বর্তমানে দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় উদ্বেগের নাম অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি, যা সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিনের নিত্যপণ্যের বাজারে গেলেই মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের অসহায়ত্বের করুণ চিত্র ফুটে উঠছে। চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে শাকসবজি সবকিছুর দামই এখন আকাশচুম্বী।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, গত কয়েক বছরে মানুষের আয়ের তুলনায় ব্যয়ের পাল্লা কয়েক গুণ ভারী হয়েছে। জীবনযাত্রার এই বাড়তি খরচ মেলাতে গিয়ে সাধারণ মানুষ হয় তাদের জমানো সঞ্চয় ভাঙছে, নয়তো বাধ্য হয়ে পুষ্টিকর খাবার ও জরুরি প্রয়োজন কাটছাঁট করছে।
মূল্যস্ফীতির এই যাঁতাকল কেবল নিম্ন আয়ের মানুষকে নয়, বরং সমাজের মধ্যবিত্ত শ্রেণিকেও চরম সংকটে ফেলেছে। আয়ের চাকা স্থবির থাকলেও ব্যয়ের চাকা ছুটছে ঘোড়দৌড়ের গতিতে। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিতিশীলতা, ডলার সংকট এবং অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থাপনায় সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
আসন্ন বাজেটকে সামনে রেখে সাধারণ মানুষের এখন একমাত্র প্রত্যাশা সরকার যেন কার্যকর মুদ্রানীতি ও বাজার তদারকির মাধ্যমে এই অসহনীয় মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরে। আয়ের সাথে ব্যয়ের সামঞ্জস্য রক্ষা করতে না পারলে সাধারণ মানুষের এই লড়াই কেবল টিকে থাকার লড়াইয়ে পরিণত হবে। অর্থনীতির এই কঠিন সময়ে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে বাজেটে কী ধরনের দিকনির্দেশনা আসে, সেটিই এখন কোটি মানুষের প্রধান চিন্তার বিষয়।
বিবিএস-এর পরিসংখ্যান আয়ের চেয়ে ব্যয়ের দৌড় দ্রুত : বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক সময়ের তথ্য বলছে, গত কয়েক বছরে মানুষের আয় বাড়লেও তা ব্যয়ের তুলনায় অনেকটাই পিছিয়ে। ব্যয়ের চিত্র: ২০২১ সালের জুলাই মাসে যে পণ্য বা সেবা কিনতে ১০০ টাকা খরচ হতো, ২০২৬ সালের এপ্রিলে এসে তা দাঁড়িয়েছে ১৫৫ টাকা ৮২ পয়সায়। অর্থাৎ ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৫৫.৮২ শতাংশ। আয়ের চিত্র: একই সময়ে ১০০ টাকা আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪৪ টাকা ৭১ পয়সায়। অর্থাৎ আয় বেড়েছে মাত্র ৪৪.৭১ শতাংশ।
এই যে ১১ শতাংশের বেশি ব্যবধান, এটাই সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাসের মূল কারণ। মানুষ হয় সঞ্চয় ভাঙছে, নয়তো ধারদেনা করে দিনাতিপাত করছে। অনেকে আবার বাধ্য হয়ে কাটছাঁট করছে প্রোটিন বা পুষ্টিকর খাবারের তালিকায়।
বাজেটে লক্ষ্যমাত্রা বনাম বাস্তবতা : অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে আভাস পাওয়া গেছে, আগামী বাজেটে মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে তা সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হতে পারে। তবে বাস্তবতা বেশ কঠিন।
টানা উচ্চ মূল্যস্ফীতি— গত ৪৫ মাসে একবারের জন্যও মূল্যস্ফীতির সূচক ৮ শতাংশের নিচে নামেনি। ফলে হঠাৎ করে তা সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনা সরকারের জন্য হবে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি: ব্যবসায়ীরা বলছেন, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার এবং জ্বালানি তেলের দফায় দফায় দাম বাড়ার কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারে। সরবরাহ সংকট: ডিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি আশরাফ আহমেদের মতে, বাজারে পণ্যের সরবরাহ কমে যাওয়ায় দামের ওপর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। বেসরকারি খাতকে সুরক্ষা না দিলে এই সরবরাহ ঘাটতি কাটানো সম্ভব নয়।
অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ— সমন্বিত তিন দর্শন : বাজারের এই অস্থিরতা কমাতে শুধু মুখে আশ্বাস দিলে কাজ হবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু ইউসুফ বাজার ব্যবস্থাপনাকে সাজানোর জন্য তিনটি দর্শনের ওপর জোর দিয়েছেন মুদ্রানীতি: বাজারে অর্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে মূল্যস্ফীতি কমানোর চেষ্টা করা। রাজস্বনীতি: নিত্যপণ্যের ওপর থেকে শুল্ক কমানো এবং সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা কমানো। বাজার তদারকি ও রাজনীতি: এ বিষয়ে অধ্যাপক আবু ইউসুফ বলেন, সিন্ডিকেট ভাঙতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কঠোর বাজার তদারকি নিশ্চিত করা। মুদ্রা, রাজস্ব এবং বাজার ব্যবস্থাপনা এই তিনটির সঠিক সমন্বয় ছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা— কর্মসংস্থান ও ওএমএস : বাজেটে শুধু বড় বড় অঙ্কের বরাদ্দ নয়, সাধারণ মানুষ চায় সরাসরি সুফল। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ওএমএস ও ফ্যামিলি কার্ডের পরিধি বাড়ানো এবং নিত্যপণ্যের দাম যাতে স্থিতিশীল থাকে, তার জন্য কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানানো হয়েছে। একইসঙ্গে মূল্যস্ফীতি কমাতে গিয়ে যেন নতুন কর্মসংস্থানের পথ বন্ধ না হয়, সেদিকেও সতর্ক থাকার তাগিদ দিয়েছেন শ্রমিক শ্রেণি।
সর্বোপরি, আসন্ন বাজেট কেবল সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং কোটি মানুষের টিকে থাকার লড়াইয়ের সনদ। বাজার সিন্ডিকেট দমন এবং উৎপাদনশীল খাতে প্রণোদনা দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন