পবিত্র ঈদুল আজহার আর মাত্র একদিন বাকি। সাধারণত বছরের এই সময়টিতে কোরবানির মাংস রান্নার অপরিহার্য উপাদান গরম মসলার বাজার থাকে সবচেয়ে উত্তপ্ত। সিন্ডিকেট, কৃত্রিম সংকট আর আকাশচুম্বী দামের কারণে সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যায় জিরা, এলাচ, দারচিনি ও লবঙ্গের মতো পণ্য। তবে এবারের চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো।
২০২৬ সালের ঈদুল আজহার আগমুহূর্তে রাজধানীর মসলার বাজারে দেখা গেছে এক অভাবনীয় স্থিতিশীলতা, এমনকি বেশ কিছু প্রধান মসলার দাম গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। কিন্তু বাজারের এই দরপতন ও স্থিতিশীলতা ক্রেতাদের জন্য স্বস্তি আনলেও, চরম হতাশা নেমে এসেছে আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের কপালে।
খুচরা বাজারে বিক্রি আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় পাইকারি বাজারগুলোয়ও ধস নেমেছে। সেই সঙ্গে সীমান্ত দিয়ে অবৈধ পথে আসা মসলার কারণে বৈধ ব্যবসায়ীরা ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। রাজধানীর প্রধানতম মসলার পাইকারি আড়ত চকবাজারের মৌলভীবাজার ঘুরে দেখা গেছে, অন্যান্য বছরের মতো এবার ঈদের আগের চেনা ব্যস্ততা ও কোলাহল নেই। গলির ভেতরের রাস্তাগুলো যেখানে অন্য বছর ক্রেতা ও মালবাহী ভ্যানের ভিড়ে অবরুদ্ধ থাকত, এবার সেখানে স্বাভাবিকভাবে হেঁটে চলা যাচ্ছে। মৌলভীবাজারের প্রবীণ ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, এবারের ঈদকেন্দ্রিক বেচাকেনা তাদের প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম। ২৫-২৬ বছর ধরে মসলা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এক পাইকারি আড়তদার নিজের হতাশা ব্যক্ত করে বলেন,
‘গত আড়াই দশকের ব্যবসায়িক জীবনে ঈদের আগে মসলার বাজারে এত বড় ডাউন মার্কেট (মন্দা) আমি আর দেখিনি। বাজারে পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ আছে, গত বছরের তুলনায় দামও বেশ কম, কিন্তু বাজারে ‘সেল’ বা বিক্রি নেই। সাধারণ মানুষ অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে আছে, হয়তো তাই তারা মসলা কেনার বাজেট কমিয়ে দিয়েছে।’
ব্যবসায়ীদের দেয়া তথ্যমতে, আন্তর্জাতিক বাজারে বুকিং রেট কম থাকা এবং দেশের বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকায় জিরাসহ কয়েকটি প্রধান মসলার দাম নিম্নমুখী। তবে এর পেছনে আরেকটি নেতিবাচক কারণও দেখছেন আড়তদাররা। তাদের অভিযোগ, ভারত থেকে অবৈধ উপায়ে বা ‘ব্ল্যাক পথে’ বিপুল পরিমাণ মসলা সীমান্ত পার হয়ে দেশের বাজারে ঢুকে পড়ছে। শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আসা এসব পণ্যের কারণে বৈধ আমদানিকারকরা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ছেন।
একজন আমদানিকারক বাজারের অস্থিরতার উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘ভারত থেকে অবৈধ পথে অনেক পণ্য প্রতিদিন দেশের বাজারে ঢুকছে। এগুলো অনতিবিলম্বে বন্ধ করা দরকার। কাস্টমস ও সীমান্ত পাহারা শক্ত না হলে বৈধ ব্যবসা টেকানো অসম্ভব। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, যে জিরা আজ সকালে আমরা ৫৮০ টাকা কেজি দরে পাইকারি বিক্রি করেছি, অবৈধ মালের চোরাচালানের চাপে একদিন পরই তা ২০ টাকা কমে ৫৬০ টাকা হয়ে যাচ্ছে। এই তীব্র অনিশ্চয়তায় আমরা পুঁজি হারাচ্ছি।’
পাইকারি বাজারে দাম কম থাকার সুফল খুচরা বাজারে কিছুটা মিললেও, পাড়া-মহল্লার দোকানগুলোয় ক্রেতাদের আনাগোনা একেবারেই সীমিত। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, গত বছর এই সময়ে দোকানে দম ফেলার ফুসরত ছিল না, অথচ এবার ক্রেতার জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এক খুচরা ব্যবসায়ী বাজারের বাস্তব অবস্থা তুলে ধরে বলেন, গত বছর কোরবানির ঈদের তিন দিন আগে মৌলভীবাজার বা কারওয়ান বাজারের মসলা পট্টির রাস্তা দিয়ে মানুষের ভিড়ের কারণে হাঁটা যেত না। এবার কাস্টমার একেবারে কম, রাস্তা ফাঁকা।
মানুষ আগের মতো কেজি বা আধা কেজি করে মসলা কিনছে না; ৫০-১০০ গ্রাম করে কিনেই কাজ সারছে। দাম কমলেও মানুষের পকেটে টাকা না থাকলে বাজার জমবে কীভাবে। তবে কিছু ক্রেতা খুচরা পর্যায়ে এখনো চড়া দাম নেয়ার অভিযোগ করেছেন। তাদের মতে, পাইকারি বাজারে দাম যতটা কমেছে, খুচরা বিক্রেতারা সেই অনুপাতে দাম না কমিয়ে বাড়তি মুনাফা করার চেষ্টা করছেন।
সর্বোপরি, সামগ্রিক পর্যালোচনায় বলা যায়, ২০২৬ সালের ঈদুল আজহার আগে মসলার বাজারের এই স্থিতিশীলতা সাধারণ ও মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের জন্য বড় একটি স্বস্তির খবর। মাংসের বাড়তি দামের বাজারে মসলার খরচ কমে যাওয়াটা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে বিক্রি কমে যাওয়া এবং সীমান্ত দিয়ে চোরাচালানের মাধ্যমে মসলা প্রবেশ করার বিষয়টি দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির জন্য একটি সতর্কবার্তা।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন