দেশের বিদ্যুৎ খাতের অন্যতম বৃহৎ সংস্থা ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) একটি বিশাল উন্নয়ন প্রকল্প এখন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আতশিকাচের নিচে। সরকারের সঙ্গে সরকারের (জিটুজি) চুক্তির আওতায় বাস্তবায়নাধীন প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পে ভয়াবহ আর্থিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অর্থ পাচারের অভিযোগ উঠেছে। এই দুর্নীতির গভীরতা অনুসন্ধানে এবার কঠোর অবস্থান নিয়েছে দুদক।
দুদকের জরুরি তলব ও আইনি পদক্ষেপ : গতকাল বৃহস্পতিবার দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান কার্যালয় থেকে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের পরিচালককে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়েছে। দুদকের সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ জাফর সাদেক শিবলীর সই করা ওই চিঠিতে প্রকল্পের যাবতীয় নথিপত্র তলব করা হয়েছে।
কমিশন সূত্রে জানা গেছে, আগামী ৫ মে’র মধ্যে প্রয়োজনীয় সব তথ্য ও দলিলপত্র দুদক কার্যালয়ে জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এই অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকল্পের শুরু থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত হওয়া প্রতিটি ব্যয়ের হিসাব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা হবে।
যেসব নথিপত্র তলব করা হয়েছে : তদন্তের স্বার্থে দুদক মোট সাত ধরনের সুনির্দিষ্ট নথিপত্র তলব করেছে। এর মধ্যে প্রধান বিষয়গুলো হলো- ঠিকাদারের সঙ্গে মূল চুক্তিপত্র: বিদেশি ও দেশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত প্রাথমিক ও সংশোধিত চুক্তিনামা। ক্রয় সংক্রান্ত নথি: প্রকল্পের অধীনে মালামাল ক্রয়, টেন্ডার প্রক্রিয়া এবং কেনাকাটার স্বচ্ছতা যাচাইয়ের কাগজপত্র।
কাজের অগ্রগতি প্রতিবেদন: এ পর্যন্ত কতটুকু কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং তার বিপরীতে কত টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া: কোন প্রক্রিয়ায় ঠিকাদার নির্বাচন করা হয়েছিল এবং সেখানে কোনো যোগসাজশ ছিল কি না। আর্থিক লেনদেনের খতিয়ান: ব্যাংক স্টেটমেন্ট এবং পেমেন্ট ভাউচার। দুর্নীতির ভয়াবহ অভিযোগ: শত কোটি টাকার লোপাট।
দুদকের প্রাথমিক অভিযোগে বলা হয়েছে, ২১ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল বাজেটের প্রকল্পে নজিরবিহীন লুটপাট চালানো হয়েছে। অভিযোগের প্রধান দিকগুলো হলো—
ঠিকাদার নিয়োগে অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্য : অভিযোগ রয়েছে, ডিপিডিসির প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের একটি সিন্ডিকেট মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে বিশেষ কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিয়েছে। এক্ষেত্রে যোগ্যতার চেয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং আর্থিক লেনদেনকে প্রধান্য দেয়া হয়েছে বলে দুদকের কাছে তথ্য রয়েছে।
নামমাত্র কাজ করে অর্থ আত্মসাৎ : প্রকল্পের অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, কাগজে-কলমে কাজ সম্পন্ন দেখানো হলেও বাস্তবে তার কোনো অস্তিত্ব নেই। কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ভুয়া ভাউচার তৈরি করে শত শত কোটি টাকা প্রকল্প তহবিল থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে।
অর্থ পাচারের অভিযোগ : যেহেতু এটি একটি জিটুজি প্রকল্প এবং এখানে বিদেশি মুদ্রার লেনদেন জড়িত, তাই দুদকের সন্দেহের তালিকায় রয়েছে অর্থ পাচারের বিষয়টিও। নামমাত্র মালামাল আমদানি দেখিয়ে বা ওভার ইনভয়েসিংয়ের (অতিরিক্ত মূল্য দেখানো) মাধ্যমে বিদেশের ব্যাংকগুলোতে টাকা পাচার করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে কমিশন।
নিশানায় ডিপিডিসির শীর্ষ কর্মকর্তা : এই বিশাল দুর্নীতির অনুসন্ধানের পাশাপাশি ডিপিডিসির নির্বাহী পরিচালক মোরশেদ আলম খানের বিরুদ্ধেও আলাদাভাবে তদন্ত শুরু করেছে দুদক।
তার বিরুদ্ধে মূল অভিযোগগুলো হলো- ক্ষমতার অপব্যবহার: পদাধিকার বলে প্রকল্পের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অনৈতিক প্রভাব বিস্তার। অবৈধ সম্পদ অর্জন: কর্মজীবনে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জন করেছেন বলে দুদকের কাছে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে। সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ: অভিযোগ আছে, মোরশেদ আলম খানের প্রশ্রয়েই ডিপিডিসিতে একটি শক্তিশালী দুর্নীতিবাজ চক্র গড়ে উঠেছে, যারা মেগা প্রকল্পগুলোকে ব্যক্তিগত আয়ের উৎস হিসেবে ব্যবহার করছে।
প্রকল্পের গুরুত্ব ও বর্তমান সংকট : ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এই ২১ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পটি হাতে নেয়া হয়েছিল। জিটুজি ভিত্তিতে নেয়া এই প্রকল্পের ব্যর্থতা বা এখানে বড় ধরনের দুর্নীতি কেবল আর্থিক ক্ষতিই নয়, বরং আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ খাতের মতো স্পর্শকাতর জায়গায় যখন হাজার হাজার কোটি টাকার লুটপাট হয়, তখন তার চূড়ান্ত বোঝা গিয়ে পড়ে সাধারণ গ্রাহকের কাঁধেই। বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি এবং সিস্টেম লসের অন্যতম কারণ হিসেবে এই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিকে দায়ী করা হচ্ছে।
আগামী দিনে কী ঘটবে : ৫ মে নথিপত্র জমা দেয়ার পর দুদক একটি বিশেষ টিম গঠন করে ফাইলগুলো যাচাই করবে। যদি প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যায়, তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা (এফআইআর) দায়ের করা হবে। দুদক স্পষ্ট জানিয়েছে, রাষ্ট্রের অর্থ তছরুপের সঙ্গে জড়িত কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না, সে তিনি যত প্রভাবশালীই হোন না কেন।
এ বিষয়ে ডিপিডিসির সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। সৎ কর্মকর্তাদের আশা, এই তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের মুখোশ উন্মোচিত হবে এবং মেগা প্রকল্পের অর্থ জনগণের কল্যাণে সঠিকভাবে ব্যয় হবে। ২১ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্প নিয়ে দুদকের এই সক্রিয়তা দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতির একটি বড় পরীক্ষা। নথিপত্র যাচাইয়ের পর থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে কি না, এখন সেটাই দেখার বিষয়। সাধারণ মানুষ ও বিদ্যুৎ খাতের অংশীজনরা এখন ৫ মে’র দিকে তাকিয়ে আছেন।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন