শিল্পাঞ্চলে আবারও জাগছে আশার আলো

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: মে ১১, ২০২৬, ১২:২৫ এএম
শিল্পাঞ্চলে আবারও জাগছে আশার আলো

ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে এক সময় যে জনপদ সাইরেনের শব্দে জেগে উঠত, সেই খুলনার খালিশপুর-দৌলতপুর এখন যেন এক নিস্তব্ধ নগরী। ২০২০ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত ২৫টি পাটকল বন্ধের সেই ‘কালো প্রজ্ঞাপন’ কেড়ে নিয়েছিল হাজার হাজার শ্রমিকের জীবিকা, স্তব্ধ করে দিয়েছিল সোনালি আঁশের চাকা।

তবে দীর্ঘ বঞ্চনা ও অভাব-অনটনের দীর্ঘ প্রহর শেষে এখন খুলনার শিল্পাঞ্চলে বইছে নতুন হাওয়া। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামপ্রতিক ঘোষণা ‘বন্ধ থাকা সব কারখানা পর্যায়ক্রমে চালু করা হবে’ খুলনা ও যশোর অঞ্চলের প্রায় ৩৪ হাজার শ্রমিকের চোখে নতুন স্বপ্নের আবেশ ছড়িয়েছে।

বেকার জীবনের রূঢ় বাস্তব ও কষ্টের কথা : বিগত ছয় বছরে পাটকল শ্রমিকদের জীবন ওলটপালট হয়ে গেছে। ক্রিসেন্ট জুটমিলের সাবেক তাঁতি জাকির খান এখন ইজিবাইক চালিয়ে সংসার টানেন। তিনি আবেগতাড়িত হয়ে বলেন, ‘হাসিনা সরকার আমাগো প্লেটের ভাত কাইড়া নিছে। ১৫ বছরের চাকরি এক নিমেষে শেষ হইয়া গেল। অভাবের তাড়নায় অনেকে এলাকা ছাড়ছে, অনেকে চিকিৎসার টাকা না থাকায় মারা গেছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কইছেন কারখানা খুলবেন, এহন আমাগো সুদিন ফেরার অপেক্ষায় আছি।’ একই চিত্র স্টার জুটমিলের শ্রমিক জসিম গাজীর। চাকরি হারিয়ে এখন তিনি নাইট গার্ডের কাজ করেন। তার আক্ষেপ, ‘স্থায়ী-অস্থায়ী হাজার হাজার শ্রমিক আজ পথের ফকির। অনেকের সন্তানরা স্কুল ছেড়ে কাজে নামতে বাধ্য হয়েছে। আমরা চাই মিলগুলো যেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে সরকারিভাবে চালু হয়, যাতে শ্রমিকের অধিকার রক্ষা পায়।’

ওয়ান ইয়ার রোডম্যাপ ও সরকারের পরিকল্পনা : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ১ মে শ্রমিক দিবসের সমাবেশে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে এবং বেকারত্ব দূর করতে বন্ধ হওয়া কলকারখানাগুলো পুনরায় চালু করা হবে। গত ৪ মে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টদের সাথে এক বৈঠকে তিনি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই প্রক্রিয়া শুরুর নির্দেশ দিয়েছেন। সরকারের এই উদ্যোগকে খুলনাবাসী ‘অনন্য উদ্যোগ’ হিসেবে দেখছেন।

মহানগর বিএনপির সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক অধ্যক্ষ তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘এটি প্রধানমন্ত্রীর একটি     সাহসী পদক্ষেপ। তবে মনে রাখতে হবে, মান্ধাতা আমলের যন্ত্রপাতি দিয়ে বর্তমান বাজারে টেকা কঠিন। তাই মিলগুলো চালুর পাশাপাশি আধুনিকায়ন জরুরি।’

ইজারা নাকি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা, বিতর্কের কেন্দ্রে শ্রমিক নেতৃত্ব : বিগত সরকার ইজারার মাধ্যমে মিলগুলো চালুর যে নীতি নিয়েছিল, তাতে শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে। শ্রমিক নেতাদের দাবি, লিজ প্রথায় মিল চালু করলে শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য অধিকার পায় না।

পাট শ্রমিকদলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মো. সমশের আলম বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকার পাটকল বন্ধ করে তিন কোটি মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বিজিএমসির কর্মকর্তাদের দুর্নীতি আর কাঁচা পাট কেনায় অব্যবস্থাপনার কারণে লোকসান হতো। আমরা চাই ইজারা প্রথা বাতিল করে রাষ্ট্রীয় মিলগুলো রাষ্ট্রীয়ভাবেই চালু হোক। ব্যক্তিগত মালিকানায় গেলে আবারও লুটপাট হওয়ার ভয় থাকে।’ পাটকল রক্ষায় সম্মিলিত নাগরিক পরিষদের সদস্য মুনীর চৌধুরী সোহেলও একই মত পোষণ করেন। তিনি জানান, ইজারার নামে রাষ্ট্রীয় সম্পদ পাচারের ঘটনাও ঘটেছে। তাই সোনালি আঁশের হারানো গৌরব ফেরাতে হলে সরকারি নিয়ন্ত্রণ জরুরি।

বর্তমান অবস্থা ও বিজিএমসির অবস্থান : বর্তমানে খুলনা অঞ্চলের ৯টি পাটকলের মধ্যে পাঁচটি ইজারা সম্পন্ন হয়েছে এবং বাকিগুলো হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। বাংলাদেশ জুটমিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) তথ্য অনুযায়ী, সীমিত পরিসরে উৎপাদনে ফেরা কিছু মিলে মাত্র তিন হাজারের মতো শ্রমিক নিয়োগ পেয়েছে, যা মোট ৩৪ হাজার শ্রমিকের তুলনায় নগণ্য। খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয়ের ডিজিএম ড. জুলফিকার জানান, তারা টেলিভিশনের মাধ্যমে মিল চালুর ঘোষণা শুনেছেন, তবে মন্ত্রণালয় থেকে এখনো কোনো লিখিত নির্দেশনা পাননি। নির্দেশনা পেলেই তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।

সোনালি আঁশের আগামীর স্বপ্ন : খুলনার খালিশপুর ও যশোরের রাজঘাট এলাকায় এখন শ্রমিকরা কেবল দিন গুনছেন। ধুলো জমা মরিচা ধরা মেশিনগুলো পরিষ্কার করার অপেক্ষায় আছেন অভিজ্ঞ সব কারিগর। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি দক্ষ ব্যবস্থাপনা, সঠিক সময়ে কাঁচা পাট ক্রয় এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো যায়, তবে পাট শিল্প আবারও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান খাত হিসেবে আবির্ভূত হবে।

খুলনার শিল্পাঞ্চলের মানুষ বিশ্বাস করেন, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী যদি দ্রুত মিলগুলো সচল হয়, তবে কেবল ৩৪ হাজার পরিবার নয়, পুরো দেশের অর্থনীতিই শক্তিশালী হবে। দীর্ঘ ছয় বছরের হাহাকার মুছে গিয়ে আবারও খুশির জোয়ার নামবে শ্রমিকের ঘরে।