জলাতঙ্ক একটি প্রাচীন ও প্রাণঘাতী রোগ, যা একবার লক্ষণ প্রকাশ পেলে মৃত্যু প্রায় নিশ্চিত। বাংলাদেশে সামপ্রতিক বছরগুলোতে এই মরণব্যাধির ঝুঁকি আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যার মূলে রয়েছে জনসচেতনতার চরম অভাব এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা। এক সময় কেবল কুকুরের কামড়কে জলাতঙ্কের প্রধান কারণ মনে করা হলেও, বর্তমানে বিড়ালের আঁচড় বা কামড় থেকে সংক্রমণের হার উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে শৌখিন পোষা প্রাণীর মালিকদের মধ্যে ভ্যাকসিন দেয়ার বিষয়ে অনীহা এবং প্রান্তিক পর্যায়ে বেওয়ারিশ কুকুরের টিকাদান কর্মসূচি স্থবির হয়ে পড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের বর্তমান চিত্র বলছে, প্রতিদিন শত শত মানুষ কামড় বা আঁচড় নিয়ে হাসপাতালে ভিড় করছেন, যাদের বড় একটি অংশই শিশু। অথচ সঠিক সময়ে সামান্য সাবান-পানি দিয়ে ক্ষতস্থান ধোয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শে সঠিক ডোজের ভ্যাকসিন গ্রহণ করলে এই মৃত্যু শতভাগ ঠেকানো সম্ভব। একদিকে টিকার সরকারি ভা্লারে টান, অন্যদিকে ঝাড়ফুঁক ও কবিরাজি চিকিৎসার মতো কুসংস্কারের ওপর মানুষের নির্ভরতা্তএই দুইয়ের যাঁতাকলে পড়ে জলাতঙ্ক আজ একটি গভীর জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে। সময় এসেছে পোষা প্রাণীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সাধারণ মানুষের মাঝে সচেতনতা ছড়িয়ে দেয়ার, অন্যথায় এই বিষবাষ্প ভবিষ্যতে আরও অনেক প্রাণের অকাল প্রয়াণের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
কুকুরের চেয়ে বিড়াল এখন বেশি ভয়ংকর : দীর্ঘদিন ধরে ধারণা ছিল জলাতঙ্ক মানেই কুকুরের কামড়। কিন্তু বর্তমান পরিসংখ্যান এই ধারণা পাল্টে দিচ্ছে। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী (অ্যান্টি-রেবিস) ভ্যাকসিন নিতে আসা রোগীদের প্রায় ৬০ শতাংশই বিড়ালের কামড় বা আঁচড়ে জখম। অথচ কয়েক বছর আগেও এই হার ছিল মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ।
উদ্বেগজনক তথ্যচিত্র- ২০২৩ সাল: চিকিৎসা নিয়েছেন ৯৪,৩৮০ জন; মৃত্যু ৪২ জন। ২০২৪ সাল: চিকিৎসা নিয়েছেন ১,২২,২৬৩ জন; মৃত্যু ৫৮ জন। ২০২৫ সাল: চিকিৎসা নিয়েছেন ১,৪৬,২৪৩ জন; মৃত্যু ৫৯ জন। ২০২৬ (১৭ মার্চ পর্যন্ত): সেবা নিয়েছেন ৩৬,৭৫১ জন; মৃত্যু ১৯ জন।
বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ৫০০ থেকে ৬০০ নতুন রোগী হাসপাতালে আসছেন। পুরাতন রোগীসহ এই সংখ্যা দৈনিক প্রায় ১৫০০ ছাড়িয়ে যাচ্ছে। চিকিৎসকরা বলছেন, বিড়ালের আঁচড়কে মানুষ শুরুতে গুরুত্ব দেয় না, যা শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
শখের বিড়াল যখন নীরব ঘাতক : হাসপাতালে আসা রোগীদের সঙ্গে কথা বলে এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। অনেকেই শখ করে বিড়াল পুষছেন, কিন্তু তাদের টিকা দেয়ার বিষয়ে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। অঞ্জেলা সরকার নামে এক বিড়াল মালিক জানান, তিনি চার বছর ধরে বিড়াল পালছেন কিন্তু কখনো ভ্যাকসিন দেননি। তার ধারণা, ‘বিড়াল তো ঘরের বাইরে যায় না, তাই টিকার দরকার নেই।’ এই ভুল ধারণাই মূলত বিপদ ডেকে আনছে। চিকিৎসকদের মতে, একবার জলাতঙ্কের লক্ষণ (যেমন: পানিভীতি বা হাইড্রোফোবিয়া) প্রকাশ পেলে রোগীকে বাঁচানো প্রায় অসম্ভব। সাড়ে তিন বছরের শিশু আব্দুর রহমানের মর্মান্তিক ঘটনাটি এর প্রমাণ। বিড়ালের আঁচড়ের পর ঠিকমতো চিকিৎসা না পাওয়ায় শিশুটি এখন অবচেতন অবস্থায় মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। স্থবির টিকাদান কর্মসূচি ও সরকারি সমন্বয়হীনতা : ২০১০ সাল থেকে দেশে জলাতঙ্ক নির্মূলে একটি সমন্বিত কর্মসূচি শুরু হয়েছিল। এর আওতায় ২৯ লাখ কুকুরকে টিকা দেওয়া হলেও ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এই কার্যক্রম কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছে। সংকটের প্রধান কারণগুলো— ভ্যাকসিন শূন্য ভাণ্ডার: সারা দেশে ৪১৬টি কেন্দ্রে টিকা দেয়া হলেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় ভাণ্ডারে বর্তমানে কোনো টিকা নেই। মে মাসের আগে নতুন সরবরাহ আসার সম্ভাবনাও ক্ষীণ। জন্মনিয়ন্ত্রণ বন্ধ: কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে কোনো কার্যকর কার্যক্রম নেই। ফলে রাজপথে বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। বিভাগীয় বিরোধ: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এবং সিটি কর্পোরেশনের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট। ডিএনসিসি ও ডিএসসিসির কাছে নেই কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য বা ডাটাবেজ।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, কোনো এলাকার অন্তত ৭০ শতাংশ কুকুরকে টানা তিন বছর টিকার আওতায় আনলে সেই অঞ্চলকে জলাতঙ্কমুক্ত করা সম্ভব। কিন্তু বাংলাদেশে বর্তমানে কুকুরের টিকাদান কার্যক্রম শূন্যের কোঠায়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক মো. হালিমুর রশিদ জানিয়েছেন, নতুন পরিকল্পনা করা হচ্ছে ঠিকই, তবে সেখানে মানুষের টিকার ওপর জোর দেয়া হচ্ছে; কুকুরের টিকাদান বা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আপাতত অবহেলিতই থাকছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা একে ‘ভুল কৌশল’ বলে মনে করছেন। তাদের মতে, উৎসমুখ অর্থাৎ প্রাণীর জলাতঙ্ক রোধ না করলে মানুষকে টিকা দিয়ে এই রোগ নির্মূল করা সম্ভব নয়।
কামড় বা আঁচড়ের পর করণীয় : জলাতঙ্ক শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য যদি সঠিক সময়ে ব্যবস্থা নেয়া হয়। চিকিৎসকদের পরামর্শ— ধোয়া: কামড় বা আঁচড়ের সাথে সাথে ক্ষারযুক্ত সাবান ও প্রবাহিত পানি দিয়ে অন্তত ১৫ মিনিট ক্ষতস্থান ধুতে হবে। এতে ভাইরাসের লোড অনেকটা কমে যায়। দ্রুত টিকা: কোনো অবস্থাতেই কবিরাজ বা ঝাড়ফুঁকের ওপর নির্ভর করা যাবে না। দ্রুত নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শে ভ্যাকসিন নিতে হবে। পোষা প্রাণীর সুরক্ষা: নিজের পোষা বিড়াল বা কুকুরকে নিয়ম অনুযায়ী নিয়মিত জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা দিতে হবে।
পরিশেষে বলা যায় জলাতঙ্ক কেবল একটি রোগ নয়, বরং এটি আমাদের সম্মিলিত অসচেতনতার এক করুণ প্রতিফলন। বিড়ালের সামান্য আঁচড় কিংবা কুকুরের কামড়কে তুচ্ছ মনে করার যে সংস্কৃতি সমাজে প্রচলিত, তা অনেক ক্ষেত্রেই জীবননাশের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অথচ সঠিক সময়ে ভ্যাকসিন গ্রহণ এবং পোষা প্রাণীর নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করার মাধ্যমে এই মৃত্যু পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব।
সরকারি পর্যায়ে টিকার সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। সাধারণ মানুষ যখন কুসংস্কার ঝেড়ে ফেলে আধুনিক চিকিৎসার ওপর আস্থা রাখবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাদের টিকাদান কর্মসূচি পুনরায় গতিশীল করবে, তখনই কেবল দেশ থেকে জলাতঙ্কের এই নীরব ঘাতকের ছায়া মুছে ফেলা সম্ভব হবে।
অন্যথায়, একটি সামান্য অসতর্কতা অকালে ঝরিয়ে দিতে পারে হাজারো সম্ভাবনাময় প্রাণ।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন