ঢাকার চিরচেনা যানজট আর গণপরিবহনের বিশৃঙ্খলা দূর করতে দীর্ঘমেয়াদি ও আধুনিক এক কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বর্তমান সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিশেষ নির্দেশনায় তৈরি এই পরিকল্পনায় কেবল মেট্রোরেল নয়, বরং মনোরেল, নারীদের জন্য বিশেষ বাস সার্ভিস ‘নারীবাস’ এবং পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক বাস ও সাইকেল সেবা চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় আগামী ১৮০ দিনের জন্য যে বিশেষ রোডম্যাপ তৈরি করেছে, তাতে যাত্রীসেবার মানোন্নয়ন ও পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেয়েছে। নারীদের জন্য পিংক বাস: নিরাপদ যাতায়াতের নতুন দিগন্ত নারীদের জন্য নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াত নিশ্চিত করতে ঢাকার রাজপথে নামছে ‘নারী যাত্রী বাস’ বা ‘পিংক বাস’।
প্রাথমিক পর্যায়ে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ আটটি রুটে ৯টি বিশেষ বাস দিয়ে এই সেবা শুরু হবে। বিশেষত্ব: এই বাসগুলোর চালক এবং সহকারী উভয়ই হবেন নারী। লক্ষ্য: গণপরিবহনে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো। সরকার ইতোমধ্যে নারী চালকদের বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে।
২. ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় আসছে ‘মনোরেল’ ঢাকার সব এলাকায় বিশাল অবকাঠামো তৈরি করে মেট্রোরেল নেয়া সম্ভব নয়, বিশেষ করে পুরান ঢাকা বা বাসাবো-গোড়ানের মতো সরু ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায়। এই সংকটের সমাধান হিসেবে সরকার মনোরেল চালুর পরিকল্পনা করছে। মনোরেল কী: এটি একটিমাত্র রেল বা বিমের ওপর দিয়ে চলাচলকারী ট্রেন। মেট্রোরেলের মতো এখানে ডাবল লাইনের প্রয়োজন হয় না এবং এর খুঁটিগুলো অনেক চিকন হয়। সুবিধা: এটি নির্মাণে খরচ মেট্রোরেলের চেয়ে অনেক কম এবং খুব অল জায়গায় এটি স্থাপন করা সম্ভব। বুয়েট বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সামছুল হকের মতে, প্রধান সড়কের বাইরে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এই ব্যবস্থা অত্যন্ত কার্যকর হবে।
ইলেকট্রিক বাস ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ : জ্বালানি নির্ভরতা কমাতে এবং বায়ুদূষণ রোধে সরকার বিদ্যুৎ-চালিত বাসের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। শুল্ক ছাড়: শিক্ষার্থীদের জন্য ইলেকট্রিক স্কুল বাস আমদানিতে শুল্ক শূন্য শতাংশ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সাধারণ গণপরিবহন হিসেবে বৈদ্যুতিক বাস আনলেও বড় ধরনের শুল্ক ছাড় পাওয়া যাবে। সাইকেল রাইড শেয়ারিং: উত্তরা মেট্রোরেল স্টেশনকে কেন্দ্র করে ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সাইকেল লেন তৈরি করা হবে। সেখানে ১৫০টি বাইসাইকেল ও ৬টি স্ট্যান্ড নির্মাণের মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে রাইড শেয়ারিং সেবা চালু হবে।
বাস রুট র্যাশনালাইজেশন ও ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থা : ঢাকার বিশৃঙ্খল বাস চলাচল বন্ধ করতে সব রুটকে অল্প কয়েকটি কোম্পানির অধীনে নিয়ে আসার কাজ শুরু হয়েছে। ১৮০ দিনের পরিকল্পনায় এ বিষয়ে নতুন আইন প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে। রুট পরিবর্তন: ২১ ও ২৬ নম্বর রুটে নতুন আধুনিক বাস নামানো হবে। সুবিধা: একই রঙের বাস থাকবে, যত্রতত্র থামবে না এবং দরজায় থাকবে অটোমেটিক সেন্সর। এতে বাসে ওঠার অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ হবে।
যাত্রী ও শ্রমিকদের জন্য অন্যান্য কল্যাণমূলক পদক্ষেপ : সরকারের ১৮০ দিনের এই কর্মপরিকল্পনায় যাতায়াতের সুবিধার পাশাপাশি ভাড়ার বিষয়েও মানবিক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বিশেষ ছাড়: শিক্ষার্থী, প্রতিবন্ধী এবং ৬০ বছরের ঊর্ধ্বের নাগরিকদের জন্য মেট্রোরেল ও দূরপাল্লার বাসে বিশেষ ভাড়া ছাড়ের নীতিমালা করা হচ্ছে। শ্রমিক কল্যাণ: পরিবহন শ্রমিকদের জন্য নির্দিষ্ট ইউনিফর্ম (শীত ও গ্রীষ্মকালীন) সরবরাহ করা হবে এবং আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে ৫ হাজার কন্ডাক্টর ও সুপারভাইজারকে পেশাদার লাইসেন্স দেয়া হবে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত : পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সামছুল হক মনে করেন, শুধু বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয় বরং মেট্রোরেল, মনোরেল এবং বাসের মধ্যে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। সর্বোপরি, বর্তমান সরকারের এই ১৮০ দিনের পরিকল্পনা সঠিক বাস্তবায়ন হলে আগামী এক বছরের মধ্যে ঢাকার যাতায়াত ব্যবস্থায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন