পর্যায়ক্রমিক ফাঁকা হচ্ছে শিল্পাঞ্চল

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: মে ২৬, ২০২৬, ১২:৩২ এএম
পর্যায়ক্রমিক ফাঁকা হচ্ছে শিল্পাঞ্চল

পবিত্র ঈদুল আজহার আর মাত্র একদিন বাকি। এই আনন্দ উৎসবকে কেন্দ্র করে দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের মুখে হাসি ফোটাতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে মালিকপক্ষ।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)-এর সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকা ও চট্টগ্রামে সচল থাকা পোশাক কারখানাগুলোর সিংহভাগই ইতোমধ্যে তাদের শ্রমিকদের ঈদ বোনাস এবং এপ্রিল মাসের বকেয়া বেতন সফলভাবে পরিশোধ করেছে।

গতকাল সোমবার বিজিএমইএ ভবন থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক আনুষ্ঠানিক সাংগঠনিক বার্তায় এই স্বস্তিদায়ক তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। সংগঠনটি জানিয়েছে, ঈদযাত্রায় মহাসড়কগুলোয় যানবাহনের তীব্র জটলা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে এবার পোশাক কারখানাগুলোয় অঞ্চলভেদে ধাপে ধাপে ও পর্যায়ক্রমিক ছুটি কার্যকর করা হচ্ছে। এর ফলে লাখ লাখ পোশাক শ্রমিক কোনো ধরনের চরম ভোগান্তি ছাড়াই সুশৃঙ্খলভাবে ঢাকা ও চট্টগ্রাম ছাড়তে শুরু করেছেন।

বিজিএমইএ-এর দেয়া তথ্যমতে, বর্তমানে দেশের প্রধান দুটি বাণিজ্যিক জোন ঢাকা (সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও ধামরাই) এবং চট্টগ্রামে বিজিএমইএ-এর তালিকাভুক্ত সচল ও উৎপাদনমুখী কারখানার মোট সংখ্যা ২ হাজার ১৩৩টি। এর ভৌগোলিক বণ্টন ঢাকা অঞ্চলে মোট সচল কারখানা ১ হাজার ৭৯৪টি। চট্টগ্রাম অঞ্চলে মোট সচল কারখানা ৩৪০টি।

বিগত বছরগুলোয় ঈদের আগে অনেক কারখানায় বেতন-বোনাস নিয়ে শ্রমিক অসন্তোষ বা রাস্তা অবরোধের মতো ঘটনা ঘটলেও, এবার মালিক, শ্রমিক নেতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত প্রচেষ্টায় পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বিজিএমইএ-এর পাঠানো বিবরণী অনুযায়ী, শ্রমিকদের এপ্রিল মাসের নিয়মিত মাসিক বেতন পরিশোধের হার প্রায় শতভাগের কাছাকাছি পৌঁছেছে। দেশের মোট ২ হাজার ১১৭টি কারখানা এপ্রিলের বেতন সম্পূর্ণ পরিশোধ করেছে, যা শতাংশের হিসাবে ৯৯.২০%।

অঞ্চলভিত্তিক এপ্রিলের বেতন পরিশোধের বিবরণ- ১. ঢাকা অঞ্চল: ১,৭৯৪টি কারখানার মধ্যে ১,৭৮৩টি কারখানা তাদের শ্রমিকদের এপ্রিলের পাওনা বুঝিয়ে দিয়েছে। ২. চট্টগ্রাম অঞ্চল: ৩৪০টি কারখানার মধ্যে ৩৩৪টি কারখানা শতভাগ বেতন পরিশোধ সম্পন্ন করেছে।

বাকি সামান্য কিছু কারখানায় ব্যাংকিং জটিলতা বা লজিস্টিক সমস্যার কারণে গতকাল সোমবার বিকেলের মধ্যেই বেতন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জোর প্রচেষ্টা চলছে বলে জানা গেছে। শ্রমিকদের ঈদের খুশি ও কেনাকাটার মূল চালিকাশক্তি হলো উৎসব ভাতা বা ঈদ বোনাস। বিজিএমইএ-এর তথ্যানুযায়ী, ২৫ মে সকাল পর্যন্ত ঢাকা ও চট্টগ্রামের মোট ২ হাজার ২১টি পোশাক কারখানা তাদের শ্রমিকদের ঈদ বোনাস সফলভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে। এটি মোট সচল কারখানার ৯৪.৭০ শতাংশ।

অঞ্চল ভেদে মোট সচল কারখানা ও বোনাস পরিশোধকারী কারখানা— ঢাকা জোন- ১,৭৯৪ টি সচল, ১,৭০৯টি ৯৫.২৬ শতাংশ পরিশোধ। চট্টগ্রাম জোন ৩৪০টি সচল,  ৩১২টি ৯১.৭৬ শতাংশ পরিশোধ। সর্বমোট ২,১৩৩টি সচল, ২,০২১টি ৯৪.৭০ শতাংশ পরিশোধ। বাকি ৫.৩ শতাংশ কারখানার বিষয়ে বিজিএমইএ-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি মানের কিছু সাব-কন্ট্রাক্টিং কারখানা আর্থিক তারল্য সংকটে থাকলেও, ঈদের ছুটির দিন নির্ধারণের আগেই বিশেষ তহবিল বা ব্যাংক লোনের মাধ্যমে বোনাস পরিশোধের আইনি বাধ্যবাধকতা পূরণে কাজ করছে।

ঈদের ছুটির সময়ে শ্রমিকদের পকেটে যেন পর্যাপ্ত নগদ অর্থ থাকে এবং গ্রামে গিয়ে তারা যেন কোনো আর্থিক সংকটে না পড়েন, সেজন্য অনেক বড় এবং কমপ্লায়েন্স কারখানা মে মাসের চলতি বেতনের একটি বড় অংশ অগ্রিম হিসেবে শ্রমিকদের প্রদান করেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকা ও চট্টগ্রামের মোট ৭৬৭টি পোশাক কারখানা মে মাসের অগ্রিম বেতন পরিশোধ করেছে, যা মোট কারখানার ৩৫.৯৪ শতাংশ। এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের কারণে শ্রমিক পরিবারের ঈদ উদযাপন আরও বেশি আনন্দময় ও গতিশীল হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

সর্বোপরি, সার্বিক পর্যালোচনায় বলা যায়, ২০২৬ সালের ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে একটি অভূতপূর্ব সমন্বয় দেখা গেছে। ৯৯.২০% কারখানায় এপ্রিলের বেতন এবং প্রায় ৯৫% কারখানায় ঈদ বোনাস পরিশোধের এই চমৎকার পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, দেশের পোশাক শিল্প এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি পরিপক্ব ও দায়িত্বশীল।