রপ্তানি বাণিজ্যে তৈরি পোশাক খাতের ঠিক পরই অবস্থান চামড়া শিল্পের। বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি এই খাতের কাঁচামালের প্রায় ৬০ শতাংশই সংগৃহীত হয় পবিত্র ঈদুল আজহার সময়।
তবে এবারের কোরবানির ঈদ সামনে রেখে সাভারের চামড়া শিল্প নগরীতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের অভাব বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মালিকদের আশঙ্কা, সঠিক সময়ে চামড়া সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করা না গেলে পচে নষ্ট হতে পারে শত শত কোটি টাকার সম্পদ।
বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও প্রক্রিয়াজাতকরণের ঝুঁকি : সাভার চামড়া শিল্প নগরীর ট্যানারি মালিকরা জানিয়েছেন, কোরবানির মৌসুমে পশুর চামড়ার জোগান সাধারণ সময়ের চেয়ে কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এই কাঁচা চামড়া একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে লবণ দিয়ে প্রক্রিয়াজাত (সল্টিং) না করলে তা ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। এছাড়া ট্যানারিগুলোতে চামড়া পরিষ্কার, ট্যানিং ও ফিনিশিংয়ের প্রতিটি ধাপে ভারি যন্ত্রপাতি পরিচালনার জন্য উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুৎ প্রয়োজন।
বর্তমানে সাভারে যে পরিমাণ লোডশেডিং চলছে, তাতে কোরবানির বিশাল চাপ সামলানো প্রায় অসম্ভব। ট্যানারি মালিকদের মতে, বিদ্যুৎ না থাকলে কেবল উৎপাদনই বন্ধ হবে না, বরং কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার অকার্যকর হয়ে পড়ার ঝুঁকিও তৈরি হবে।
সিইটিপি ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ : সাভার শিল্প নগরীর পরিবেশগত মানদণ্ড বজায় রাখার জন্য সিইটিপি সচল রাখা বাধ্যতামূলক। যদি বিদ্যুতের অভাবে সিইটিপি বন্ধ থাকে, তবে ট্যানারির বিষাক্ত বর্জ্য সরাসরি পরিবেশে মিশে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ‘লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ’ সার্টিফিকেশন পাওয়া বাংলাদেশের জন্য আরও কঠিন হয়ে পড়বে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে রপ্তানি আয়ে।
পরিসংখ্যান ও বর্তমান প্রেক্ষাপট- চালু ট্যানারি: বর্তমানে সাভারের চামড়া শিল্প নগরীতে ১৪২টি ট্যানারি চালু রয়েছে। অতীতের অভিজ্ঞতা: ২০১৭ সালে হাজারীবাগ থেকে সাভারে চামড়া শিল্প স্থানান্তরের পর থেকে অবকাঠামোগত কিছু সমস্যা থাকলেও বিদ্যুতের এমন সংকট আগে দেখা যায়নি। রপ্তানি সম্ভাবনা: চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য থকে বাংলাদেশ বছরে বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করে। তবে ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে প্রবেশ করতে হলে পরিবেশগত ছাড়পত্রের কোনো বিকল্প নেই।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও কর্তৃপক্ষের অবস্থান : জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল গ্রিডের বিদ্যুতের ওপর নির্ভর না করে চামড়া শিল্প নগরীতে বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা করা জরুরি। সোলার প্যানেল বা নিজস্ব ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপনের মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলা করা যেতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিকল্প জ্বালানি: আপদকালীন পরিস্থিতি সামাল দিতে ট্যানারিগুলোতে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটর ও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিকল্পনা নিতে হবে। অগ্রাধিকারভিত্তিক সরবরাহ: ঈদুল আজহার পরবর্তী অন্তত ১০-১৫ দিন শিল্প এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে হবে।
এদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে তারা নিয়মিত আলোচনার মধ্য দিয়ে সমাধানের পথ খুঁজছে। তবে ঈদের আগের এই স্বল্প সময়ে কতটুকু নিশ্চিত করা যাবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েই গেছে।
চামড়া শিল্প কেবল একটি বাণিজ্যিক খাত নয়, এর সাথে জড়িত রয়েছে দেশের বিপুল সংখ্যক প্রান্তিক মানুষ ও এতিমখানাগুলোর আয়। কোরবানির চামড়া বিক্রির টাকা একটি বড় অংশ গরিব ও দুস্থদের মাঝে বণ্টন করা হয়। তাই এই শিল্পে ধস নামলে এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। দেশের দ্বিতীয় প্রধান রপ্তানি খাতের এই সংকট মোকাবিলায় সরকার ও বিদ্যুৎ বিভাগের কার্যকর পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন