মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যকার চলমান সংঘাত বর্তমানে যুদ্ধবিরতির পর্যায়ে থাকলেও এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে বাংলাদেশ। হাজার মাইল দূরে মরুভূমির রণক্ষেত্রে চলা গোলবারুদ ও ড্রোন হামলার শব্দ এদেশের বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি সংকট এবং প্রবাসীদের কর্মসংস্থানে অনিশ্চয়তার কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংঘাত সাময়িক থামলেও এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অভিঘাত বাংলাদেশের ওপর দীর্ঘস্থায়ী চাপ তৈরি করছে।
জ্বালানি খাতে মহাপ্রলয়, ১০-১৫ শতাংশ দাম বৃদ্ধি : বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা সরাসরি মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল। যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় সরকার বাধ্য হয়ে দেশে জ্বালানি তেলের দাম ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি করেছে। হরমুজ প্রণালির সংকট: বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও এলএনজি পরিবহনের রুট ‘হরমুজ প্রণালি’ নিয়ে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় আমদানিতে বড় বাধা সৃষ্টি হয়েছে। বিদ্যুৎ ও শিল্পে প্রভাব: এলএনজি আমদানি ব্যয়বহুল হওয়ায় দেশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও শিল্পকারখানাগুলোতে লোডশেডিং ও উৎপাদন ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
বাজার ও জনজীবনে অস্থিরতা : জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের ওপর। ১. মূল্যস্ফীতি: পরিবহন ব্যয় বাড়ায় সবজি থেকে শুরু করে চাল-ডাল প্রতিটি নিত্যপণ্যের দাম এখন সাধারণের নাগালের বাইরে। ২. কঠোর বিধিনিষেধ: বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সরকার অফিসের কর্মঘণ্টা কমিয়ে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত নির্ধারণ করেছে। রাত ৮টার পরিবর্তে এখন সন্ধ্যা ৬টার পর থেকেই সব শপিংমল ও মার্কেট বন্ধ রাখা হচ্ছে। ৩. জ্বালানি মজুত ও জালিয়াতি: যুদ্ধের শুরুতে সংকটের গুজবে পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। সমপ্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাম্পে তেল নেই বলে নোটিশ ঝুলিয়ে গোপনে তেল মজুতের দায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান ও বিপুল পরিমাণ জ্বালানি উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে।
‘বাংলার জয়যাত্রা’ ও নাবিকদের বন্দিদশা : যুদ্ধের প্রত্যক্ষ প্রভাবে সংকটে পড়েছে বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজগুলো। ৩১ জন নাবিকসহ ‘বাংলার জয়যাত্রা’ নামক একটি জাহাজ বর্তমানে হরমুজ প্রণালির কাছে আটকা পড়ে আছে। ইরানের আইআরজিসির সরাসরি অনুমতি না পাওয়ায় জাহাজটি মুক্ত হতে পারছে না। এটি কেবল একটি জাহাজের সমস্যা নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্য রুটে বাংলাদেশের সামুদ্রিক বাণিজ্যের জন্য বড় একটি সতর্কবার্তা।
আওতায় আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। গতকাল সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ট্রাকসেল কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখতে এবং বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সরকার টিসিবির কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ করছে। আসন্ন কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে এবার খাদ্যপণ্যের সরবরাহ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে। তিনি জানান, গত বছরের ঈদুল আজহায় প্রায় ১০ হাজার ৯০০ টন খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হলেও এবার তা বাড়িয়ে প্রায় ১৪ হাজার টনে উন্নীত করা হচ্ছে। অর্থাৎ গতবারের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি পণ্য সরবরাহ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, শুধু ঈদ নয়, ভবিষ্যতে অন্যান্য উৎসব বা বিশেষ পরিস্থিতিতেও প্রয়োজন হলে ট্রাকসেল কার্যক্রম চালু রাখা হবে। একইসঙ্গে টিসিবির মাধ্যমে ভর্তুকি মূল্যে খাদ্যপণ্য সরবরাহ কার্যক্রম নিয়মিতভাবে চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানান তিনি। টিসিবির উপকারভোগী তালিকা প্রসঙ্গে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, পূর্ববর্তী সরকারের সময়ের তালিকা পর্যালোচনায় প্রায় ৫৯ লাখ নাম প্রশ্নবিদ্ধ বা ভুয়া হিসেবে শনাক্ত হয়েছে। পরে নতুন ও স্বচ্ছ পদ্ধতিতে তালিকা হালনাগাদ করে বর্তমানে প্রায় ৮০ লাখ প্রকৃত উপকারভোগীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও ২০ লাখ মানুষকে এ সুবিধার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি। এ সময় টিসিবির ডিলার নিয়োগ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে নতুন নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে বলেও জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, দ্রুত সময়ের মধ্যেই নতুন নীতিমালা বাস্তবায়ন করা হবে, যাতে অনিয়ম ও প্রভাবমুক্তভাবে ডিলার নিয়োগ নিশ্চিত করা যায়।
দেশে আমদানিনির্ভর পণ্যের বাজারে দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় এমন ধারণা জনগণের মধ্যে রয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, বাজারে দাম বাড়লেই সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকারের নিয়ন্ত্রণ সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। তাই বাজার ব্যবস্থাকে কারসাজিমুক্ত রাখতে সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
তিনি জানান, সরকারের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নির্বাচিত কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য কৌশলগত মজুত বা ‘স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ’ গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি আমদানি, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ের তথ্য একটি সমন্বিত এআইভিত্তিক সিস্টেমের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হবে। এতে কোনো পর্যায়ে কৃত্রিম সংকট বা মূল্য কারসাজি হলে তা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, আমদানিনির্ভর ব্যবসা সাধারণত বড় পুঁজিনির্ভর হওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী এতে অংশ নিতে পারেন না। তবে ভবিষ্যতে ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে টিসিবির সঙ্গে অংশীদারিত্বভিত্তিক নতুন মডেল চালুর বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। তিনি আরও বলেন, সরকার একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও প্রযুক্তিনির্ভর বাজারব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যাতে কোনো গোষ্ঠী বাজার নিয়ন্ত্রণ করে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি সৃষ্টি করতে না পারে।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন