাবশালী ‘চাঁদাবাজ গডফাদার’ সক্রিয় রয়েছে। তবে তালিকা চূড়ান্ত থাকলেও রহস্যজনক কারণে তাদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বড় কোনো অভিযান চোখে পড়ছে না, যা সাধারণ মানুষের মনে তীব্র হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

র্যাবের গোয়েন্দা প্রতিবেদনে চাঞ্চল্যকর তথ্য : র্যাব সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটির ১৫টি ব্যাটালিয়নের মাধ্যমে সারা দেশে চাঁদাবাজ গডফাদারদের তালিকা হালনাগাদ করা হয়েছে। এই তালিকায় থাকা ৬৬০ জনের প্রত্যেকের রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের ক্ষেত্র স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। শীর্ষে নারায়ণগঞ্জ: তালিকায় সবচেয়ে বেশি চাঁদাবাজ গডফাদার শনাক্ত হয়েছে নারায়ণগঞ্জে (র্যাব-১১ এর অধীনে), যার সংখ্যা ১১০ জন। অন্যান্য অঞ্চল: র্যাব-১২-তে ৬৩ জন, র্যাব-১-এ ৬১ জন, র্যাব-৬-এ ৫৯ জন, এবং র্যাব-৭-এ ৫২ জন গডফাদারের নাম উঠে এসেছে।

রাজনৈতিক ঢাল ও আইনি জটিলতা : তালিকায় নাম থাকলেও কেন গ্রেপ্তার হচ্ছে না— এমন প্রশ্নের উত্তরে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এমজেডএম ইন্তেখাব চৌধুরী জানান, অনেক ক্ষেত্রে তথ্যপ্রমাণ জোগাড় করা এবং সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকায় আইনি জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়। তবে অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, এই ‘ধীরে চলো’ নীতি মানুষকে হতাশ করছে। তার মতে, অপরাধীদের রাজনৈতিক কানেকশনই তাদের প্রধান সুরক্ষা কবজ। দখলবাজ ও চাঁদাবাজদের নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে।

হাতবদল হয়েছে সিন্ডিকেট, বদলায়নি ভোগান্তি : দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চাঁদাবাজির ধরন ও মুখ বদলেছে কিন্তু বঞ্চনা কমেনি। করা তালিকা বর্তমান সরকারের হাতে এলেও তা বাস্তবায়নে গতি নেই। রাজধানীসহ সারাদেশে বাসস্ট্যান্ড ও মহাসড়কে টোলের নামে অভিনব কায়দায় চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। সিকেডি হাসপাতাল কাণ্ড: সমপ্রতি ঢাকার শ্যামলীর সিকেডি ইউরোলজি হাসপাতালে যুবদল নেতার পরিচয়ে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবির ঘটনায় ৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নোয়াখালীর নৃশংসতা: নোয়াখালীতে জমি নির্মাণকালে চাঁদা না পেয়ে বৃদ্ধ আবদুল হাইকে পিটিয়ে খালে ফেলে হত্যার ঘটনায় স্থানীয় এক বহিষ্কৃত যুবদল নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

পুলিশের কঠোর নির্দেশ ও মাঠপর্যায়ের চিত্র : চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে মাঠপর্যায়ে কঠোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তবে পুলিশের অতিরিক্ত আইজি (অপরাধ ও অপস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম জানান, তারা ঢাকঢোল পিটিয়ে নয় বরং অত্যন্ত ‘গোপনীয়’ ও ‘সমন্বিত’ তালিকার ভিত্তিতে কাজ করছেন। তিনি দাবি করেন, যখনই কোথাও চাঁদাবাজির অভিযোগ আসছে, পুলিশ অ্যাকশনে যাচ্ছে। অপরাধী যে দলেরই হোক, কোনো ছাড় দেয়া হবে না।

ভুক্তভোগীদের নিরবতা ও ভয় : গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, অনেক চাঁদাবাজের নাম-পরিচয় জানা থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা নেই। ভুক্তভোগীরা ভয়ে মুখ খুলছেন না। মামলা করলেও প্রভাবশালীরা জামিনে বেরিয়ে এসে ফের হুমকি দিচ্ছে- এমন ভীতি কাজ করছে জনমনে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিন চাঁদাবাজির ভিডিও ভাইরাল হলেও আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের সাহস বাড়িয়ে দিচ্ছে।

সর্বোপরি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির এই দুঃসময়ে চাঁদাবাজির উপদ্রব ব্যবসায়ীদের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে। সাধারণ মানুষের দাবি, কেবল কাগজে-কলমে তালিকা সীমাবদ্ধ না রেখে দ্রুত এই ৬৬০ জন গডফাদারকে আইনের আওতায় আনতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এই সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।